পৃথিবীতে প্রথম শূকরের মাধ্যমেই ছড়ায় নিপাহ ভাইরাস
নিপাহ ভাইরাস একটি প্রাণীবাহিত বা জুনোটিক রোগ। আমরা জানি, বাদুড়ের লালা বা মূত্র থেকে এ ভাইরাস ছড়ায়। বিশেষ করে বাদুড়ে খাওয়া ফল থেকে মানুষের মধ্যে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। এ ভাইরাস বাদুড় থেকে শূকরের শরীরে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সংক্রমিত শূকরের সংস্পর্শে আসা, খামারে কাজ করা কিংবা জবাই ও পরিবহনের সময় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা না থাকলে মানুষের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
নিপাহ ভাইরাস একটি প্রাণীবাহিত সংক্রামক রোগ (জুনোটিক ডিজিজ), যা প্রাণীর দেহ থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। এছাড়াও মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটতে পারে। বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীবাহিত সংক্রামক রোগের মধ্যে নিপাহ ভাইরাস, কোভিড-১৯, SARS, জলাতঙ্ক (Rabies), এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও ইবোলা উল্লেখযোগ্য। এসব রোগের মধ্যে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। ১৯৯৮–১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ার নিপাহ শহরে শূকর পালকদের মধ্যে নিপাহ ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ও মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়।
পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরেও এই রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা শনাক্ত করা হয়। মালয়েশিয়ার সুঙ্গাই নিপাহ গ্রামের নামানুসারেই এই ভাইরাসের নামকরণ করা হয়। ভাইরাসটি প্রধানত ফলখেকো বাদুড় থেকে শূকরের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে যারা শূকরের খামারে কাজ করতেন। সেই সময়ে আক্রান্ত ২৮৩ জন মানুষের মধ্যে ১০৯ জন মারা যায়।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং অন্যান্য প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ২০০১ সালে মেহেরপুরে বাংলাদেশে প্রথম নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। সেই বছর ১৩ জন শনাক্ত রোগীর মধ্যে ৯ জন মারা যান। পরবর্তীতে ভাইরাসটি অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের ৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের খবর প্রকাশিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঘটেছে ফারিদপুর জেলায় (৭১ জন), এরপর রাজবাড়ি (৩৫ জন), নওগাঁ জেলায় (৩৪ জন) এবং লালমনিরহাট (২৪ জন) জেলায়। গত ২৫ বছরে বাংলাদেশে মোট ৩৪৭ জন মানুষ নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২৪৯ জন মারা গেছেন, যার মৃত্যু হার প্রায় ৭২%।
দুঃখজনকভাবে, ২০২৫ সালে ৪ জন এবং ২০২৪ সালে ৫ জন আক্রান্ত ব্যক্তি সবাই মারা গেছেন। এই কারণে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নিপাহ ভাইরাসকে একটি অগ্রাধিকারের রোগ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এর মূল কারণ হলো ভাইরাসটির উচ্চ মৃত্যু হার, মানুষের মধ্যে সংক্রমণের সম্ভাবনা, এবং ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকা।
বাংলাদেশে শীতকালে, বিশেষ করে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে, বিভিন্ন জেলায় খেজুরের গাছ থেকে খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়। সংগ্রহ করা রস ছেঁকে বা ফিল্টার করে এবং জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন বয়সের মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও কিশোররা কাঁচা খেজুরের রস খায়। সাধারণত গাছের গর্তে পাত্র ঝুলিয়ে রস সংগ্রহ করা হয়।
রাতে বাদুড়রা রস পান করার সময় তাদের লালা, প্রস্রাব, মল বা বিষ্ঠা রসের সঙ্গে মিশে যেতে পারে, যা থেকে ভাইরাস সংক্রমণ ঘটে। ফলে কাঁচা খেজুরের রস পান করলে যে কোনো বয়সের মানুষের শরীরে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ভাইরাসটি শুধু বাদুড় নয়, শুকরের বর্জ্য থেকেও ছড়াতে পারে।
নিপাহ ভাইরাসে সংক্রমণ হলে পাঁচ থেকে চৌদ্দ দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশিত হয়। তবে অনেকের মতে, ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াও শরীরে এটি ৪৫ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। সংক্রমণের ফলে জ্বর, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কাশি, বমি, ডায়রিয়া, দুর্বলতা, এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা যেমন মস্তিষ্কে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে, যা মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে উপসর্গহীন থাকতে পারে, আবার কারো শুধুমাত্র সাধারণ জ্বর ও কাশি দেখা দিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে।
বাংলাদেশে শীতকালে যশোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি এবং অন্যান্য জেলায় খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়। কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার মাধ্যমে আমাদের শরীরে নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই খেজুরের রস সংরক্ষণ করার পর এটি সেদ্ধ বা ফুটিয়ে (৭০–৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে) বা জ্বাল দিয়ে পান করা উচিত, যাতে ভাইরাসটি মারা যায়।
তবে, খেজুরের রস পান না করাই সবচেয়ে ভালো। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি এবং নিরাপদ পদ্ধতি মেনে খেজুরের রস সেদ্ধ বা ফুটিয়ে বা জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা উত্তম। আসুন আমরা ছোট-বড় সবাইকে খেজুরের কাঁচা রস না খাওয়ার জন্য উৎসাহিত করি এবং কাঁচা খেজুরের রস না খাওয়ার জন্য জনসচেতনা তৈরি করি।
লেখক: সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে