গোল নেই, অ্যাসিস্টও নয়—তবু ম্যাচসেরা ইয়ামাল! বদলে যাচ্ছে কি ফুটবলে ‘সেরার’ সংজ্ঞা?
ফুটবলে ম্যাচসেরার পুরস্কার মানেই যেন গোলদাতা কিংবা অ্যাসিস্টদাতার হাতে ট্রফি। স্কোরশিটে নাম থাকলেই সাধারণত আলোটা তার দিকেই যায়। কিন্তু ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল সেই প্রচলিত ধারণাকেই যেন নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালেন।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে স্পেনের ৩-০ গোলের জয়ে ইয়ামালের নাম ছিল না কোনো গোলদাতার তালিকায়, ছিল না কোনো অ্যাসিস্টও। অথচ ম্যাচ শেষে 'প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ' পুরস্কার উঠল তার হাতেই। সিদ্ধান্তটি ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। দুই অ্যাসিস্ট করা মার্ক কুকুরেয়া কিংবা জোড়া গোল করা মিকেল ওইয়ারসাবালকে পেছনে ফেলে কীভাবে ম্যাচসেরা হলেন ইয়ামাল—এই প্রশ্নই এখন ফুটবল দুনিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
তবে ম্যাচের পরিসংখ্যানের বাইরের গল্পটি ভিন্ন। পুরো ম্যাচজুড়ে অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগকে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত রেখেছিলেন ইয়ামাল। ডান প্রান্তে তার গতি, ড্রিবলিং, অবস্থান বদল, প্রতিপক্ষের একাধিক ডিফেন্ডারকে নিজের দিকে টেনে নেওয়া এবং স্পেনের আক্রমণের ছন্দ তৈরি করে দেওয়ার ভূমিকাই শেষ পর্যন্ত তাকে ম্যাচসেরার আসনে বসিয়েছে। গোল বা অ্যাসিস্ট না থাকলেও আক্রমণের প্রায় প্রতিটি বিপজ্জনক মুহূর্তের পেছনে ছিল তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব।
স্পেনের সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম বড় কারণ হিসেবেও উঠে আসছে ইয়ামালের এই ‘অদৃশ্য প্রভাব’। বিশ্বকাপের শুরুতে ইনজুরির কারণে পূর্ণ ছন্দে ছিলেন না তিনি। কিন্তু ফিট হয়ে দলে ফেরার পর থেকেই স্পেনের আক্রমণে ফিরে এসেছে গতি, বৈচিত্র্য ও ধার। প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে ভেঙে ফেলার মতো জায়গা তৈরি করে দিচ্ছেন তিনি, যার সুফল পাচ্ছেন তার সতীর্থরা।
এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক বলছেন, আধুনিক ফুটবলে ম্যাচসেরা নির্বাচন আর শুধু গোল কিংবা অ্যাসিস্টের ওপর নির্ভর করছে না। একজন খেলোয়াড় পুরো ম্যাচে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছেন, প্রতিপক্ষের কৌশল কতটা বদলাতে বাধ্য করেছেন কিংবা দলের সামগ্রিক খেলায় কতটা অবদান রেখেছেন—এসব বিষয়ও এখন সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইতিহাসে বিরল ঘটনা
ফিফা বিশ্বকাপে এমন ঘটনা অবশ্য খুব একটা দেখা যায় না। ২০০৬ বিশ্বকাপে ইউক্রেনের বিপক্ষে ইতালির কোয়ার্টার-ফাইনাল জয়ের ম্যাচে জেন্নারো গাত্তুসো 'ম্যান অব দ্য ম্যাচ' হয়েছিলেন। যদিও ওই ম্যাচে তিনি গোল করেননি। তবে সেই টুর্নামেন্টে গাত্তুসোর ছিল একটি অ্যাসিস্ট এবং পুরো প্রতিযোগিতাজুড়ে তার অবিশ্বাস্য রক্ষণাত্মক অবদান ইতালিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
তবে ইয়ামালের এই পুরস্কারকে সরাসরি গাত্তুসোর সঙ্গে তুলনা করা সহজ নয়। কারণ, গাত্তুসো ছিলেন রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার, যার কাজই ছিল প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়া। অন্যদিকে ইয়ামাল একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। তাই গোল বা অ্যাসিস্ট ছাড়াই তার ম্যাচসেরা হওয়া স্বাভাবিকভাবেই বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পরিসংখ্যানের বাইরে যে ফুটবল
একসময় ফুটবলে একজন ফরোয়ার্ডকে বিচার করা হতো শুধু গোল দিয়ে। এখন চিত্র বদলেছে। আধুনিক বিশ্লেষণে গুরুত্ব পাচ্ছে 'প্রগ্রেসিভ ক্যারি', 'কি স্পেস ক্রিয়েশন', 'প্রেসিং', 'ডিফেন্ডার আকর্ষণ', 'বিল্ড-আপ ইনভলভমেন্ট' এবং 'ট্যাকটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স'-এর মতো সূচক।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়তো ইয়ামালের ম্যাচসেরা হওয়া। কারণ তিনি স্কোরশিটে না থেকেও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন, প্রতিপক্ষের রক্ষণকে অস্থির রেখেছেন এবং সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছেন—যার সবকিছু সংখ্যায় ধরা পড়ে না।
বিতর্ক চলবেই
তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—দুই অ্যাসিস্ট করা কুকুরেয়া অথবা জোড়া গোল করা ওইয়ারসাবাল কি পুরস্কারটির বেশি দাবিদার ছিলেন না?
উত্তরটি হয়তো কখনোই একরকম হবে না। তবে ইয়ামালের এই পুরস্কার অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—আধুনিক ফুটবলে 'ম্যাচসেরা' হওয়ার সংজ্ঞা বদলাচ্ছে। এখন আর সব আলো শুধু গোলদাতার ওপর পড়ে না; কখনো কখনো ম্যাচের সবচেয়ে বড় নায়ক হন সেই ফুটবলার, যার প্রভাব স্কোরবোর্ডে নয়, পুরো ম্যাচের ছন্দে ছড়িয়ে থাকে। আর সেই কারণেই, গোল কিংবা অ্যাসিস্ট ছাড়াও লামিনে ইয়ামাল এখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত 'প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ'।
মতামত দিন