এক ফ্রেমে মোদি-পেজেশকিয়ান, ভারতের ভারসাম্যের কূটনীতির বার্তা
একটি ছবিই যেন ভারতের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থানের বড় একটি বার্তা দিয়ে গেল। শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ব্রিকস ব্যবসায়িক ফোরামে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের হাত ধরে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে যেতে দেখা যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। পাশে ছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্যিক উত্তেজনার মতো একাধিক সংকটে বিশ্ব যখন ক্রমেই বিভক্ত হয়ে পড়ছে, তখন মোদি ও পেজেশকিয়ানের একসঙ্গে হাঁটার দৃশ্য ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও কৌশলগত অংশীদারত্ব ধরে রেখেছে ভারত। ফলে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে স্পষ্ট মেরুকরণের সময়েও নয়াদিল্লি একাধিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতার পথ খোলা রাখছে।
ব্রিকস ব্যবসায়িক ফোরামে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন জোটের নেতারা। এর মধ্যেই মোদি ও পেজেশকিয়ানের হাস্যোজ্জ্বলভাবে হাত ধরে হাঁটার দৃশ্য দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতাও সামনে নিয়ে আসে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেজেশকিয়ানের এটিই প্রথম ভারত সফর। এমন এক সময়ে তিনি নয়াদিল্লিতে এসেছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করে চলেছে।
ব্যবসায়িক ফোরামে অংশ নেওয়ার পর মোদি ও পেজেশকিয়ান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও বসেন। দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এটি ছিল দুই নেতার দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। বৈঠকে ভারত-ইরান সম্পর্কের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের স্থায়ী সমাধানে ভারত শুরু থেকেই আলোচনা ও কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে দেশটির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ওপরও জোর দিয়েছে নয়াদিল্লি।
বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোদি বলেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেজেশকিয়ানের প্রথম ভারত সফরটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দুই নেতা ভারত-ইরান বন্ধুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও উভয়ের জন্য লাভজনক কৌশল নিয়ে দুই দেশকে এগিয়ে যেতে হবে।
পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতার আলোচনা হয়েছে জানিয়ে মোদি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার প্রতি ভারতের অঙ্গীকার অটুট রয়েছে।
সব মিলিয়ে ব্রিকসের মঞ্চে মোদি-পেজেশকিয়ানের সেই মুহূর্ত শুধু দুই নেতার সৌজন্য বিনিময়ের দৃশ্য নয়; বরং সংঘাত ও শক্তির মেরুকরণের এই সময়ে ভারত কীভাবে একাধিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের কৌশলগত স্বার্থ এগিয়ে নিতে চাইছে, সেই বাস্তববাদী কূটনীতিরও একটি দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি।
মতামত দিন