ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ থেকে মেয়েকে বাঁচাতে নিভে গেল মায়ের জীবন
ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় নিজের ছোট্ট মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এক মা। নিহত আন্দ্রেয়া দেশটির ফুটবলার হেক্টর বেলোর স্ত্রী। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সন্তানকে আগলে রেখে নিজের জীবন উৎসর্গ করার এই ঘটনা দেশজুড়ে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে একাধিক আবেগঘন পোস্ট করেছেন হেক্টর বেলো। সেখানে তিনি জানান, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাদের ছোট মেয়েকে আগলে রেখেছিলেন আন্দ্রেয়া।
এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘একদিন আমি আমাদের মেয়েকে বলব, কীভাবে তুমি তাকে বাঁচিয়েছিলে। বলব, নিজের জীবন দিয়ে তুমি তাকে রক্ষা করেছ। তুমি ছিলে এক সাহসী মা, যে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিজের সন্তানকে ছেড়ে যায়নি।’
ভূমিকম্পের খবর পেয়ে দ্রুত রাজধানী কারাকাসে পৌঁছান বেলো। সেখানে তার ছোট মেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। পরে আরেকটি পোস্টে তিনি জানান, ‘আমার মেয়ে ও তার খালা ভালো আছে। তবে আজ তাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়া হচ্ছে না। এই অসহনীয় সময়ে পাশে থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।’
একটি ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে নিজের অসহায়ত্বের কথাও প্রকাশ করেন এই ফুটবলার। তিনি লেখেন, ‘আমি কীভাবে আমার মেয়েকে বোঝাব, তাকে বাঁচাতে গিয়ে তার মা নিজের জীবন দিয়েছে? আমি তখন সেখানে ছিলাম না, কিছুই করতে পারিনি। আমাকে শক্তি দাও।’
ভেনেজুয়েলার ক্রীড়া সংগঠন কুমানা দে কাম্পেওনেস জানিয়েছে, ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে আন্দ্রেয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে একই ভবনে থাকা তাদের ছোট মেয়ে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্প্যানিশ ভাষার সংবাদমাধ্যম ইউনিভিশনও আন্দ্রেয়ার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।
এদিকে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভেনেজুয়েলার ফুটবল অঙ্গনেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ভেনেজুয়েলা ফুটবল ফেডারেশন (এফভিএফ) ও সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আরও দুই ফুটবলার প্রাণ হারিয়েছেন।
কারাকাস ফুটবল ক্লাব জানিয়েছে, তাদের অনূর্ধ্ব-১৮ দলের খেলোয়াড় রাজান সিজা লা গুয়াইরায় নিজ বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ক্লাব স্পোর্ট সান আগুস্তিন জানিয়েছে, তাদের একাডেমির খেলোয়াড় ভিক্টর পালাসিওসও ভূমিকম্পে মারা গেছেন। ক্লাবটির ভাষ্য, ‘তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।’
এ ছাড়া সাবেক মিস ভেনেজুয়েলা গিসেল রেয়েস জানিয়েছেন, লা গুয়াইরায় তার মায়ের বসবাসরত ভবন পুরোপুরি ধসে পড়ে। ভবন ধসের আতঙ্ক ও মানসিক ধাক্কায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মা মারা যান। রেয়েসের ভাষ্য, তার মায়ের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা এক নার্স জীবিত উদ্ধার হয়েছেন এবং তিনিই পরিবারকে এই দুঃসংবাদটি জানান।
সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার (২৪ জুন) কারাকাসের কাছে আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৯২০ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৩৬০ জনের বেশি। এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে দেশি-বিদেশি উদ্ধারকারী দল দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তাও ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলায় পৌঁছাতে শুরু করেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
মতামত দিন