Views Bangladesh Logo

বাংলার নববর্ষ: আদি উৎস থেকে আধুনিকতার বিশ্বায়ন

Nafiul  Haque

নাফিউল হক

ইতিহাসের পাতায় কোনো জাতির পরিচয় ফুটে ওঠে তার উৎসবের রঙে। বাঙালির ক্ষেত্রে সেই রঙের নাম 'পহেলা বৈশাখ'। কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শুরু করে আজকের বিশ্বায়িত নাগরিক জীবন পর্যন্ত এই উৎসবের রূপান্তর ঘটেছে অসংখ্য বাঁক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।

বাংলা নববর্ষের বিবর্তনকে তিনটি প্রধান কালখণ্ডে বিভক্ত করা যায়: প্রাচীন বা প্রাক-ইসলামি যুগ, মধ্যযুগীয় বা মুঘল প্রশাসনিক যুগ এবং আধুনিক বা উত্তর-ঔপনিবেশিকবাদী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক যুগ। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নববর্ষ কখনো ছিল রাজকীয় ফরমান, কখনো ছিল কৃষকের ঋতু-উৎসব, আবার কখনো হয়েছে শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির সাংস্কৃতিক হাতিয়ার।

প্রাচীন বাংলায় নববর্ষ পালনের কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ বা 'বঙ্গাব্দ' ছিল না। তবে ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি সমাজ ছিল কৃষিপ্রধান। ফলে ঋতু পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে তারা বিভিন্ন উৎসব পালন করত, যাকে বলা হতো 'আর্তব উৎসব'। তখন প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী সূর্য যখন মেষ রাশিতে প্রবেশ করত, তখন থেকেই নতুন বছরের সূচনা ধরা হতো। এটি মূলত ছিল বসন্তের বিদায় ও গ্রীষ্মের আগমনের সন্ধিক্ষণ।

নববর্ষের উৎসবের আগের দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি ছিল প্রাচীন বাংলার প্রধান উৎসব। শিবের উপাসনা, গাজন, চড়ক পূজা এবং নীলপূজার মাধ্যমে কৃষক সমাজ পুরোনো বছরের জীর্ণতাকে বিসর্জন দিত। এই প্রথাগুলো আজও গ্রামীণ বাংলার নববর্ষের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে।

বাংলা নববর্ষের আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হয় মুঘল আমলে। সম্রাট আকবরের শাসনামলে (১৫৫৬-১৬০৫) কর বা খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে একটি বিজ্ঞানসম্মত ক্যালকুলেটরের প্রয়োজন দেখা দেয়।

মুঘলরা ভারতে হিজরি সন অনুসরণ করত। কিন্তু হিজরি সন চন্দ্রবর্ষ হওয়ায় তা সৌরবর্ষের (ঋতুচক্র) সাথে প্রতি বছর ১১ দিন পিছিয়ে যেত। ফলে কৃষকের ফসল কাটার সমযয়ের সাথে খাজনা আদায়ের সময় মিলত না।

১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর তার দরবারের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে একটি নতুন পঞ্জিকা তৈরির নির্দেশ দেন। তিনি হিজরি চন্দ্রবর্ষ এবং বাংলার সৌরবর্ষকে সমন্বয় করে 'ফসলি সন' প্রবর্তন করেন। ৯৬৩ হিজরি সালকে ভিত্তি ধরে এই গণনা শুরু হয়, যা কালক্রমে 'বঙ্গাব্দ' বা বাংলা সন হিসেবে পরিচিত পায়। এই সময় থেকেই নববর্ষের সাথে অর্থনীতির সংযোগ ঘটে। খাজনা আদায়ের দিনটিকে উৎসবের রূপ দিতে 'পুণ্যাহ' প্রথার সূচনা হয়, যেখানে প্রজাদের মিষ্টিমুখ করানো হতো।

উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত নববর্ষের প্রধান আকর্ষণ ছিল 'হালখাতা'। সামন্ততান্ত্রিক সমাজ যখন ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছিল, তখন ব্যবসায়ীদের কাছে নববর্ষ হয়ে ওঠে নতুন সূচনার প্রতীক।

গ্রামীণ ও মফস্বল শহরগুলোতে ব্যবসায়ীরা সারাবছরের দেনা-পাওনা চুকিয়ে এই দিনে নতুন 'লাল সালু' মোড়ানো খাতা খুলতেন। গ্রাহকদের আমন্ত্রণ জানানো হতো মিষ্টি ও পান-সুপারি দিয়ে।

এই সময়ে মেলা ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। মৃৎশিল্প, হস্তশিল্প এবং কুটির শিল্পের বিশাল বাজার বসত এই মেলাগুলোতে। নাগরদোলা, পুতুলনাচ এবং কবিগান ছিল বিনোদনের প্রধান উৎস। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে বাংলা নববর্ষের বিবর্তন একটি আমূল পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র যখন বাঙালির ওপর বিজাতীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন নববর্ষ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষা।

পাকিস্তান সরকার যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করে এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে 'হিন্দুয়ানি' তকমা দিয়ে দমন করতে চায়, তখন তার প্রতিবাদে ১৯৬৭ সালে রমনা বটমূলে ছায়ানট বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু করে। এটি কেবল গান ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পহেলা বৈশাখ বাঙালির একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসবে পরিণত হয়। এটিই ছিল প্রথম কোনো উৎসব যা বাঙালি মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের একই মোহনায় দাঁড় করিয়ে দেয়।

মঙ্গল শোভাযাত্রা ও বিশ্ব স্বীকৃতি স্বাধীন বাংলাদেশে নববর্ষের উদযাপন আরও সংহত ও শিল্পসম্মত রূপ পায়।

সামরিক শাসনের অন্ধকার সময়ে মানুষের মনে শুভ চেতনার উন্মেষ ঘটাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র-শিক্ষকরা 'আনন্দ শোভাযাত্রা' শুরু করেন। মুখোশ, লোকজ মোটিভ (পাখি, বাঘ, হাতি) এবং অশুভ শক্তির প্রতীক পুড়িয়ে এই শোভাযাত্রা এক অনন্য মাত্রা যোগ করে।

২০১৬ সালে ইউনেস্কো 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'কে বিশ্বের 'অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' (Intangible Cultural Heritage of Humanity) হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে বাংলা নববর্ষ বৈশ্বিক সংস্কৃতির মানচিত্রে স্থায়ী আসন লাভ করে।

একবিংশ শতাব্দীতে নববর্ষের বিবর্তন ঘটেছে প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাণিজ্যিক ধারায়। আশি ও নব্বইয়ের দশকে নাগরিক জীবনে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার একটি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যা বর্তমানে বেশ জনপ্রিয় হলেও ঐতিহাসিকভাবে এটি কৃষকের সাধারণ খাবারের একটি শহুরে রোমান্টিক সংস্করণ।

আধুনিক বুটিক হাউসগুলো নববর্ষকে কেন্দ্র করে লাল-সাদা রঙের থিমে পোশাকের বিশাল বাজার তৈরি করেছে।

বর্তমানে ইন্টারনেটের কল্যাণে প্রবাসী বাঙালিরা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে একই সময়ে নববর্ষ পালন করছে, যা একে একটি গ্লোবাল উৎসবে পরিণত করেছে।

সময়ের প্রয়োজনে বাংলা একাডেমি কয়েকবার ক্যালেন্ডার সংস্কার করেছে। ১৯৬৩ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে নতুন সংস্কারের মাধ্যমে বাংলা সনের মাসগুলোর দিন সংখ্যা ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে (যেমন- পহেলা বৈশাখ এখন সবসময় ১৪ই এপ্রিল পালিত হয়)। এটি আধুনিক প্রশাসনিক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রক্ষায় সহায়ক হয়েছে।

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কোনো স্থির বিন্দুর নাম নয়। এটি এক প্রবহমান নদী, যা কখনো রাজদরবারের রাজস্ব মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, আবার কখনো রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের রাজপথে গর্জে উঠেছে। আজ পহেলা বৈশাখ কেবল পঞ্জিকার পাতা পরিবর্তন নয়, বরং এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, স্বাধিকার আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার এক বৈশ্বিক জয়ধ্বনি। হাজার বছর ধরে বিবর্তিত এই উৎসবটিই প্রমাণ করে যে, বাঙালির শক্তি তার লোকজ ঐতিহ্যে এবং প্রতিকূলতার মাঝে টিকে থাকার অদম্য ক্ষমতায় বলিয়ান।

সহায়ক গ্রন্থাবলি:
১. বাঙালির ইতিহাস (আদি ও মধ্য পর্ব) নীহাররঞ্জন রায়।
২. বাংলা সনের ইতিহাস - ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
৩. উৎসবে ও সংকটে বাঙালি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
৪. বাংলা নববর্ষ: ঐতিহ্য ও আধুনিকতা- শামসুজ্জামান খান।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ