Views Bangladesh Logo

৭ মার্চে ব্যবহৃত ‘কল রেডী’র সেই মাইক্রোফোন কোথায় জানে না কেউ, প্রতিষ্ঠানও বন্ধ

Misbah  Jamil

মিসবাহ জামিল

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছিল ‘কল রেডী’ মাইক্রোফোন সার্ভিস। আজও যখন বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি কোথাও বাজে তখন অবচেতনভাবেই বঙ্গবন্ধুর তেজদীপ্ত মুখের সামনে থাকা মাইক্রোফোনে লেখা কল রেডী শব্দটি আমাদের ভাবনায় চলে আসে। তবে স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রম হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো স্বীকৃতি মেলেনি কল রেডীর। শুধু তাই নয়, যে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই মাইক্রোফোনটির জায়গা হয়নি জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কিংবা বঙ্গবন্ধু জাদুঘরেও।

সর্বশেষ ২০২৪ সালে জানা যায়, সেটি আন্তর্জাতিক নিলামে উঠবে। এরপর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই মাইকের নেই কোনো খোঁজ। এমনকি সেই প্রাতিষ্ঠান কল রেডীও বন্ধ রয়েছে।

নিলামে উঠতে যাওয়া সেই ঐতিহাসিক মাইক্রোফোনের বর্তমান অবস্থান জানতে অনুসন্ধান চালায় ভিউজ বাংলাদেশ। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের ঋষিকেশ দাস রোডে গিয়ে লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে তারা এ ব্যাপারে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন।

কল রেডীর দোকানের সামনে দাঁড়িয়েই স্থানীয় একজনকে প্রশ্ন করলে তিনি প্রথমে বলেন, ‘খোঁজ করেন, আশপাশে কোথাও হয়তো আছে।’ এরপর জোরাজোরি করলে তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘আমি কিছুই বলব না। আপনারা চলে যান।’ পরিচয় জানতে চাইলেও তিনি এড়িয়ে যান।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক তরুণ দোকানটির সামনে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, দোকানটি তালাবদ্ধ, নেই কোন সাইনবোর্ড।

দোকান মালিকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জানা যায়, তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আড়ালে চলে গেছেন। তার ফোন নম্বরও সংগ্রহ করা যায়নি। ফলে দোকানের সামনে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কথা বলার মতো কাউকেই পাওয়া যায়নি।



কলরেডী সাউন্ড সিস্টেমের ডান পাশে থাকা সুবর্না টেইলার্সের কর্মী নিখিল দে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বহুদিন থেকে বন্ধ দেখছি। কিন্তু কী কারণে বন্ধ, এটা বলতে পারব না।’


কল রেডী সাউন্ড সিস্টেমের বাম পাশে থাকা স্বপ্নবর্ণ ড্রাগ হাউজের প্রকাশ চন্দ্র নন্দী ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তারা দোকানটি বন্ধ রাখছেন।’ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ভয় থেকে এমনটা হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এর বেশি কিছু বলতে চাননি।

কল রেডীর বিপরীত পাশে অবস্থিত চায়ের দোকানের মালিক আনছার আলি ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কল রেডী বন্ধ হয়ে যায়। আর খুলতে দেখা যায়নি। ওরা রাজনৈতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাইকসহ সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া দিত। জমজমাট ব্যবসা ছিল তাদের। সবাই চিনত। শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের ৭ মার্চে যে ভাষণ দিয়েছেন, সেখানে কল রেডীর মাইক ছিল। সবাই চেনে তাদের।’

কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপে কল রেডী বন্ধ হয়েছে কি না- এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘না, কেউ চাপ দিয়েছে বা হামলা করেছে, এরকম আমরা দেখিনি। ৫ আগস্ট রাতেই কর্তৃপক্ষ দোকানের সাইনবোর্ড নামিয়ে ফেলে এবং সাটার বন্ধ করে রাখে। এরপর থেকে আর কার্যক্রম চালায়নি তারা। এখনো বন্ধই আছে।’

প্রিয়াঙ্গন ডিজিটাল ফটোগ্রাফির কর্ণধার শংকর বড়াল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘এটা এখানের সবচেয়ে প্রাচীন ও পরিচিত সাউন্ড সিস্টেম। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের জন্য এটি বিখ্যাত। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এটি বন্ধ হয়ে যায়। খুলতে দেখা যায় না আর।’

বাইক মেরামতকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দা তুষার সরকার ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর তাদের কর্মচারীরাও চলে গেছে।’

কল রেডীর দোকানটি যে ভবনে রয়েছে, সেটির মালিক কল রেডীর কর্ণধাররাই। ভবনের সামনে কিছুক্ষণ অবস্থান করলে ওই ভবনের এক ভাড়াটিয়ার সাথে কথা বলেও কল রেডী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার কোন উপায় পাওয়া সম্ভব হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জনপ্রিয় মাইক সার্ভিস ‘কল রেডী’র প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দুই ভাই হরিপদ ঘোষ ও দয়াল ঘোষ। হরিপদ ঘোষের চার ছেলে কল রেডী মাইক সার্ভিস প্রতিষ্ঠানটি দেখভাল করে আসছিলেন। পুরান ঢাকার প্রায় সব অনুষ্ঠানেই কল রেডীর সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া যেত। নতুন নতুন যন্ত্রপাতির সঙ্গে নতুন নতুন সাউন্ড সিস্টেম যুক্ত করে তারা ভালো ব্যবসা করে আসছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য স্বাধীনতার পর থেকেই স্বীকৃতি চেয়ে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। তাদের সে স্বীকৃতি মেলেনি। বরং ইতিহাসের সাক্ষী কল রেডীর ঐতিহাসিক মাইক ও যন্ত্রপাতি বেহাত হয়ে যাওয়ার ভয়ে সেগুলো বিদেশে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। সর্বশেষ, ২০২৪ সালে জানা যায়, সেই ঐতিহাসিক মাইকটি তোলা হবে নিলামে। এরপর আর এই বিষয়ে কিছুই জানা যায়নি।

অথচ, ৭মার্চ পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই রেসকোর্স ময়দানে মাইক এবং অন্যান্য সরঞ্জাম পাঠিয়েছিল কল রেডী। সেসময় রেসকোর্সে মাইক লাগানো সহজ ছিল না। কারণ শাসকগোষ্ঠীর সতর্ক চোখ ছিল রেসকোর্স ময়দানে। জনসভা যাতে সফল না হয় সেজন্য ছিল প্রতিবন্ধকতা। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, রেসকোর্স ময়দানে মাইক পাঠানো হলে সংশ্লিষ্টদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। তাই অনেকেই হরিপদ ঘোষ ও দয়াল ঘোষকে এই কাজে না জড়ানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু, বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা সাহসিকতার সঙ্গে কল রেডীর মাধ্যমে মাইক সরবরাহের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে ধীরে ধীরে আন্দোলনের স্রোত জোরালো হতে শুরু করে। এই উত্তাল সময়ে ১৯৪৮ সালে বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) শ্রীনগর থানার মঠবাড়িয়া গ্রামের দুই ভাই হরিপদ ঘোষ ও দয়াল ঘোষ পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে ‘আরজু লাইট হাউজ’ নামে একটি আলোকসজ্জার দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে দোকানটিতে আলোকসজ্জার সরঞ্জামের পাশাপাশি গ্রামোফোন ভাড়াও দেওয়া হতো। অল্প সময়ের মধ্যেই এলাকাজুড়ে দোকানটির পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে।


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন ও সভা-সমাবেশে মাইকের প্রয়োজন বাড়তে থাকায় আন্দোলনের নেতাকর্মীরা ‘আরজু লাইট হাউজ’ থেকে মাইক ভাড়া নিতে শুরু করেন। চাহিদা বাড়তে থাকায় হরিপদ ঘোষ তাইওয়ান, জাপান ও চীন থেকে মাইকের মূল যন্ত্রাংশ আমদানি করতে থাকেন। মূল ইউনিট বাইরে থেকে আনা হলেও দোকানের নিজস্ব কারিগরদের দিয়ে তিনি মাইকের অন্যান্য অংশ তৈরি করাতেন।

বিশেষ করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর পূর্ব পাকিস্তানে সভা-সমাবেশের সংখ্যা বেড়ে যায়। পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও মাইকের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা মাথায় রেখে মাইক সার্ভিসের জন্য একটি নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির নাম হয়ে যায় ‘কল রেডী’। নামটির অর্থ ও তাৎপর্য হলো- কেউ কল করলেই মাইক প্রস্তুত থাকবে। কল করলেই রেডি— ‘কল রেডী’।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ