গাজার ক্ষুদ্র অংশে আবদ্ধ ফিলিস্তিনিরা; নতুন হামলায় নিহত আরও ৫২ জন
গত ২৪ ঘণ্টায় গাজাজুড়ে ইসরায়েলি বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৭ জন ফিলিস্তিনি। আহত অন্তত আরও ২১ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৯৫৮ জনে। আহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২২ হাজার ৮০ জনে।
বরাবরের মতোই রোববারের হামলায় (২৫ মে) নতুন করে হতাহতদের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে ও রাস্তায় পড়ে থাকা অনেক মরদেহ সোমবার (২৬ মে) সকাল পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি। নিরাপত্তার অভাবে সেখানে পৌঁছাতে পারছেন না উদ্ধারকর্মীরা।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘পুরো গাজা নিয়ন্ত্রণের’ যে হুমকি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন প্রায় শেষ করে এনেছে দেশটির সামরিক বাহিনী (আইডিএফ)। অবরুদ্ধ উপত্যকাটির ৭৭ শতাংশ ভূখণ্ড এখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এতে গাজার ক্ষুদ্র একটি অংশের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন ফিলিস্তিনিরা।
তারপরও কয়েকদিন ধরে গাজার বিভিন্ন এলাকায় হামলা জোরদার করেছে সেনারা। অবিরাম এই হামলা ও অনাহার ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা আরও বাড়িয়েছে।
গাজার জনসংযোগ কার্যালয় জানায়, সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হচ্ছে, আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত একটি স্কুলে হামলা চালিয়ে অন্তত ২৫ জনকে হত্যা করে ইসরায়েলি সেনারা। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন দুজন রেডক্রস কর্মী, একজন সাংবাদিক, একাধিক শিশু এবং মা-সন্তানসহ বেসামরিক ফিলিস্তিনিরা স্কুলটিতে গাজার অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন।
টেলিগ্রামে হালনাগাদ পোস্টে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, হামলার পর তাদের উদ্ধারকর্মীরা স্কুলটি থেকে অন্তত ১৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। এখন পর্যন্ত ২১ জন আহতকে হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, ইসরায়েলি হামলায় স্কুল ভবনটির প্রায় অর্ধেকই ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন অনেকে।
বিমান থেকে বোমাবর্ষণে প্রাণ হারিয়েছেন জনপ্রিয় ১১ বছর বয়সী সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ইয়াকিন হাম্মাদও। একই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ডাক্তার আলা আমির আল-নাজ্জারের ১০ সন্তানের মধ্যে নয়জনই। বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তান আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।
আল জাজিরার আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ১২ জনেরও বেশি শিশু নিহত হয়েছে।
চলতি বছরের ১৮ মার্চ থেকে গাজায় নতুন করে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হয়। ওই সময় থেকে তিনমাস ধরে উপত্যকাটিকে প্রায় সম্পূর্ণ অবরোধে রেখে থেকে এ পর্যন্ত আরও তিন হাজার ৮০৪ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সেনারা, আহত হয়েছেন ১০ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি। এর মধ্যে বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযানে এক সপ্তাহেই নিহত হয়েছেন প্রায় ৬০০ জন।
এতে করে গত জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময়ের আগে স্থিতিশীল হওয়া পরিস্থিতি আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে।
গাজার জনসংযোগ কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বেসামরিক ও আবাসিক এলাকায় সরাসরি স্থল অভিযান ও দখলদার বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে গাজার ৭৭ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েল। এসব এলাকা থেকে হয় ফিলিস্তিনিদের চলে যেতে বলা হয়েছে, না হয় গুলি চালানো হচ্ছে। এতে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না তারা।
জাতিসংঘের হিসাবে, ইসরায়েলি হামলার ফলে গাজার প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডের অধিকাংশ অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে, অপুষ্টিতে ভুগছে গাজার ৭০ হাজারেরও বেশি শিশু। রোববারও অনাহারে মারা গেছে চার বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ ইয়াসিন। চলমান সংকটে আরও বহু শিশুর প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়েছে, এখনো গাজায় থাকা দুই মিলিয়ন বাসিন্দার অনেকেই আসন্ন দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হচ্ছে। এমনকি ক্ষুধা সংকট সম্পর্কে উদ্বেগ জানিয়েছে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় হামলা চালিয়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে চলেছে ইসরায়েল। একমাস পরে নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গাজায় মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেও আগ্রাসন থামাতে পারেনি। একইসঙ্গে, গাজায় চলমান দমন-পীড়নের কারণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলাও চলছে।
গাজায় অব্যাহত এই আক্রমণ এবং মানবিক পরিস্থিতির অবনতিশীলতায় বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান নিন্দারও মুখোমুখি হচ্ছে ইসরায়েল। রোববারও স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে ইউরোপ ও আরব বিশ্বের ২০টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছে স্পেন। সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল, দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড়।
তারপরও ১৮ মার্চ নতুন করে অভিযান শুরুর পর থেকে নিষ্ঠুর হামলা চলবে বলে জানিয়েছে নেতানিয়াহুর সেনাবাহিনী। জানিয়েছে, ‘গিডিয়নের রথ’ নামে পরিচিত তাদের নতুন আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ‘অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ’ অর্জনে একাধিক লক্ষ্যবস্তু অভিযান চালানো হচ্ছে। আইডিএফের বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, গত সপ্তাহে হামাসের ৬৭০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে কয়েক ডজন হামাস যোদ্ধা নিহত হয়েছে।
বাকি হামাস যোদ্ধারাও আত্মসমর্পণ না করা এবং বাকি ৫৮ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়ে আগেই রেখেছে দেশটি। জিম্মিদের অর্ধেকেরও কম জীবিত বলে মনে করা হচ্ছে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে