বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেল নাইকি, অ্যাডিডাসের জয়জয়কার
বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে এবার দেখা যাবে না নাইকির সোয়াশ লোগো। বুধবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল জয়ের মধ্য দিয়ে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় মঞ্চে কোনো দলের পৃষ্ঠপোষকতা করার শেষ সম্ভাবনাটুকুও শেষ হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির।
মাঠের ভেতরে-বাইরে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ডের এই তীব্র লড়াইয়ে এখন স্পষ্ট সুবিধাজনক অবস্থানে জার্মান প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। কারণ, আগামী রোববারের ফাইনালে মুখোমুখি হতে যাওয়া আর্জেন্টিনা ও স্পেন—দুই দলেরই পোশাক-পৃষ্ঠপোষক অ্যাডিডাস। এবারের বিশ্বকাপে মোট ১৪টি জাতীয় দলের সঙ্গে চুক্তি ছিল প্রতিষ্ঠানটির। অন্যদিকে নাইকির পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা ১২টি দলের একটিও—এমনকি সেমিফাইনাল পর্যন্ত যাওয়া ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সও—শেষ পর্যন্ত ফাইনালে জায়গা করে নিতে পারেনি।
দুই প্রতিষ্ঠানই এবারের বিশ্বকাপে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। তবে বাজারে ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকা অংশীদারত্ব ফিরে পেতে বিক্রি ও প্রচারের জন্য নাইকি অনেকটাই নির্ভর করছিল এই টুর্নামেন্টের ওপর। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ জেতা কোনো দলের পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও তা নাইকির সামগ্রিক ব্যবসায়িক গতিপথ খুব একটা বদলে দিতে পারত না। গত মাসেই প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, চীনের বাজারে ক্রমাগত দুর্বলতা এবং সতর্ক ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসের কারণে চতুর্থ প্রান্তিকে মাঝারি মানের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও প্রধান নির্বাহী এলিয়ট হিলের ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল বড় বাধার মুখে পড়েছে।
চলতি বছর নাইকির শেয়ারের দাম কমেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। হিলের অগ্রগতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ধৈর্যও ফুরিয়ে আসছে বলে জানা গেছে। মর্নিংস্টারের বিশ্লেষক ডেভিড সোয়ার্টজের ভাষ্য, জুতার নকশায় উদ্ভাবন, মজুতব্যবস্থাপনা এবং চীনে বিক্রি ও মুনাফার হার স্থিতিশীল করার মতো বিষয়গুলোই নাইকির জন্য এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ; আদিদাস এবার বাড়তি প্রচার পেয়েছে ঠিকই, তবে সেটাকে তিনি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই দেখছেন।
এ বিষয়ে নাইকির এক মুখপাত্র বলেছেন, তাদের ক্রীড়াবিদ ও ফেডারেশন অংশীদারেরা যত দূর সম্ভব এগিয়ে যাক—এটাই সব সময় প্রতিষ্ঠানের চাওয়া, তবে ফুটবল নিয়ে তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোনো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের সঙ্গে বাঁধা নয়। অন্যদিকে অ্যাডিডাস এই ফাইনালকে প্রতিষ্ঠানের জন্য 'গর্বের মুহূর্ত' বলে বর্ণনা করলেও সম্ভাব্য বিক্রির পরিমাণ নিয়ে কিছু জানায়নি।
জাতীয় দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতার বাইরেও বিশ্বকাপ উপলক্ষে বড় প্রচারে নেমেছিল নাইকি। বিশ্বকাপ শুরুর আগে তারা বাজারে আনে দুটি নতুন মার্কারিয়াল বুট, স্থানীয় স্ট্রিটওয়্যার ডিজাইনারদের সঙ্গে জোট বাঁধে এবং বিশ্বজুড়ে পাঁচ হাজারের বেশি নাইকি ও পাইকারি দোকানে ফুটবল-সামগ্রীর সম্ভার নতুন করে সাজায়। ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে থেকে শুরু করে রিয়ালিটি তারকা কিম কারদাশিয়ান পর্যন্ত বিভিন্ন তারকাকে নিয়ে বানানো তাদের 'রিপ দ্য স্ক্রিপ্ট' প্রচারাভিযানের ভিডিওটি টুর্নামেন্টের প্রথম সপ্তাহেই দেখা হয়েছে ১৫০ কোটিবারের বেশি। এমনকি টুর্নামেন্ট শুরুর আগ পর্যন্ত জাতীয় দলগুলোর জার্সি বিক্রিও ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের একই সময়ের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি হয়েছিল বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে এই প্রচারণা সত্ত্বেও ক্রীড়া জুতা ও পোশাকের বাজারে 'স্পষ্ট বিজয়ী' হিসেবে অ্যাডিডাসকেই দেখছেন এম সায়েন্সের গবেষণা বিশ্লেষক ড্রেক ম্যাকফারলেন। তার মতে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ভালো গতি পাওয়ায় নাইকির কাছ থেকে বাজারের অংশ কেড়ে নিতে পেরেছে অ্যাডিডাস। বিশ্বকাপ থেকে বাড়তি সুবিধা পেলেও অ্যাডিডাসের এই উন্নতি শুধু টুর্নামেন্টকেন্দ্রিক নয়, বরং ব্যাপকতর—আর ইউরোপে নাইকি এখনো চাপের মুখে আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এম সায়েন্সের তথ্য অনুযায়ী, জুনে জুতার বাজারে অ্যাডিডাসের অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ২ শতাংশে, এক বছর আগে যা ছিল ১৬ শতাংশ। বিপরীতে বাজারের অংশ ক্রমাগত হারাচ্ছে নাইকি। এপ্রিলে অ্যাডিডাসের নির্বাহীরা জানিয়েছিলেন, বছরের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বকাপ-সামগ্রীর জন্য প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৫ কোটি ইউরো (প্রায় ৩ হাজার ৫৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা) মূল্যের বুকিং পেয়েছে, আর চলতি প্রান্তিকেও একই ধরনের চাহিদা বজায় থাকবে বলে প্রত্যাশা করেছিল তারা।
মতামত দিন