Views Bangladesh Logo

ভাঙা শরীর, অটুট মনোবল: নেইমারের শেষ বিশ্বকাপের গল্প

Shanto Zabaly

শান্ত জাবালি

বিশ্ব নেইমার নামটা জানার অনেক আগে, সাও পাওলোর উপকণ্ঠে মোজি দাস ক্রুজেসে ছিল কেবল চটপটে পা আর তার চেয়েও দ্রুত হাতের এক রোগাপাতলা কিশোর। তার বাবা নেইমার সান্তোস সিনিয়র নিজেও ছিলেন একজন সাদামাটা ফুটবলার, আর নিজের ক্যারিয়ার ফিকে হয়ে যাওয়ার পর তিনি নিজের অবশিষ্ট সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলেন ছেলের মধ্যে। সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কিছুদিন পরিবারটি বাস করেছিল একটি পেট্রল পাম্পের সঙ্গে জোড়া লাগানো ছোট্ট একটি বাড়িতে, যেখানে তার বাবা মেকানিকের কাজ করতেন। কখনো কখনো রাতে খাবার জুটত না, স্বস্তিও থাকত না—কিন্তু একটা বল সবসময়ই থাকত পাশে।

ব্রাজিলের অনেক কিংবদন্তির মতোই তিনিও ফুটবল শিখেছেন খালি পায়ে, ফুটসাল কোর্টের সংকীর্ণ পরিসরে, যেখানে প্রথম স্পর্শটা নিখুঁত না হলে বল হাতছাড়া হয়ে যেত। সেই সংকুচিত, জৌলুসহীন জগতেই গড়ে উঠেছিল সেই কারুকাজ, ভারসাম্য আর সহজাত সৃজনশীলতা, যা একদিন গ্যালারিভর্তি দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে। শৈশবেই কোচরা তার মধ্যে ভিন্ন কিছু লক্ষ্য করেছিলেন—শুধু প্রতিভা নয়, এক ধরনের ক্ষুধা। যেন প্রতিটি ম্যাচই তার কাছে নিজেকে প্রমাণ করার শেষ সুযোগ। এগারো বছর বয়সে তিনি যোগ দেন সান্তোসে—যে ক্লাব একসময় ছিল পেলের। সেই জার্সির ভার তার সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে।

সান্তোস, আর বিশ্বের চোখ তার দিকে
কৈশোরেই তিনি বিস্ফোরিত হয়ে উঠেছিলেন—দুঃসাহসী, প্রাণবন্ত, বল পায়ে যেন অস্পর্শনীয়। বছরের পর বছর নতুন এক বৈশ্বিক তারকার অপেক্ষায় থাকা ব্রাজিল তখন তার নাম উচ্চারণ করতে শুরু করে দেশের সেরা সন্তানদের পাশে। ইউরোপ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ডাক পাঠায়, কিন্তু তিনি সান্তোসে থেকে যান যথেষ্ট সময়, যাতে প্রথমে নিজ দেশেই হয়ে উঠতে পারেন এক নায়ক—পেলের ছায়া বহন করা সেই ১০ নম্বর জার্সি গায়ে চাপিয়ে। ২০১৩ সালে যখন তিনি অবশেষে বার্সেলোনার পথে পাড়ি জমান, সেটা শুধু একটা দলবদল ছিল না—এটি ছিল একটি জাতির নিজের উজ্জ্বলতম আশাকে বিশ্বের কাছে পাঠানো, এই ভয় নিয়ে যে সে যেন সেই বিশালতায় হারিয়ে না যায়।

গৌরব, আর প্রথম প্রকৃত ক্ষত
বার্সেলোনায় মেসি ও সুয়ারেজের পাশে তিনি হয়ে ওঠেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণত্রয়ীর একজন। ট্রফি এসেছে, এসেছে বৈশ্বিক তারকাখ্যাতিও। কিন্তু ফুটবল তার সবচেয়ে প্রতিভাবান সন্তানদেরও নত করতে জানে, আর ২০১৪ সালের গ্রীষ্মে, নিজ দেশের মাটিতে, এমন এক বিশ্বকাপে যেখানে পুরো দেশ তাকে কাঁধে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছিল, এক নির্মম ট্যাকল তার পিঠের একটি কশেরুকা ভেঙে দেয়। নেক ব্রেস পরে বেঞ্চে বসে তিনি দেখেছিলেন সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ব্রাজিলের ৭-১ গোলের বিধ্বংসী পতন—ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক রাত। বেঞ্চে বসে তিনি কেঁদেছিলেন, শারীরিক ব্যথায় নয়, বরং এক গভীরতর অনুভূতিতে—নিজের মানুষদের জন্য লড়তে চেয়েও না পারার অসহায়ত্বে। সেই রাত তার সঙ্গে থেকে গিয়েছিল। সবাই তা বুঝতে পেরেছিল।

প্যারিস, যন্ত্রণা, আর মহত্ত্বের পেছনে ছোটার মূল্য
২০১৭ সালে রেকর্ড ভাঙা অর্থে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইতে যাওয়ার কথা ছিল তার জন্য মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে বিশ্বসেরা হয়ে ওঠার এক মঞ্চ। কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে দাঁড়ায় ভিন্ন ধরনের এক লড়াইয়ের বছরগুলো—বারবার চোটে বাধাগ্রস্ত হওয়া প্রতিভার এক চক্র। মেটাটারসাল ভাঙা, গোড়ালির অস্ত্রোপচার, হ্যামস্ট্রিং ছিঁড়ে যাওয়া। প্রতিবারই ফুটবল বিশ্ব প্রশ্ন তুলেছে, একদা চেনা সেই নেইমার আর কখনো ফিরবেন কি না। প্রতিবারই তিনি ফিরে এসেছেন—আরও বয়স্ক, আরও নীরব, আরও সতর্ক, তবু শৈশবে ফুটসাল কোর্টে খুঁজে পাওয়া সেই একই আনন্দের খোঁজে।

মাঠের বাইরেও তার ওপর নজরদারি কখনো কমেনি—তার ব্যক্তিজীবন, পার্টি, পরিবারের প্রতি আনুগত্য, সবকিছুই অবিরাম বিশ্লেষণ করেছে সেই সংবাদমাধ্যম, যারা একসময় তাকে ত্রাণকর্তা হিসেবে উদযাপন করেছিল। এই সবকিছুর মধ্যেও, তার ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্যে, একমাত্র অপরিবর্তিত জিনিসটি ছিল তার বাবার সঙ্গে সম্পর্ক—যিনি তখনো পাশে ছিলেন, তখনো বিশ্বাস রাখতেন।

সবচেয়ে নিষ্ঠুর চোট
এরপর আসে ২০২৩ সালের অক্টোবর। ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ খেলার সময় তার বাঁ হাঁটুর এসিএল ছিঁড়ে যায়—ফুটবলের সবচেয়ে গুরুতর চোটগুলোর একটি, আর ততদিনে ত্রিশ পেরিয়ে যাওয়া একজন খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন এখানেই শেষ হয়ে যাবে তার আন্তর্জাতিক অধ্যায়। দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাকে, খেলা থেকে দূরে, গ্যালারির চিৎকার থেকে দূরে, বাধ্য হয়ে নিজের শরীরের সঙ্গে বসে ভাবতে হয়—এই শরীর কি আর কখনো তার নির্দেশ পুরোপুরি মেনে চলবে? এই চোটের পর খুব কম ফুটবলারই আগের মতো ফিরে আসেন। প্রায় কেউই এরপর বিশ্বকাপে ফেরেন না। তিনি তবু ফিরেছিলেন।

সান্তোসে ফেরার দীর্ঘ পথ, আর বিশ্বকাপের পথে
পরের বছরগুলোয় ফর্ম আর মানসিক শান্তির খোঁজে তিনি ফিরে যান নিজের ছেলেবেলার ক্লাব সান্তোসে। তার শরীর তখন আর সেই বিস্ফোরক ড্রিবলিংয়ের সামর্থ্য রাখে না, যা একসময় তাকে সংজ্ঞায়িত করত, কিন্তু তার মস্তিষ্ক তখনো সমান তীক্ষ্ণ ও উদার। ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি তবু বিশ্বাস করতেন, তার মধ্যে এমন কিছু আছে যার কোনো বিকল্প নেই—শুধু একজন খেলোয়াড় হিসেবে নয়, একজন উপস্থিতি, একজন নেতা এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও এন্দ্রিকের মতো তরুণ তারকাদের জন্য এক প্রতীক হিসেবে, যারা তাকে দেখেই বড় হয়েছেন আদর্শ মেনে।

২০২৬ বিশ্বকাপের কয়েক সপ্তাহ আগে পাওয়া একটি পেশির চোট নির্মমভাবে এই শেষ সুযোগটুকুও কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। উত্তর আমেরিকায় পা রেখেও তিনি সতীর্থদের সঙ্গে পুরোপুরি অনুশীলন করতে পারেননি, আবারও বেঞ্চ থেকে দেখেছেন ব্রাজিলের প্রথম দুটি ম্যাচ—তার ক্যারিয়ারের চেনা ছক আরেকবার ফিরে এসেছিল। অবশেষে, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে, গ্যালারির উল্লাসধ্বনির মধ্যে তিনি মাঠে নামেন—চৌদ্দ মিনিট খেলেছেন, গোল পাননি, কিন্তু প্রতিটি স্পর্শে জমা ছিল এক জীবনের অর্থ। বছরের পর বছর পর এটাই ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে তার প্রথম উপস্থিতি, আর যাকে অনেকে ইতিমধ্যে বাদের খাতায় ফেলে দিয়েছিলেন, তার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল বিশ্বকে মনে করিয়ে দিতে—তিনি এখনো আছেন, এখনো লড়ছেন।

রাউন্ড অব বত্রিশে জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিলের কষ্টার্জিত জয়েও তিনি বেঞ্চ থেকে দেখেছেন, আর তেমনি দেখেছেন শেষ ষোলোয় নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচেও—এখন তিনি একজন বদলি খেলোয়াড়, আর দলের নিশ্চিত কেন্দ্রবিন্দু নন, এমন একটি ছোট ভূমিকা তিনি মেনে নিয়েছেন এমন এক আত্মমর্যাদার সঙ্গে, যা তার কঠোরতম সমালোচকদেরও অবাক করেছে। আনচেলত্তি প্রকাশ্যেই বলেছেন, এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তার জন্য কতটা কঠিন ছিল, আর তা সত্ত্বেও তিনি কতটা সম্মানজনক ও বিনম্র থেকে তা মেনে নিয়েছেন—এখনো পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, এখনো তরুণদের পাশে আছেন, যারা এখন সেই মশাল বহন করছেন যা একদিন তিনি একাই বহন করতেন।

একটি ক্যারিয়ার, কোনো রায় নয়

এই বিশ্বকাপকে শুধু বেঞ্চে বসে থাকা, চোখের জল আর নীরব সমাপ্তি হিসেবে মনে রাখা সহজ হতে পারে। কিন্তু তাতে বৃহত্তর সত্যটাই হারিয়ে যাবে। নেইমারের গল্প কখনোই কেবল একটি গ্রীষ্মের ছিল না। এটি ছিল সান্তোসের সেই কিশোরের গল্প, যে অসম্ভবকে খেলার মতো সহজ করে তুলেছিল, যে তার কাঁধে বহন করেছিল একটি ফুটবলপাগল জাতির প্রত্যাশা—এমন এক কাঁধ, যা ভক্তরা যতটা স্বীকার করতে চাইতেন তার চেয়ে ঢের বেশি সময় প্রতিভার পাশাপাশি আশা আর ফিজিওথেরাপির জোরেই টিকে ছিল।


এই বিশ্বকাপ থেকে তিনি বিদায় নিচ্ছেন হাইলাইট রিলের নায়ক হিসেবে নয়, বরং এর চেয়েও মানবিক এক পরিচয় নিয়ে—অধ্যবসায়ের এক চ্যাম্পিয়ন, এক পতনোন্মুখ নেতা যিনি তবু বেছে নিয়েছিলেন হাজির থাকতে, অনুশীলন করতে, আর এমন এক ভূমিকার জন্য লড়তে, যা তিনি নিজে আর নিয়ন্ত্রণ করেন না। ২০১৪ সালের সেই চার গোল আর ২০২৬ সালের এই চোখের জলের মাঝামাঝি কোথাও, নেইমার এক বিস্ময় থেকে হয়ে উঠেছেন এক মানুষ। আর হয়তো, শেষ পর্যন্ত, এটাই সেই গল্প যা বলার মতো।

যা ইতিমধ্যে লেখা হয়ে গেছে, তা হলো এই যাত্রার রূপরেখা—পেট্রল পাম্প-সংলগ্ন বাড়ির এক ছেলে, যে বল নিয়ে নাচতে শিখেছিল কারণ তার কাছে আর তেমন কিছুই ছিল না; এক কিশোর, যে একটি জাতির প্রত্যাশা বয়ে নিয়ে গিয়েছিল ইউরোপে; এক তরুণ, যাকে অধিকাংশ খেলোয়াড়ের চেয়ে বহুগুণ বেশিবার ভাঙতে হয়েছে আর নতুন করে গড়তে হয়েছে নিজেকে; আর এখন, চৌত্রিশ বছর বয়সে, এক অভিজ্ঞ যোদ্ধা, যার মাঠে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে আর সবচেয়ে দ্রুততম বা সবচেয়ে ঝলমলে হতে হয় না। তিনি হয়ে উঠেছেন অন্য কিছু—এই প্রমাণ যে, মহত্ত্ব শুধু ট্রফি আর হাইলাইট রিলেই মাপা হয় না, বরং বারবার ফিরে আসার সেই ইচ্ছাশক্তিতেও মাপা হয়—শরীর আর পৃথিবী যতবারই "না" বলুক না কেন, আরও একবার, আরও একটি সুযোগের জন্য।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ