Views Bangladesh Logo

মা শুধু একটি দিনের নয়, মা রঙিন হওয়ার অধিকার রাখেন

মা দিবস এলেই চারপাশ যেন হঠাৎ আবেগে ভরে ওঠে। সর্বত্র শুধু মায়ের আত্মত্যাগের গল্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাকে নিয়ে অসংখ্য স্ট্যাটাস, ছবির নিচে ভালোবাসার লাইন, মূলধারার মিডিয়ায় বিশেষ আয়োজন—সব মিলিয়ে এক আলাদা আবহ। বাজারে কার্ড, ফুল, উপহার আর মাকে খুশি করার নানান আয়োজন।

মা দিবস অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় মায়ের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও ভালোবাসার কথা। কিন্তু সমস্যা হলো, সেই আমরাই বছরের বাকি দিনগুলোতে অজান্তে মায়ের ওপর কিছু অদৃশ্য নিয়ম চাপিয়ে দিই। ভুলে যাই—মা শুধু একটি দিনের নন, মা আমাদের প্রতিদিনের, প্রতিটি মুহূর্তের।

একজন ‘ভালো মা’র ছবি আঁকতে বললে আমাদের চোখের সামনে ভাসে এক সাদামাটা, নির্লিপ্ত, নিঃস্বার্থ, রঙহীন মানুষের অবয়ব। আমাদের কাছে মায়ের নিঃস্বার্থ হওয়ার মানে হলো—তিনি সংসারের জন্য, সন্তানের জন্য নিজের চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দেবেন, কিন্তু নিজের আকাঙ্ক্ষা কখনো প্রকাশ করবেন না।

কখনো ভেবেছেন, মা কেন রঙহীন হবেন? মায়ের উৎফুল্ল থাকতে মানা কেন? মা হলেই কি এতটা বর্ণহীন হয়ে যেতে হবে? মা মানেই কি শুধু ত্যাগ, দায়িত্ব আর নিঃশব্দ ক্লান্তি? মা মানেই কি নিজের সব ইচ্ছা, রঙ আর স্বপ্ন মুছে ফেলে অন্যদের জন্য বেঁচে থাকা? আমরা খুব সহজেই মাকে এক নির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে বন্দী করে ফেলি—যেখানে তিনি হাসবেন, কিন্তু জোরে নয়; স্বপ্ন দেখবেন, কিন্তু নিজের জন্য নয়; রঙিন হবেন, কিন্তু চোখে পড়ার মতো নয়।

একজন মা যেমন সন্তানকে ভালোবাসেন, তেমনি তিনি নিজেও একজন পূর্ণ মানুষ। তারও আছে পছন্দ-অপছন্দ, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আনন্দ-বেদনা। তিনি যেমন অন্যদের জীবন রাঙান, তেমনি তাঁর নিজের জীবনও রঙিন হওয়ার অধিকার রাখে।

সমাজের এক অদৃশ্য চাপ মায়েদের শিখিয়েছে—‘ভালো মা হতে হলে নিজেকে ভুলে যেতে হবে।’ কিন্তু সত্যটা হলো, নিজেকে হারিয়ে নয়, নিজেকে ভালোবেসেই একজন মা সবচেয়ে সুন্দরভাবে পরিবারকে ভালো রাখতে পারেন।

মা বলেই তো তার মন মরে যায় না। একজন মা লাল রঙের লিপস্টিক পরলে কেন সমাজের মান যায়? সন্তান বা পরিবার লজ্জা পায় কেন? কুৎসিত বাক্যবাণে তাকে জর্জরিত হতে হয় কেন? মায়েদের নাকি সবকিছু মানায় না—চেহারায়, সাজে, পোশাকে সবখানেই মুরুব্বিসুলভ ভাব থাকতে হবে। কিন্তু বয়স তো বয়সের নিয়মে বাড়বেই—এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এ জন্য তো আর সব শখ-আহ্লাদকে গলা টিপে মেরে ফেলতে হবে না। মায়েরও প্রাণ খুলে হাসতে মন চায়, গলা ছেড়ে গাইতে, বেড়াতে, আড্ডা দিতে ইচ্ছে করে।

আমাদের সমাজে মেয়েদের কম বয়সেই বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। শহরের চেয়ে গ্রামে এখনো এর পরিমাণ অনেক বেশি। বিয়ের পরপরই সংসারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে হয়, তার ওপর সন্তান নেওয়ার চাপ তো আছেই। কেউ কেউ সবকিছু ছেড়ে সংসারের উন্নতি আর পরিবারের মানুষদের সুখী করতে নিজের জীবনকে ব্যস্ত করে তোলেন। শহরে হয়তো কেউ কেউ বিয়ের পর পড়াশোনা বা চাকরির সুযোগ পান, কিন্তু পরিবারের দায়িত্ব পালন থেকে মুক্তি কারোরই মেলে না।

নারীর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের সামাজিক ধারণা মায়েদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। সমাজবিজ্ঞান ও জেন্ডার স্টাডিজে বারবার উঠে এসেছে, মা হওয়ার পর নারীর ব্যক্তিসত্তাকে প্রায়ই 'ত্যাগী' ও 'নিঃস্বার্থ' পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়।

সমাজবিজ্ঞানী শ্যারন হেইজের ‘ইন্টেন্সিভ মাদারিং’ তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজ আশা করে একজন ‘আদর্শ মা’ তার সন্তানের জন্য নিজের সময়, ইচ্ছা ও পরিচয় সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করবেন। ফলে নিজের জন্য কিছু করাকেই স্বার্থপরতা মনে করা হয়। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মজীবী নারীরাও বাড়ি ফিরে অধিকাংশ গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজ করেন। এতে তাঁদের ব্যক্তিগত সময় ও আনন্দের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যায়।

আমাদের দেশের মায়েরা সংসারের প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এই চব্বিশ ঘণ্টার অক্লান্ত পরিশ্রমে জীবন কখন যে একটা ঘূর্ণিপাকে ঘুরতে থাকে, তা তিনি নিজেও টের পান না। সংসার আর সন্তান সামলাতে সামলাতে সময় বয়ে যায় তার নিজস্ব নিয়মে। সন্তানরা বড় হলে, সংসারে প্রয়োজনটাও যখন কমে আসে, তখন মনের ভেতর জীবনের হিসাব-নিকাশ প্রকট হয়ে ওঠে। ‘নিজের জন্য কিছু করা হলো না’—এই উপলব্ধি বারবার জেগে ওঠে। নিজেকে সাজাতে, নিজের মতো করে বাঁচতে মন চায়।


যখন নিজের শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন উপলব্ধি করেন, তখন পরিবারের কাছে সেই প্রয়োজনটা গুরুত্বহীন মনে হয়। তখন তিনি নিস্তেজ, হতাশ, একা বোধ করতে থাকেন। মনোবিজ্ঞান বলছে, যেসব মা নিজের আনন্দ, পরিচর্যা ও স্বপ্নকে সম্পূর্ণ দমন করেন, তাদের মধ্যে ক্লান্তি, হতাশা, এমনকি পরিচয়সংকট দেখা দিতে পারে। মনের অসুখ থেকে শরীরের অসুখও প্রকট হয়।

একজন হাসিখুশি মা, একজন আত্মবিশ্বাসী মা, একজন স্বপ্নদেখা মা—এই চিত্রটাই হওয়া উচিত আমাদের বাস্তবতা। কারণ মায়ের আনন্দই পরিবারের আনন্দ, মায়ের উচ্ছ্বাসই সন্তানের শক্তি।

তাই পরিবারের সবাইকে মায়েদের পাশে থেকে তাদের উৎসাহিত ও সহযোগিতা করতে হবে। মনে রাখতে হবে—মাকে ‘মা সেজে থাকা’র নিয়মে আবদ্ধ করা নয়, তাকে মনের আনন্দে বাঁচতে দেওয়া এবং তার ইচ্ছাগুলোকে সম্মান জানানো পরিবারের সবারই দায়িত্ব।

মা মানেই ফুরিয়ে যাওয়া নয়। মাও একজন স্বতন্ত্র মানুষ। মাকে বোঝাতে হবে—তিনি রঙহীন নন, তিনি তো জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙ। তিনি অবশ্যই উৎফুল্ল থাকবেন, কারণ মায়ের হাসি পৃথিবীকে আলোকিত করে তোলে।

এই মা দিবসে শুধু মায়ের ত্যাগের গল্প নয়, তার হাসি, তার রঙ, তার স্বপ্নগুলোকেও জায়গা দিই। তাকে বলি— ‘তুমি শুধু মা নও, তুমি নিজে একজন স্বতন্ত্র মানুষ। তোমার আনন্দও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ