Views Bangladesh Logo

পহেলা বৈশাখ; বাঙালি পরিচয়ের দ্বান্দ্বিক নির্মাণ

Shanto Zabaly

শান্ত জাবালি

যখন কেউ মঙ্গল শোভাযাত্রায় র‍্যালি করে, মাটির টেপা পুতুল কিংবা গলায় গুনগুন শুর ধরে, এসো হে বৈশাখ এসো এসো, এখন প্রশ্ন আসে এই উদযাপন রীতি এটা কি বাঙালির উৎসব নাকি হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি 'মুসলমানদে'র উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে? দ্বিতীয় অভিযোগটি খুবই গুরুতর। বৈশাখের আগমনে এই প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আবর্তিত হয়। এর নির্যাস রয়েছে আমিত্ব, সংস্কৃতি, ধর্ম ইতিহাসের বোঝাপড়ার মধ্যে।


পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ সামাজিক সাংস্কৃতিক উৎসব। পুঁজিতান্ত্রিকতার মায়াজালে নির্মিত উৎসব আজ প্রলেতারিয়ার স্বদ্বন্দ্বে ঘরে ঘরে আয়োজিত হচ্ছে। সমাজ পরিবর্তনের সামাজিক বিন্যাসের উৎপাদিত সাংস্কৃতিক উপাদানে মিশ্রিত হয়ে গেছে। যা আজ অপরিশোধেয়। স্বয়ং মার্ক্স কিংবা হেগেলের মন্ত্রও এখানে ব্যার্থ হবে। তবুও এই উৎসবের বিতর্ক থেমে নেই। বিতর্কের বিষয়: এটিকে বাঙালির চিরন্তন সাংস্কৃতিক প্রকাশ বলা হয়, অন্যদিকে এটি একটি আধুনিক রাজনৈতিক নির্মাণ এবং একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠী একে বিদেশি সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বলে প্রত্যাখ্যান-আপত্তি তোলা হয়।

জাতির সকল সদস্যরা কখনোই একে অপরের সাথে সম্পূর্ণভাবে পরিচিত হতে পারে না আর এটা হওয়াও সম্ভব না। কিন্তু অপরিচিত হওয়া সত্ত্বেও আমাদের পথচলা-লড়াইটা থাকে সামগ্রিক। হাজারো মাইল দূরে কোনো বাঙালি পুরষ্কার অর্জন করলে আমরা যেমন আনন্দিত হই। তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে কোনো বাঙালি মারা গেলে আমরা আঘাতপ্রাপ্ত হই। এর কারণ কি? আমরা নিজেদের মধ্যে মানবকল্পিত কিছু সত্তা নির্মাণ করে রেখেছি, যা আমাদেরকে পরস্পরের প্রতি পরস্পরকে আকর্ষিত করে তোলে।

উৎসবও এমন এক সত্তা, যা আমাদের কল্পিত রূপকে বাস্তবায়িত করে। কোটি কোটি বাঙালি একই দিনে বৈশাখ উদযাপন করে, নতুন শাড়ি, ঘরোয়া আয়োজন, ঘুরতে যাওয়া ; এ যেন শৃঙ্খলাপূর্ণ এক নান্দনিক উদযাপন। যা চিরঞ্জীবিনী করে আমাদের প্রাণকে( মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা)।

হালখাতা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার ক্রমবর্ধমান পথচলা। শতাব্দীর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সামাজিক অসামঞ্জস্যতার প্রতিবাদ আর শাসকের অস্ত্রের মধ্যে দিয়ে অসংখ্য বিনির্মানে এর পথচলা আজো থেমে নেই। মুসলিম সম্রাট আকবরের সময়ে প্রশাসনিক উদ্যোগে প্রবর্তিত 'ফসলি সন' — যার মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজস্ব আদায় করা। চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল কৃষক সমাজের উপরে। পরবর্তীকালে কৃষক সমাজ ধীরে ধীরে এই রীতিকে নিজের জীবনছন্দের সাথে মিলিয়ে নিয়েছে অনুষ্ঠানের ( হালখাতা, নবান্ন, বৈশাখী মেলা) মধ্য দিয়ে।

দ্বিতীয় পর্যায়টি, ১৯৬৭ সালে ছায়ানট যখন রমনার বটমূলে প্রথম বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করে, তখন পাকিস্তান সরকার বাঙালি সংস্কৃতির উপর সক্রিয় আঘাত হানছিল। রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল, বাংলা ভাষাকে দুর্বল করার পরিকল্পনা হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বটমূলের অনুষ্ঠান নিছক সাংস্কৃতিক উৎসব ছিল না, এটি ছিল প্রতিরোধের একটি প্রতীকী ভাষা। পাকিস্তান শাসকদের বিরুদ্ধে বাঙালির সাংস্কৃতিক যুদ্ধের অন্যতম মহড়া। পরবর্তীকালে ১৯৮৯ সালে এরশাদবিরোধী স্বৈরাচার আন্দোলন তুঙ্গে থাকার সময়ে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'র সূচনা হয় চারুকলার শিক্ষার্থীদের হাতে।

বাংলাদেশে একটি বিশেষ মৌলবাদী পহেলা বৈশাখকে 'হিন্দুয়ানি উৎসব' বলে প্রত্যাখ্যান করে। একই সাথে এর সংস্কারের দাবি তোলে, যা মূলত উৎসবটিকে স্লোপয়জনে রাখার মতো প্রক্রিয়া। তাদের যুক্তিগুলো একাধিক: মঙ্গল শোভাযাত্রায় পেঁচা, হাতি ও মুখোশ হিন্দু লোকশিল্পের প্রতীক; "মঙ্গল" শব্দটি সংস্কৃত উৎসের; সূর্যোদয়ে উদযাপন প্রকৃতিপূজার আদলে তৈরি। এই আপত্তিগুলো প্রথমে নিরপেক্ষভাবে বোঝা দরকার।

প্রথমত, এটি একটি ক্যাটাগরি ইরোর (category error) সাংস্কৃতিক অনুশীলন আর ধর্মীয় বিশ্বাস এক জিনিস নয়। গলায় ক্রুস চিহ্ন রাখা মানে এই নয় তিনি খ্রিস্টান। মাথা ন্যাড়া হওয়া মানে এই নয়, তার পিতা স্বর্গগামী। পরের আলাপে আসে, "ধর্মনিরপেক্ষ" ও "ধর্মীয়"-এর বিভাজন নিজেই একটি আধুনিক রাজনৈতিক নির্মাণ। মৌলবাদীরা এই বিভাজনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সংস্কৃতিকে "দূষিত" প্রমাণ করতে চায় এবং এর চর্চা থেকে দূরে রাখতে বিবিধ সময়ে বিবিধ ফতোয়া জারি করে।

তবে মৌলবাদী আপত্তির আসল তাৎপর্য ঐতিহাসিক নির্ভুলতার প্রশ্নে নয়। এটি মূলত একটি পরিচয়ের যুদ্ধ। কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি হলো: একজন বাংলাদেশি মুসলমান কি একই সাথে মুসলিম এবং বাঙালি হতে পারে? এই বিষয়ে অমর্ত্য সেনের দেখান যে পরিচয়কে একক সত্তায় পরিণত করার চেষ্টাই সহিংসতার মূল উৎস। একজন মানুষ একই সাথে মুসলিম, বাঙালি, কৃষক, এবং বাংলাদেশি — এই বহুমাত্রিক পরিচয়কে যখন একটিতে মাত্র সীমিত করার দাবি ওঠে, তখনই বিরোধ সৃষ্টি হয়।

এই দৃষ্টিতে মৌলবাদের পহেলা বৈশাখবিরোধিতা আসলে উৎসবের বিরুদ্ধে নয়, এটি বহুমাত্রিক বাঙালি পরিচয়ের বিরুদ্ধে। উৎসবটি যতটা সংস্কৃতির প্রশ্ন, তার চেয়ে বেশি এটি সত্তার প্রশ্ন: আমি কে এবং আমার পরিচয়ের সীমা কে নির্ধারণ করবে? বিগত ছয় দশকে কোটি মানুষের অংশগ্রহণ-আনন্দ-স্মৃতি- আবেগের যে সংমিশ্রণ তৈরি হয়েছে, তা কোনো তাত্ত্বিক সমালোচনা কিংবা প্রেস রিলিজে মুছে যায় না, যাবেও না।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ