Views Bangladesh Logo

নেপালে ওষুধ ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট

নেপালে ভয়াবহ বন্যার ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে ওষুধ ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট। ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়শিবিরে থাকা দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা নিয়মিত ওষুধ পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে নিরাপদ পানির অভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

ত্রিশূলী বাজারের বাসিন্দা রেখা দেবী গোসাই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন। বন্যায় তার বসতভিটা ও চারটি দোকান ভেসে গেছে। এখন পরিবারসহ ত্রিশূলী হাসপাতালের কাছে একটি আশ্রয়শিবিরে অবস্থান করছেন। তবে তিন দিন ধরে তিনি নিয়মিত ওষুধ পাচ্ছেন না।

রেখা দেবীর ছেলে রঘুবীর জানান, তার মায়ের প্রতিদিন নিয়ম করে ওষুধ খেতে হয়। কিন্তু হাসপাতালেও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না।

বন্যায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় জরুরি রোগী পরিবহনও কঠিন হয়ে উঠেছে। আশ্রয়শিবিরে থাকা রঘুবীরের শ্যালিকার প্রসববেদনা উঠলে তাকে সড়কপথে কাঠমান্ডু নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে শনিবার সকালে তাকে আকাশপথে কাঠমান্ডুর পরোপকার প্রসূতি ও নারী হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ত্রিশূলী হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মহেশ্বর যাদব জানান, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের মজুত পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। অন্য অনেক ওষুধও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। হাসপাতালের তথ্য কর্মকর্তা রিকেশ রানা জানান, আশপাশের আশ্রয়শিবিরে থাকা বহু মানুষের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানি রয়েছে। কিন্তু তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

ওষুধের পাশাপাশি তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির। বন্যায় এলাকার পানির উৎসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্যানেল ধসে যাওয়ার পাশাপাশি তুপচের মূল পানির পাইপলাইনও ভেসে গেছে। ফলে দুর্গত মানুষ অনিরাপদ ও অপরিষ্কার পানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন।

ত্রিশূলী হাসপাতালের পাশে ভাগতার এলাকায় তিনটি বড় আশ্রয়শিবিরে প্রায় এক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রসূতিও রয়েছেন। কিন্তু এসব শিবিরে পর্যাপ্ত পানি ও শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে।

ত্রিশূলী হাসপাতালের চিকিৎসা তত্ত্বাবধায়ক ডা. রাজেন্দ্র লামা বলেন, বিপুলসংখ্যক মানুষ গাদাগাদি করে থাকায় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিরাপদ পানি ও সঠিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে যেকোনো সময় বড় ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।

আশ্রয়শিবিরে থাকা মানুষের অভিযোগ, যে খাবার দেওয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং পুষ্টির দিক থেকেও যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, প্রসূতি ও অসুস্থ মানুষের জন্য এসব খাবার পর্যাপ্ত নয়।

বন্যায় এলাকার সব সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে হাসপাতালের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে গুরুতর রোগীদের অন্য হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ডা. রাজেন্দ্র লামা জানান, জরুরি প্রয়োজনে হেলিকপ্টারও সব সময় পাওয়া যাচ্ছে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তা সংকট। হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় মাত্র সাত থেকে আটজন পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হচ্ছে। দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে দিনের বেলাতেও লুটপাট শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন হাসপাতালের চিকিৎসা তত্ত্বাবধায়ক।

এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটকে কেন্দ্র করে কালোবাজারিও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে দুর্গত এলাকায় প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।

সব মিলিয়ে বন্যার পর নেপালের দুর্গত এলাকাগুলোতে এখন শুধু খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকট নয়, ওষুধ, নিরাপদ পানি, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা—সবকিছুরই তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দ্রুত এসব মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা না গেলে বন্যার পর নতুন করে স্বাস্থ্য ও মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

সূত্র: দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ