প্রতি ২০ মিনিটে একটি শিশু নিখোঁজ, ফেরার হিসাব নেই কারও কাছে
বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজ হওয়ার হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—এই সাত মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় ১৫ হাজার ৯১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। হিসাব করলে দাঁড়ায়, মাসে গড়ে ২ হাজার ২৭৪টি এবং দিনে গড়ে ৭৫টিরও বেশি জিডি। অর্থাৎ প্রতি ২০ থেকে ২১ মিনিটে একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে থানায়।
কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক শিশুর মধ্যে কতজনকে উদ্ধার করা হয়েছে, কতজন নিজে থেকেই বাড়ি ফিরেছে, কতটি জিডি নিষ্পত্তি হয়েছে, কতটি ঘটনায় অপহরণের মামলা হয়েছে, কতটি ঘটনায় পাচারের প্রমাণ মিলেছে আর কতজন এখনো নিখোঁজ রয়ে গেছে; এসব তথ্য একত্র করে নিয়মিত প্রকাশিত কোনো সমন্বিত জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। ফলে বাস্তবে অর্থবহভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে না একটি জিডিও। প্রশ্ন উঠছে, এই ১৫ হাজার ৯১৭টি ঘটনার শেষ পরিণতি আসলে কী হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হিসাব কোথায়? আর এর মধ্য দিয়েই সামনে এসেছে বাংলাদেশের শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত তথ্যব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ১৫ হাজার ৯১৭টি জিডিকে সরাসরি ১৫ হাজার ৯১৭ জন শিশু এখনো নিখোঁজ বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। একটি শিশু খেলতে গিয়ে হারিয়ে যেতে পারে, পথ ভুল করতে পারে, অভিমান করে বাড়ি ছাড়তে পারে, কিংবা পরিবারের অজান্তে অন্য কোথাও চলে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে। সমস্যা হলো, শিশু ফিরে আসার পর পরিবার আর থানায় গিয়ে সে খবর জানাচ্ছে না, আবার এই আপডেট রাখার মতো আলাদা জনবলও পুলিশের নেই। ফলে পুলিশের নথিতে একটি নিখোঁজের জিডি থেকে যাওয়া মানেই সেই শিশু সত্যিই এখনো হারিয়ে আছে, এমনটা নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থায় অন্তত সাত ধরনের ফলাফল আলাদা করে নথিভুক্ত করা দরকার—উদ্ধার হওয়া, নিজে বাড়ি ফেরা, অন্যত্র পাওয়া যাওয়া, অপহরণের মামলা হওয়া, পাচারের শিকার হিসেবে শনাক্ত হওয়া, মৃত্যু এবং এখনো নিখোঁজ থাকা। তাদের মতে, ১৫ হাজার ৯১৭ সংখ্যাটিকে সরাসরি অপরাধ, অপহরণ বা পাচারের সংখ্যা হিসেবে দেখানো যেমন ভুল, তেমনি এই জিডিগুলোর পরিণতি অনুসরণ না করাও একটি গুরুতর প্রশাসনিক ঘাটতি।
এই ঘাটতির একটা বড় কারণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা তথ্য একসঙ্গে সমন্বয় করা হয় না। থানার জিডি, পুলিশের তদন্ত, সিআইডি বা পিবিআইয়ের অনুসন্ধান, হাসপাতাল ও মর্গের তথ্য এবং বেসরকারি নিখোঁজ-শিশু প্ল্যাটফর্ম—এই সবগুলো তথ্য একই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত না হলে পরিসংখ্যানটি কেবল ‘জিডির সংখ্যা’ হয়েই থেকে যায়, শিশুটির প্রকৃত পরিণতির তথ্য হয়ে ওঠে না।
এই সমন্বয়হীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বেসরকারি সংস্থা নারী মৈত্রীর প্রোগ্রাম ম্যানেজার তাসলিমা হুদা স্বপ্নাও। তিনি ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, শিশু নিখোঁজ ঠেকাতে এখনই বাস্তবমুখী উদ্যোগ দরকার। তার পরামর্শ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পাচার প্রতিরোধে জরুরি সেবা ১০৯ কিংবা শিশুদের জন্য নির্ধারিত হেল্পলাইন ১০৯৮ নম্বরকে কেন্দ্র করে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে, যাতে যে কেউ দ্রুত সহায়তা চাইতে পারে। পাশাপাশি সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি করে এই প্রবণতা প্রতিরোধ, সরকারি প্রচারণা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে ঘরে ঘরে গিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর পরামর্শ দেন তিনি।
তাসলিমা হুদা স্বপ্না মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক কনটেন্ট তৈরি এবং প্রয়োজনে প্রতিদিন ছোট আকারের বুলেটিন প্রচার করেও শিশু নিখোঁজের বিষয়ে মানুষকে সজাগ রাখা সম্ভব। তাঁর মতে, বিশেষভাবে নজর দেওয়া দরকার ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের দিকে, কারণ এই বয়সসীমার শিশুরাই ঝুঁকিতে বেশি পড়ে বলে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও উদ্ধারের জন্য ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি চালু করা হয়েছে ‘MUN Alert-মুন এলার্ট’ নামের একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা তথ্য জানানো যায় এবং শিশুর ছবি ও সর্বশেষ অবস্থানসহ তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অতিরিক্ত আইজিপি মো. সিবগাত উল্লাহ জানান, আন্তর্জাতিক গবেষণার ভিত্তিতে দেখা গেছে শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরের কয়েক ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর দ্রুত পদক্ষেপ নিলে উদ্ধারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘মুন এলার্ট’-এর মূল উদ্দেশ্য হলো নিখোঁজ বা অপহৃত শিশুর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া এবং পাওয়া তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করে ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে জরুরি সতর্কবার্তা জারি করা। তবে যেহেতু থানাগুলোর তথ্যের সঙ্গে এই উদ্যোগের সমন্বয় এখনো হয়নি, তাই ‘মুন এলার্ট’-এর কেস সংখ্যা আর পুলিশের ১৫ হাজার ৯১৭টি জিডির সংখ্যা সরাসরি তুলনা করা যাবে না।
সিবগাত উল্লাহ জানান, ভবিষ্যতে পুলিশের অন্যান্য হটলাইনও এর সঙ্গে যুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে। এ ছাড়া সীমান্ত পার হওয়া বা শিশু পাচারের আশঙ্কা থাকলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘ইয়োলো নোটিশ’ জারির ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে সিআইডি।
তবে ‘মুন এলার্ট’-এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ আছে, কোনো কোনো ঘটনায় শিশুর সর্বশেষ অবস্থান, সময় ও যোগাযোগের তথ্য দ্রুত প্রকাশ করা হলেও পরবর্তী আপডেটে শিশুর সন্ধান পাওয়ার তথ্য থাকে না। যেমন নারায়ণগঞ্জের ছয় বছর বয়সী ইউসুফ রাফির ঘটনায় গত ২৯ জুন নিখোঁজের তথ্য প্রকাশ হলেও সংশ্লিষ্ট পেজে এখনো তাকে খুঁজে পাওয়ার কোনো তথ্য নেই।
শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু নিখোঁজের তথ্য প্রকাশ করলেই হবে না, একটি কেস কখন ও কীভাবে শেষ হলো, সেটিও একই ব্যবস্থায় নথিভুক্ত করা জরুরি। একইসঙ্গে তারা মনে করেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, হাসপাতাল, মর্গ এবং সীমান্তবর্তী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার পর তার অবস্থান বা সর্বশেষ অবস্থা জানা অনেক সহজ হবে। শিশুদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান নব আনন্দের প্রতিষ্ঠাতা শামীমা শওকত লাভলীও এই সমন্বয়হীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
শামীমা শওকত লাভলী ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘শিশু নিখোঁজ হওয়ার এই প্রবণতার পেছনে বড় একটা কারণ হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। এলাকায় এলাকায় নিরাপত্তা যতটা থাকা দরকার, ততটা এখন নেই। ফলে একটা শিশু বাসার বাইরে গেলে বা স্কুল-মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে বিপদে পড়তে পারে, এই আশঙ্কা এখন বাস্তব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে অনেক মা নিজেরাই এসে তাদের সন্তানদের নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, বাচ্চাকে চোখের আড়াল করতেই ভয় লাগে। এই আতঙ্ক এখন শুধু কোনো একটা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, পুরো সমাজেই একটা অস্বস্তি ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’ শিশু নিখোঁজের এই পরিসংখ্যান আসলে সেই বাস্তব আতঙ্কেরই প্রতিফলন বলে মনে করেন তিনি।
এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে অভিযোগ তুলেছেন, হারিয়ে যাওয়া এসব শিশুকে অপহরণ করে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজের এই জিডিগুলোর সঙ্গে শিশু পাচারের সরাসরি সম্পর্ক আছে, এমন কোনো প্রমাণ এখনো তাদের কাছে নেই। তবে নিখোঁজ শিশুদের ক্ষেত্রে পাচারের আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই বলে পুলিশ স্বীকার করেছে।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের ২০২৫ সালের একটি গবেষণা বলছে, নারী ও শিশু পাচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একই সঙ্গে উৎস, ট্রানজিট ও গন্তব্য দেশ—তিন ভূমিকাতেই আছে। দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি, শিশুবিয়ে ও অনিরাপদ অভিবাসনের মতো নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে শিশুদের এই ঝুঁকি আরও বাড়ে। একই গবেষণা বলছে, প্রকৃত সমস্যার তুলনায় শনাক্ত হওয়া ও সহায়তা পাওয়া শিশুর সংখ্যা অনেক কম হতে পারে।
শিশু নিখোঁজ ও পাচারের সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর একটি র্যাপিড অ্যাসেসমেন্টও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। পাটগ্রাম, শিবগঞ্জ ও টেকনাফ—এই তিন এলাকায় শনাক্ত হওয়া ৬১টি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তাদের ৬১ শতাংশ ছেলে আর ৩৯ শতাংশ মেয়ে। ৬৭ শতাংশ শিশু বাড়ি থেকেই নিখোঁজ হয়েছিল, আর ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের হার ছিল ৫৪ শতাংশ। প্রায় অর্ধেক শিশুকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, আর টেকনাফে উদ্ধার হওয়া ১০ শিশুকে পরে পাচারের শিকার হিসেবে শনাক্ত করা হয়। তবে শিশু অধিকারকর্মীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এটি কোনো জাতীয় পরিসংখ্যান নয় এবং পুলিশের ১৫ হাজার ৯১৭টি জিডির ওপর এটি সরাসরি প্রয়োগ করা যাবে না। তাদের ভাষায়, ‘নিখোঁজ’ আর ‘পাচার’কে এক করে দেখা যেমন ভুল, তেমনি নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনায় পাচারের আশঙ্কা যাচাই না করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
নিখোঁজ শিশুর প্রকৃত পরিণতি নির্ধারণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের তথ্য। কোনো নিখোঁজ শিশুর মরদেহ পরে উদ্ধার হলেও যদি তার পরিচয় শনাক্ত না হয়, আর নিখোঁজের ডেটাবেসের সঙ্গে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ডেটাবেসের কোনো স্বয়ংক্রিয় মিল-ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেই শিশুর নিখোঁজ কেস দীর্ঘদিন ‘অমীমাংসিত’ হয়েই থেকে যেতে পারে। এ কারণে প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর বয়স, লিঙ্গ, ছবি, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, সর্বশেষ অবস্থান ও পরিবারের যোগাযোগের তথ্যের পাশাপাশি হাসপাতাল ও মর্গে পাওয়া অজ্ঞাতপরিচয় শিশুর মরদেহের তথ্যও একই কাঠামোয় সংরক্ষণ করা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা একটি জাতীয় পর্যায়ের ‘ম্যাচিং সিস্টেম’ গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে বলছেন, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর সে ফিরে এলে যেমন সেই তথ্য নথিভুক্ত হওয়া দরকার, তেমনি তাকে অপহরণ করা হলে, পাচারের শিকার হলে, অন্য কোথাও পাওয়া গেলে কিংবা তার মৃত্যু হলে—প্রতিটি পরিণতিই একই কেসের সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
মতামত দিন