বন্যার ক্ষত সারাতে লাগতে পারে ৫ বিলিয়ন ডলার, বিদেশি সহায়তা চাইল নেপাল
একদিকে উদ্ধার অভিযান, অন্যদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের সন্ধান—ভয়াবহ বন্যার ধাক্কা সামলাতে এখন বড় ধরনের পুনর্গঠনের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে নেপালকে। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে দেশটির ব্যয় হতে পারে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার। এই পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত প্রযুক্তি, দক্ষতা ও কারিগরি সহায়তার জন্য বিদেশি দেশগুলোর দ্বারস্থ হয়েছে কাঠমান্ডু।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ পরিচালনার সক্ষমতা দেশটির রয়েছে। তবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, সুড়ঙ্গে আটকে পড়াদের উদ্ধার, নিখোঁজ ও নিহতদের পরিচয় শনাক্ত, ডিএনএ পরীক্ষা এবং দীর্ঘ সময় মরদেহ সংরক্ষণের মতো বিশেষায়িত কাজে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে কয়েকটি দেশের কাছে নির্দিষ্ট কারিগরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
তবে শনিবার দুর্যোগকবলিত কয়েকটি এলাকায় বৃষ্টি ও দুর্বল দৃশ্যমানতার কারণে সাময়িকভাবে উদ্ধার অভিযান স্থগিত রাখা হয়।
বন্যার ঝুঁকি এখনো কাটেনি। দুর্যোগকবলিত এলাকার উজানে থাকা দুটি হ্রদের পানির স্তর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে নেপালের কর্তৃপক্ষ।
নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে নতুন করে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ শুক্রবার উপচে পড়ার পর এর পানি লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীতে নেমে আসে। ফলে নদী অববাহিকার নিচের দিকে আবারও বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, হ্রদগুলোর পানির স্তর না কমা পর্যন্ত ঝুঁকি পুরোপুরি কাটবে না।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, একটি হ্রদের পানি কিছুটা কমছে। তবে চীনা এক ভূতত্ত্ববিদ সতর্ক করেছেন, হ্রদটি এখনো অস্থিতিশীল থাকতে পারে। এ অঞ্চলের আরও শতাধিক হিমবাহজাত হ্রদ থেকেও নতুন বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।
দুর্যোগের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রতিবেশী ভারত। তিনটি বিমানে প্রায় ৬০ টন ত্রাণ পাঠিয়েছে দেশটি। এসব ত্রাণের মধ্যে রয়েছে কম্বল, ওষুধ, খাবার ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট।
সুড়ঙ্গে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে বিশেষায়িত দল এবং একটি চিকিৎসক দল পাঠানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছে ভারত। একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মী, অস্থায়ী সেতু নির্মাণ এবং যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
চীনও জরুরি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। তবে তারা ঠিক কী ধরনের সহায়তা দেবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত এখনো জানানো হয়নি।
নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে জানিয়েছেন, দুর্যোগের পর প্রাথমিকভাবে অবকাঠামো পুনর্গঠনের ব্যয় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো করা হয়নি।
বন্যায় সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে উদ্ধারপর্ব শেষ হওয়ার পর নেপালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে ধ্বংস হওয়া অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন।
এই দুর্যোগের আঘাত শুধু নেপালে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রতিবেশী তিব্বতের বিভিন্ন এলাকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে এখনো শত শত নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে অভিযান চলছে।
শুক্রবার উদ্ধারকারীরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর একটি গ্যিরংয়ে পৌঁছান। দুর্গম পাহাড়ি পথ, গভীর উপত্যকা, বনাঞ্চল ও খাড়া ভূখণ্ড পেরিয়ে দড়ির সাহায্যে সেখানে পৌঁছাতে হয়েছে উদ্ধারকারীদের।
সীমান্ত এলাকার নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, প্রবল স্রোতে পানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি জনপদের বিভিন্ন স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে ছুটতে দেখা যায়।
বুধবার (২৬ আগস্ট) হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বিশাল ঢেউ থেকে এই ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত। নেপাল-চীন সীমান্তের পাহাড়ি জলপথ দিয়ে নেমে আসা পানির সঙ্গে পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ মিশে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে অন্তত ৬২৬ জন এবং তিব্বতে সাতজন নিহত হয়েছেন। এখনো প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে নেপালে নিখোঁজ প্রায় ২ হাজার ৪২৬ জন এবং তিব্বতের গ্যিরং কাউন্টিতে নিখোঁজ অন্তত ৫৫৮ জন।
নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক। তাদের বড় একটি অংশ ভারতের হিন্দু তীর্থযাত্রী বলে জানা গেছে।
উদ্ধার অভিযান চললেও প্রকৃতির প্রতিকূলতা বারবার বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এরই মধ্যে সম্ভাব্য ৫ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন ব্যয় সামনে রেখে নেপাল বুঝতে পারছে, এই দুর্যোগের ক্ষত সারাতে শুধু উদ্ধার অভিযান নয়—দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহায়তাও প্রয়োজন হবে।
মতামত দিন