টাইব্রেকারে গিলের ‘নায়কোচিত’ পারফরম্যান্সে জার্মানিকে হারাল প্যারাগুয়ে
চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে গেল রাউন্ড অব ৩২-এই। অরল্যান্ডোর ক্যাম্পিং ওয়ার্ল্ড স্টেডিয়ামে দারুণ লড়াইয়ের পর ১২০ মিনিটে ১–১ সমতা থাকায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের অসাধারণ নৈপুণ্যে ৪–৩ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে প্যারাগুয়ে।
শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল জার্মানির হাতে। বল দখল, পাসিং ও আক্রমণে তারা ছিল স্পষ্ট আধিপত্যে। কিন্তু জুলিয়ান নাগেলসমানের দলের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ফিনিশিং। একের পর এক আক্রমণ করেও প্যারাগুয়ের সুসংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে পারছিল না জার্মানরা।
অন্যদিকে পুরো ম্যাচজুড়েই নিজেদের পরিকল্পনায় অটল ছিল প্যারাগুয়ে। রক্ষণ সামলে সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। সেই কৌশল থেকেই ৪২তম মিনিটে এগিয়ে যায় তারা। কর্নার থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে মাতিয়াস গালারসার নিখুঁত ক্রসে হুলিও এনসিসো দারুণ হেডে জাল খুঁজে নিলে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে বিরতিতে যায় প্যারাগুয়ে।
দ্বিতীয়ার্ধে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে নামে জার্মানি। শেষ পর্যন্ত ৫৪তম মিনিটে সমতা ফেরান কাই হাভার্টজ। ফ্লোরিয়ান ভির্টজের চমৎকার ক্রসে হেডে গোল করে ম্যাচে ফেরান তিনি।
এরপরও গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে জার্মানি। হাভার্টজ, ভির্টজ ও ফেলিক্স এনমেচার একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। ৭৭তম মিনিটে হাভার্টজের নিশ্চিত গোলও দুর্দান্ত সেভে ঠেকিয়ে দেন তিনি। নির্ধারিত সময়ে আর গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়েও নাটকের কমতি ছিল না। ১০২তম মিনিটে জোনাথন তাহের হেডে জার্মানি এগিয়ে গেছে বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) দেখার পর গোল বাতিল করা হয়। সিদ্ধান্তে বলা হয়, গোলের আগে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক গিলকে ফাউল করা হয়েছিল।
এরপরও জার্মানি একের পর এক আক্রমণ চালায়। কিন্তু গিল যেন অপ্রতিরোধ্য। অতিরিক্ত সময়ের শেষ ভাগেও অন্তত তিনটি দুর্দান্ত সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন তিনি। ফলে ১২০ মিনিট শেষে স্কোরলাইন থাকে ১–১।
টাইব্রেকারে প্রথম শটেই কাই হাভার্টজকে হতাশ করেন অরল্যান্ডো গিল। এরপর জার্মানির চতুর্থ শটও রুখে দেন তিনি। যদিও প্যারাগুয়ের আন্তোনিও সানাব্রিয়া নিজের শট বাইরে মারায় জার্মানি আবার ম্যাচে ফেরার সুযোগ পায়।
পঞ্চম শটে নাদিম আমিরি গোল করলে এবং এরপর ম্যানুয়েল নয়্যার ফাবিয়ান বালবুয়েনার শট ঠেকিয়ে দিলে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়। প্রথম পাঁচ শট শেষে দুই দলই সমতায় ছিল ৩–৩।
ষষ্ঠ শটে জার্মানির জোনাথন তাহ বল উড়িয়ে মারেন ক্রসবারের ওপর দিয়ে। সেই সুযোগ আর হাতছাড়া করেননি হোসে কানালে। তাঁর সফল শটেই ৪–৩ ব্যবধানে টাইব্রেকার জিতে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করে প্যারাগুয়ে।
ম্যাচের পরিসংখ্যান জার্মানির আধিপত্যই তুলে ধরে। তারা ২১টি শট নেয়, যার ৭টি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে প্যারাগুয়ের শট ছিল মাত্র ৭টি, অন টার্গেট ৪টি। বল দখলেও জার্মানি ছিল ৭৫ শতাংশের মালিক। তারা ৭৫৩টি পাস সম্পন্ন করে ৯২ শতাংশ নিখুঁত পাসিং ধরে রাখে, যেখানে প্যারাগুয়ের পাস ছিল ২৬২টি এবং সফলতার হার ৬৯ শতাংশ।
তবে ফুটবল শেষ পর্যন্ত পরিসংখ্যানের নয়, ফলাফলের খেলা। আর সেই ফল এনে দিয়েছেন গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। ম্যাচজুড়ে অসংখ্য সেভ এবং টাইব্রেকারে দুটি শট ঠেকিয়ে তিনি একাই যেন বিশ্বকাপ থেকে বিদায় লিখে দিলেন চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির।
দুই আসর টানা গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পর এবার নকআউটে উঠলেও ভাগ্য বদলাতে পারেনি জার্মানি। অন্যদিকে অঘটন ঘটিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিয়ে নতুন ইতিহাসের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল প্যারাগুয়ে।
মতামত দিন