নির্মলেন্দু গুণ ও সেলিনা হোসেনের স্মৃতিতে ৭ মার্চ
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ছিল পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা। ইউনেস্কো ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের সেই আগুনরাঙা দিনে লাখ লাখ বাঙালি জড়ো হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে। রেসকোর্সের বিশাল ময়দানটি তখন কানায় কানায় পূর্ণ।
সেদিন আঙুল উঁচিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম...
কবি নির্মলেন্দু গুণ ও কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন স্মৃতিতে উঠে এসেছে সেদিনের টুকরো চিত্র।
নির্মলেন্দু গুণ
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ মুক্তিকামী তৃতীয় বিশ্বের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (পূর্ব প্রচলিত নাম রেসকোর্স ময়দান) ১০ লক্ষাধিক মানুষের এক বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেছিলেন, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল জনসভামঞ্চের খুব কাছ থেকে, সাংবাদিকদের জন্য সংরক্ষিত বেঞ্চে বসে সেই কালজয়ী ভাষণ শোনার। আমি তখন শিল্পপতি ও গীতিকার আবিদুর রহমান সম্পাদিত ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য পিপল’ পত্রিকায় কাজ করি।
৭ মার্চ সিদ্ধান্ত নিলাম, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে আমিও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাব।
ওই ভাষণটিই যে বিশ্ব-ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে মানবজাতির অনন্য দলিলরূপে গণ্য হবে, তা কে জানত? তবে বঙ্গবন্ধু যে ওইদিন একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন, তা মানুষের মুখে-মুখে এবং ঢাকার আকাশে-বাতাসেও ধ্বনিত হচ্ছিল।
রেসকোর্সের বিশাল ময়দানটি তখন কানায় কানায় পূর্ণ। মঞ্চের কাছে সাংবাদিকদের জন্য সংরক্ষিত আসনে বসতে পেরে আমি নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান বলে ভাবতে থাকি। বঙ্গবন্ধুর জনসভাস্থলে আসতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছিল। তখন জাহিদ ভাই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা আ স ম আবদুর রবের সঙ্গে কিছু কথা বলেন। কথাগুলো ছিল এ রকম: ‘কী আপনার নেতা কি আজ স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন?’
তখন ছাত্রনেতা আ স ম রব পাঞ্জাবির আস্তিন গোটাতে গোটাতে বলেন, ‘উনি না করলে আজকে আমরাই স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেব।’
জাহিদ ভাই তখন রবকে বিদ্রুপ করে বলেন, ‘দেখা যাবে। নেতা এলে তো আপনারা সবাই বিড়াল হয়ে যাবেন।’
আ স ম আবদুর রব জাহিদ ভাইয়ের ওই বিদ্রুপের কী জবাব দিয়েছিলেন আমার স্মৃতিতে নেই। স্মৃতিতে নেই এজন্য যে, সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঠিক তখনই রেসকোর্স ময়দানে সমবেত জনসমুদ্রের জয়ধ্বনিতে বঙ্গবন্ধুর আগমনবার্তা প্রচণ্ড ঢেউয়ের মতো সমুদ্রসৈকতে ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি একটি সাদা গাড়িতে চড়ে রমনা পার্কের দিক থেকে রেসকোর্স ময়দানে প্রবেশ করেন।
নেতাকে স্বাগত জানিয়ে ময়দানে আগত লাখো কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে:
‘শেখ মুজিবের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর
তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব
তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’
এত বড় একটি জনসভায় ভাষণ দেয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা তার ছিল না। শুধু তার কথাই বলি কেন? এত বড় জনসভায় ভাষণ দেয়ার ভাগ্য বিশ্বের কোনো নেতার হয়েছে কি? আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না, তিনি কী বলে সম্বোধন করবেন এই বিশাল জনতাকে। তিনি জনসমুদ্রের ওপর চকিতে তার চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর দুই হাত তুলে নমিত ভঙ্গিতে জনসমুদ্রকে শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত করলেন। মুহূর্তে থেমে গেল সমুদ্রগর্জন।
রোস্ট্রামের সামনে সাজানো মাইক্রোফোনগুলোর দিকে সামান্য ঝুঁকে তিনি শুরু করলেন তার সেই ঐতিহাসিক কালজয়ী ভাষণ।
বললেন, ‘ভায়েরা আমার।...’
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত কণ্ঠের বজ্রভাষণ শুনলাম। আমার আশপাশের রিপোর্টাররা তার কথা কাগজে টুকে নিচ্ছিলেন। আমারও উচিত ছিল তাই করা; কিন্তু আমি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে শুনতে কোথায় যেন হারিয়ে যাই। একসময় তার ভাষণ শেষ হয়। লাখো মানুষের ‘জয়য়য়য়য় বাংলা’ ‘জয়য়য়য়য় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনি শ্রবণ করতে করতে তিনি মঞ্চ ত্যাগ করে উদ্যানের মাটিতে পা রাখেন।
অফিসে ফিরে গিয়ে কাগজ-কলম নিয়ে রিপোর্ট লিখতে বসি; কিন্তু কিছুতেই স্মরণ করতে পারি না বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে আসলে কী বলেছেন। শুধু একটি বাক্যই ঘুরে ঘুরে আমার মনে পড়তে থাকে। পিন আটকে যাওয়া ভাঙা রেকর্ডের মতো ওই বাক্যটিই আমার মনের মধ্যে ধ্বনিত হতে থাকে: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয়য়য়য় বাংলা।’
সেলিনা হোসেন
৭ মার্চ ১৯৭১ সাল। সেদিনের বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বসে যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসাধারণ ভাষণটি শুনেছিলাম, সে সময় ভাবিনি ‘সাতই মার্চের বিকেল’ নামে কোনো উপন্যাস আমি লিখতে পারব। ঐতিহাসিক সেই ৭ মার্চে আমার সঙ্গে ছিল আমাদের বন্ধু নমিতা সান্যাল। আমাদের সবারই সেদিন মনে হয়েছিল, পিছু হটার দিন আর নেই। ওই ভাষণটি মাথায় নিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি মাঠে। ভেবেছি ভিড় কমলে বের হব। মেয়েদের জন্য বাঁশ দিয়ে ঘেরাও করা একটি জায়গা ছিল মঞ্চের কাছে। কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন সেখানে, আমি ছিলাম তার কাছাকাছি। খালাম্মার সঙ্গে কথা বলে বের হই একটু পরে। বের হবার পথে একজন বাদাম বিক্রেতার কাছ থেকে বাদাম কিনলাম। বাদাম বিক্রেতা আমার হাতে বাদাম দিয়ে বলল, ‘মুইছা গেছে, মুইছা গেছে পূর্ব পাকিস্তান’। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে তার দিকে তাকাই আমি! নিজেও তো জানি, বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে একবারও পূর্ব পাকিস্তান বলেননি। বাংলা, পূর্ব বাংলা, বাংলাদেশ বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।’
ঐতিহাসিক ৭ মার্চ সেই অসাধারণ ভাষণে তিনি তর্জনী তুলে পরিষ্কার বলেছিলেন, ‘আর দাবায়ে রাখবার পারবা না।’ বাক্যটি ভেবে দেখতে হবে। তিনি যদি প্রমিত বাংলা ব্যবহার করতেন, তাহলে বলতেন, ‘আর দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ তিনি প্রমিত বাংলা ব্যবহার করেননি। আঞ্চলিক শব্দ সহযোগে আঞ্চলিক ক্রিয়াপদ ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে বাঙালি জাতিসত্তার হৃদয়ের এ বিশাল দরোজা খুলে দিয়েছেন, যে দরোজা পথে বেরিয়ে এসেছে বাঙালি চরিত্রের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য।
৭ মার্চের ভাষণে সেদিন তিনি সেই বাক্যটির পর বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এই বাক্যটি তিনি প্রমিত বাংলায় বলেছেন। কি আশ্চর্যভাবে তিনি জাতীয় পটভূমি থেকে আন্তর্জাতিক মাত্রায় উন্নীত হয়েছেন, মুক্তির সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম প্রতিটি দেশের জন্য সর্বজনীন সত্য। মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম এককভাবে হয় না, এর জন্য প্রয়োজন হয় আন্তর্জাতিক সমর্থন, সাহায্য এবং সহযোগিতা। তাই বাক্যটি উচ্চারিত হয় প্রমিত বাংলায়। বাঙালি জাতিসত্তার ঊর্ধ্বে পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে মেলবন্ধনের প্রত্যাশায়। স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভগীরথের মতো এই বাংলায় ভাবগঙ্গার সঙ্গম। সেদিনের বক্তৃতায় তার উত্থিত সেই অমিতবিক্রম তর্জনীর সঙ্গে কণ্ঠস্বর যখন একই সমান্তরালে পৌঁছে যায়, তখনই বাঙালির অভিনব জীবন আস্বাদের স্পৃহা প্রবল হয়ে ওঠে।
‘আর দাবায়ে রাখবার পারবা না’- এই পঙক্তিটির চিত্রকল্প কল্পনা করলে কেমন দাঁড়াবে? ধরে নেওয়া যায়, মুখ থুবড়ে পড়ে আছে একটি জনগোষ্ঠী তার ঘাড়ের ওপর শোষকের পা নিংড়ে নিতে চায়, তার জীবনের নির্যাস; কিন্তু কতদিন পা দাবিয়ে রাখবে? একে-দুয়ে মাথা ওঠাতে থাকে। সেই পা অস্বীকার করে উঁচু হয়ে উঠতে চায় মাথা। ঘাড় উঁচু করে তাকাতে শুরু করে আকাশের দিকে। শাসকের দুই পা দুই হাতে ধরে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। ভেবে নেওয়া যায় যে, এমন অজস্র উঁচু হয়ে ওঠা মাথার চিত্রকল্প নিয়েই রচিত হয়েছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বল বীর চির উন্নত মম শির’- কী আশ্চর্য মেলবন্ধন! এভাবেই বুঝি কবিতার ভাষার সঙ্গে রাজনীতি এক হয়। মুখোমুখি দাঁড়ায় কবি ও রাজনীতিবিদ। মনে হয় না কি ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবো না’ পঙক্তিটিও একটি কালজয়ী পঙক্তি?
সেই দিন ৭ মার্চের সেই সভায় নারীদের হাতেও বাঁশের লাঠি ছিল। এ ভাষণটি মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস বাঙালিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছে। এই ভাষণ কী করে দেশের সীমানা অতিক্রম করল, এটা একজন প্রত্যক্ষদর্শীর কথা। তিনি বলেছেন যে, বিদেশে কোনো একটি জায়গায় একজন কাশ্মীরের গেরিলাযোদ্ধার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। নানা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এভাবে কি আপনারা অন্য দেশের ওপর নির্ভর করে নিজেদের স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবেন? সেই গেরিলাযোদ্ধা সঙ্গে সঙ্গে তাকে বলেছিল, Are you from Bangladesh? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ উন্নয়নশীল বিশ্বের ছোট ছোট দেশের জনগণের কাছে এভাবেই পৌঁছে গেছে। এ পৌঁছে যাওয়া শুধু একটি ঘটনা নয়। এর পেছনে আছে হাজার বছরের একজন মানুষের অভিজ্ঞান নিয়ে হাজার বছরের ইতিহাসকে নিজের মধ্যে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়া।
২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবরে প্যারিসের ইউনেস্কো সদর দপ্তরে মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা ঘোষণা দিলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি ‘বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’-এ। ইউনেস্কো জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা। এই স্বীকৃতি ইতিহাসের বড় সময় ধরে বিশ্বজুড়ে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি করেছে। বলতেই হবে, বাঙালি-বাংলাদেশের ইতিহাস এই ৭ মার্চের ইতিহাস। ইউনেস্কোর মাধ্যমে বাঙালির অর্জন বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্য। যে ঐতিহ্য মানবজাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের ভেতর দিয়ে মানুষের মানবিক অধিকারকে নিশ্চিত করে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে