নেপালের দুর্যোগ-কূটনীতি: হিমালয়ের বিপর্যয় কেন রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চ
২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি বিশাল হিমবাহ ও শিলাধসের ফলে সৃষ্ট পানির স্রোত ভুটেকোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকা দিয়ে নেমে আসে। মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যায় বহু গ্রাম, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং চীনের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ গিরং সীমান্ত ক্রসিং। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর নেপালে মৃতের সংখ্যা ১,৩০০ ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে প্রায় ৯,০০০ মানুষের মৃত্যুর পর এটিই দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ। তবে এই মানবিক বিপর্যয়ের বাইরেও বন্যাটি নেপালের ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং সদ্য ক্ষমতায় আসা একটি অনভিজ্ঞ সরকারের জনমত ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। দুর্নীতির প্রতিবাদ এবং সরকারের আরোপ করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ তখন কয়েক দিন ধরে অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতায় রূপ নেয়। এতে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন এবং প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ২০২৬ সালের মার্চে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ওই নির্বাচনে বিপুল বিজয় পান বালেন্দ্র ‘বালেন’ শাহ—সাবেক র্যাপার ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, যিনি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং কাজের মাধ্যমে ফল দেখানোর জন্য কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। ৩৫ বছর বয়সে তিনি নেপালের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী এবং মধ্যেশ অঞ্চল থেকে উঠে আসা প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। তিন দশক ধরে রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারকারী নেপালি কংগ্রেস ও ইউএমএলকে পেছনে ফেলে তিনি ক্ষমতায় আসেন। ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং তাঁর সরকার দ্রুত বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।
তবে বন্যার আগেই শাহ সরকারের জনপ্রিয়তার মধুচন্দ্রিমায় ভাটা পড়তে শুরু করেছিল। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কাঠমান্ডুতে আবারও জেন-জি বিক্ষোভ শুরু হয়। ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে বিরোধের পর এক রাইড-শেয়ার চালক নিজের শরীরে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করলে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। আন্দোলনকারীরা জবাবদিহি দাবি করেন এবং কেউ কেউ শাহের পদত্যাগও চান। বিশ্লেষকেরা শাহের শাসনপদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক আশিষ প্রধানের মতে, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ক্যামেরার সামনে আসা কিংবা জনগণের উদ্দেশে কথা বলার ব্যাপারে শাহের অনীহা ক্রমেই সমালোচনার মুখে পড়ছে। এমনকি তাঁর দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তির প্রতি সহানুভূতিশীল মহলেও এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একজন পর্যবেক্ষক Taipei Times-কে বলেছেন, এই বন্যাই শাহের ক্ষমতায় আসার পেছনে থাকা জনসমর্থন প্রকৃত সংকটের মুখে টিকে থাকে কি না, তার প্রথম বড় পরীক্ষা।
দুর্যোগের এক দিনের মধ্যেই নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশের দেওয়া অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করে। মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটির নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীই উদ্ধারকাজ সামলাতে সক্ষম। একই সঙ্গে বিদেশি সহায়তার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এই সিদ্ধান্তে দেশে-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বেসরকারি খাতের জলবিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারীরা অভিযোগ করেন, বন্যার পানিতে শ্রমিকেরা যখন টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে আছেন, তখন সরকারের এই সিদ্ধান্ত মূল্যবান সময় নষ্ট করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচকেরা এটিকে সবচেয়ে সংকটময় সময়ে ‘ফাঁপা জাতীয়তাবাদ’-এর প্রদর্শন বলেও আখ্যা দেন।
পরে অবশ্য সরকারের অবস্থান কিছুটা নরম হয়। অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে নেপাল বিদেশি সহায়তা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে—এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের প্রয়োজন অনুযায়ী’ সহায়তা গ্রহণ করা হচ্ছে। পরে শাহ নিজেও নিশ্চিত করেন, ভারতীয়, চীনা ও দক্ষিণ কোরীয় বিশেষজ্ঞরা নেপালের বাহিনীর সঙ্গে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কাজ করছেন।
কাঠমান্ডুভিত্তিক বিশ্লেষক চন্দ্রদেব ভট্টা এনপিআরকে দেওয়া বক্তব্যে এর পেছনে একটি ভূরাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা নেপালের প্রাথমিক দ্বিধার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। ওই সময় পুনর্গঠনকে ঘিরে চীন, ভারত ও পশ্চিমা দাতারা প্রকাশ্য প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। তাঁর মতে, শেষ পর্যন্ত চীন নেপালে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে নেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, চীনের স্পর্শকাতর সীমান্তের এত কাছে বিদেশি উদ্ধারকারী দল ঢুকতে দেওয়ার ব্যাপারে কাঠমান্ডুর প্রাথমিক অনীহা ছিল সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রবণতা এবং বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকে। তবে এর মূল্য হিসেবে মানবিক সহায়তা বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
উদ্ধারপর্ব শেষ হয়ে পরিস্থিতি যখন দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্গঠনের দিকে এগোতে শুরু করে, তখন নেপালের কূটনীতিও নতুন মোড় নেয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল ঘোষণা করেন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশগুলোর—চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত—কাছে নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ দাবি করবে। তাঁর যুক্তি, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান নগণ্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি দেশটিকে অসমভাবে বহন করতে হচ্ছে।
খানাল এই পরিবর্তনকে স্পষ্টভাবে ‘সহায়তা থেকে ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দিকে’ নেপালের কূটনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে, যাদের জীবন ও অর্থনীতি হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল। নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’-এর কাছেও আনুষ্ঠানিক দাবি পাঠিয়েছে। এমনকি শাহ নিজে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিষয়টি তুলে ধরবেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে এই দাবির আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতার কথাও বিশ্লেষকেরা তুলে ধরেছেন। এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনার বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান অনেক দূর এগোলেও, সেটি কোনো রাষ্ট্রের আইনি দায় প্রমাণের সমান নয়। নেপালকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সঙ্গে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও আচরণের যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে—যা কেবল নৈতিক যুক্তি তুলে ধরার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ক্রমেই বেড়েছে। দুর্যোগের প্রথম দিন প্রায় ১৬৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও এক সপ্তাহের মধ্যে তা ৬০০ ছাড়ায়, ৩১ আগস্ট ৯০০ ছাড়িয়ে যায় এবং ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মৃতের সংখ্যা ১,৩০০ ছাড়িয়েছে। নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে কয়েক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ মোট ক্ষয়ক্ষতি প্রায় ৪০০ বিলিয়ন রুপি বলে অনুমান করেছে।
সরকার যখন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে আসছে, তখন দেশের ভেতরে সমালোচকেরা সংকট মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকার আরও কম আকর্ষণীয় একটি চিত্র তুলে ধরছেন। নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন শাহ সরকারের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত ও সামরিকনির্ভর ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ করেছে। তাদের দাবি, এতে নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধিরা কার্যত পাশ কাটিয়ে গেছেন এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছাতেও দেরি হয়েছে।
The Statesman-এ প্রকাশিত এক মন্তব্যে বলা হয়েছে, মন্ত্রীরা বিপুলসংখ্যক সফরসঙ্গী নিয়ে হেলিকপ্টারে করে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন—সমালোচকেরা যাকে রাজনৈতিক প্রদর্শন বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, এতে পেশাদার উদ্ধারকাজের প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও সম্পদ থেকে নজর সরে গেছে। অন্যদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ধীরগতির সতর্কবার্তা ও নানা ভুলের কারণে ক্ষুব্ধ জনগণের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এমন কিছু ভুল সরকারি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন।
সবকিছু মিলিয়ে, ২৬ আগস্টের পর নেপালের অবস্থানের মধ্যে একটি স্পষ্ট গতিপথ দেখা যায়। প্রথমে উদ্ধারপর্বে আত্মনির্ভরতার বিতর্কিত ঘোষণা; এরপর দুর্যোগকে অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে বৈশ্বিক জলবায়ু অবিচারের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা—যেখানে একটি তুলনামূলকভাবে ছোট ও নির্দোষ দেশ তার বৃহৎ প্রতিবেশী এবং বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিঃসরণকারী দেশগুলোর কারণে অসম ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
এই বক্তব্যের বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক ভিত্তি অবশ্যই আছে। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান সত্যিই অত্যন্ত সামান্য, আর বিশ্বের অন্যান্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় হিমালয় দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই অবস্থান শাহ সরকারের জন্য একটি সুবিধাজনক রাজনৈতিক ঢালও হয়ে উঠতে পারে। কারণ, দেশের ভেতরে যখন কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সতর্কবার্তা দিতে বিলম্ব এবং সংকটের সময়ে দূরত্ব বজায় রাখা নেতৃত্বের ধরন নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে, তখন দায়ের দৃষ্টি দেশের বাইরে ঘুরিয়ে দেওয়া সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক।
শেষ পর্যন্ত এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা হয়তো বিদেশের মাটিতে নেপালের আইনি দাবি কতটা শক্তিশালী তার ওপর যতটা না নির্ভর করবে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করবে—শাহ সরকার ঘরের মানুষের আস্থা কতটা ফিরিয়ে আনতে পারে তার ওপর।
মতামত দিন