ওরস্যালাইন নাকি টেস্টি স্যালাইন, কোনটা কখন খাবেন
বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল মানেই অসহ্য গরম, ঘাম আর শরীর দুর্বল হয়ে পড়ার মৌসুম। এই সময়টায় চারদিকে একটা পরামর্শ বেশি শোনা যায় — "স্যালাইন খাও।" কিন্তু কোন স্যালাইন?
ওরস্যালাইন নাকি টেস্টি স্যালাইন? দুটো কি একই জিনিস? কখন কোনটা দরকার? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না জেনে স্যালাইন খেলে উপকারের বদলে ক্ষতিও হতে পারে। তাই বিষয়টা একটু গভীরে গিয়ে বোঝা দরকার।
আগে জেনে নেওয়া যাক, শরীরে পানি ও লবণের ভারসাম্য কীভাবে কাজ করে?
মানবশরীরের প্রায় ৬০ শতাংশই পানি। এই পানি শুধু কোষের ভেতরে নয়, কোষের বাইরেও থাকে । শরীরের এই পানির ভারসাম্য রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কিছু আয়ন বা ইলেকট্রোলাইট — বিশেষ করে সোডিয়াম (Na⁺), পটাশিয়াম (K⁺), ক্লোরাইড (Cl⁻) এবং বাইকার্বোনেট (HCO₃⁻)।
বিজ্ঞানের ভাষায়, কোষের পর্দা জুড়ে এই আয়নগুলো একটি নির্দিষ্ট ঘনত্বের পার্থক্য বজায় রাখে। কোষের বাইরে সোডিয়াম বেশি, ভেতরে পটাশিয়াম বেশি। এই পার্থক্যটাই কোষকে সচল রাখে। এটাকে বলে electrochemical gradient। এই ভারসাম্য নষ্ট হলেই বিপদ।
গরমে ঠিক কী হয় শরীরে?
তীব্র গরমে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে ঘাম তৈরি করে। এটি একটি প্রাকৃতিক তাপনিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া। ঘাম ত্বকের উপর বাষ্পীভূত হলে শরীর থেকে তাপ বের হয়ে যায়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় শুধু পানি বের হয় না — সাথে বের হয় সোডিয়াম, ক্লোরাইড, পটাশিয়াম এবং অন্যান্য খনিজ।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ ঘণ্টায় আধা লিটার থেকে ২ লিটার পর্যন্ত ঘামতে পারে, এবং প্রতি লিটার ঘামে ৩০ থেকে ৭০ মিলিইকুইভ্যালেন্ট সোডিয়াম থাকে। দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করলে বা ব্যায়াম করলে শরীর থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম বের হয়ে যায়।
ওরস্যালাইন শুধু একটি পানীয় নয় — এটি একটি ঔষধও ।
বিশেষ করে ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতায় মৃত্যুহার কমাতে ওরস্যালাইন ব্যবহার করা হয়।
ওরস্যালাইন পানির মিশ্রণটি রয়েছে সোডিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম সাইট্রেট, পটাশিয়াম ক্লোরাইড, েএবং অ্যানহাইড্রাস গ্লুকোজ যা রক্তের অসমোলালিটির কাছাকাছি একটি দ্রবণ তৈরি করে, যার ফলে শরীর খুব সহজে ও দ্রুত এটি শোষণ করতে পারে।
গরমে ডায়রিয়া বা বমির সাথে তীব্র পানিশূন্যতা দেখা দিলে, দীর্ঘ সময় রোদে কাজের পরে শরীর অত্যধিক দুর্বল হলে, হিটস্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ যেমন মাথা ঘোরা, বমিভাব বা অজ্ঞান হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে মনে রাখতে হবে, প্যাকেটের নির্দেশ অনুযায়ী সঠিক পরিমাণ পানিতে না মিশিয়ে খেলে এটি কার্যকর হয় না , বরং হিতে বিপরীত হতে পারে। অতিরিক্ত ঘন দ্রবণ অন্ত্র থেকে পানি টেনে নিয়ে শরীরে আরো পানি শূণ্যতা তৈরি করতে পারে। । সাধারণত বাজারের যে এক প্যাকেট স্যালাইন পাওয়া যায়, তা ৫০০ মিলি পানিতে মিশাতে হবে।
টেস্টি স্যালাইন — কী আছে এতে, কতটুকু কাজ করে?
টেস্টি স্যালাইন মূলত একটি বাণিজ্যিক ফ্লেভারড ইলেকট্রোলাইট পানীয়। এতে কিছু সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ক্লোরাইড থাকলেও পরিমাণ ও অনুপাত ওরস্যালাইন এর মতো নয়। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো — এতে চিনির পরিমাণ অনেক বেশি, এবং সোডিয়াম তুলনামূলক কম।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, অত্যধিক চিনি দ্রবণের অসমোলালিটি বাড়িয়ে দেয়। এই ধরনের দ্রবণ অন্ত্র থেকে পানি শোষণ করার বদলে কখনো কখনো পানি বের করে দিতে পারে, যা গরমের সময় পান করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তবে গরমে শুধু স্যালাইন খেলেই সুস্থ থাকার পরিকল্পনা না করাই ভালো। প্রতিদিন কমপক্ষে ৮–১০ গ্লাস পানি পান করুন, তৃষ্ণা না লাগলেও। ডাবের পানি প্রাকৃতিকভাবে পটাশিয়াম ও ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ।এছাড়া তরমুজ, শশা, কমলার মতো পানিসমৃদ্ধ ফল খেতে পারেন।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে