সম্পর্ক নয়, বিচ্ছেদও নয়; জেন জি-র নতুন ডেটিং ট্রেন্ড ‘ডায়াল-টোনিং’
সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচয়, নিয়মিত কথাবার্তা, একে অপরকে ভালো লাগা, এমনকি সম্পর্কের সম্ভাবনাও তৈরি হলো। কিন্তু হঠাৎ করেই থেমে গেল যোগাযোগ। আশ্চর্যের বিষয়, কেউ কাউকে আনম্যাচও করলেন না। এরপর সপ্তাহ কিংবা মাসের ব্যবধানে ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে প্রতিক্রিয়া, ছবিতে লাইক অথবা ছোট্ট কোনো ইমোজির মাধ্যমে আবারও নিজের উপস্থিতির জানান দেওয়া। সম্পর্কের এই অনির্দিষ্ট অবস্থাকেই এখন নতুন একটি নামে ডাকা হচ্ছে, ‘ডায়াল-টোনিং’।
আধুনিক ডেটিং সংস্কৃতিতে জেন জি প্রজন্মের মধ্যে এমন আচরণ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। সহজভাবে বললে, কাউকে পুরোপুরি কাছে টানা নয়, আবার জীবন থেকেও সরিয়ে দেওয়া নয়। সরাসরি সম্পর্কে না গিয়েও যোগাযোগের ক্ষীণ সুতোটি ধরে রাখাই ‘ডায়াল-টোনিং’। এতে দুজনের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলেও একজন আরেকজনের জীবনে সম্ভাবনার জায়গাটি খোলা রাখেন।
কেন এমন করছেন তরুণেরা?
মনোবিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কাজ করতে পারে দ্বিধা, অনিশ্চয়তা এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার ভয়। অনেকেই হয়তো এই মুহূর্তে সম্পর্কে যেতে চান না। আবার পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে সম্ভাবনাময় একজন মানুষকে হারাতেও রাজি নন। ফলে সম্পর্কের দরজা পুরোপুরি বন্ধ না করে সেটি সামান্য খোলা রাখার প্রবণতা দেখা যায়।
একাকিত্ব, কৌতূহল কিংবা ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার প্রত্যাশাও এ ধরনের আচরণের অন্যতম কারণ হতে পারে। কারও সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি না হলেও তাকে সম্ভাব্য ‘ব্যাকআপ’ হিসেবে ধরে রাখার মানসিকতাও এতে ভূমিকা রাখে। ফলে সরাসরি যোগাযোগের পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোটখাটো প্রতিক্রিয়াই হয়ে ওঠে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার মাধ্যম।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
ভারতের একটি জনপ্রিয় ডেটিং প্ল্যাটফর্মের সাম্প্রতিক জরিপে এ প্রবণতার বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। দিল্লি, মুম্বাই, হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরুর মতো টিয়ার-১ শহরের ৪৫ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা মনে করেন, তরুণদের মধ্যে ‘ডায়াল-টোনিং’-এর প্রবণতা বাড়ছে।
১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী উত্তরদাতাদের ৫৫ শতাংশ জানিয়েছেন, কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই তারা মাসের পর মাস কোনো ম্যাচকে এভাবে ধরে রেখেছেন। অন্যদিকে ২৬ বছরের বেশি বয়সী ১৯ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, সময় ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় তারা সম্পর্কটি শেষও করেননি, আবার নতুন করে এগিয়েও যাননি।
ছোট্ট একটি লাইক, বড় প্রত্যাশা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও স্টোরি দেখা, ছবিতে লাইক দেওয়া কিংবা একটি ইমোজি পাঠানো খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন বিচ্ছিন্ন সংকেতই অনেক সময় অপর পক্ষের মনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে। তখন প্রশ্ন জাগে, ‘আবার কি আগ্রহ তৈরি হয়েছে?’ কিংবা ‘সম্পর্কটি কি আবার শুরু হতে পারে?’
মনোবিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অস্পষ্ট সংকেত মানুষকে এমন একটি সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে, যার বাস্তবে কোনো সুস্পষ্ট অস্তিত্ব নেই। ফলে অপেক্ষা, কৌতূহল ও নানা ধরনের মানসিক বিশ্লেষণের মধ্যে আটকে থাকতে পারেন অপর পক্ষের মানুষটি।
গোস্টিং থেকে কতটা আলাদা?
‘ডায়াল-টোনিং’-এর সঙ্গে বহুল পরিচিত ‘গোস্টিং’-এর পার্থক্য মূলত যোগাযোগের ধরনে। গোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি হঠাৎ করেই কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে যান। অন্যদিকে ডায়াল-টোনিংয়ে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয় না। বরং দীর্ঘ বিরতির পর লাইক, স্টোরি রিঅ্যাকশন কিংবা ইমোজির মতো ছোট ছোট সংকেতের মাধ্যমে অপর ব্যক্তিকে নিজের অস্তিত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, সম্পর্কটি এগোয় না, আবার শেষও হয় না। দুজনের মাঝখানে তৈরি হয় এক ধরনের অনিশ্চিত অবস্থান। আধুনিক ডেটিং সংস্কৃতিতে এই অস্পষ্ট সম্পর্কের ধরনই এখন পরিচিত হচ্ছে ‘ডায়াল-টোনিং’ নামে।
মতামত দিন