ইসি কি ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আসতে নিরুৎসাহিত করতে চায়?
নির্বাচন কমিশন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশে জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত এই প্রথম।
আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সকল নির্বাচন কমিশনারকে বিনীতভাবে বলতে চাই, প্লিজ খুব ভাল করে ভেবে দেখুন, এ যুগে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সবাই নিজের কাছে একটি মোবাইল ফোন রাখে। এটাই এখন এ সময়ের মানুষের অভ্যাস। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিতে চাইলে আমি মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে বের হতে পারব না। কারন ভোট কেন্দ্রের চারশ’ গজের আগে কার কাছে মোবাইল হ্যান্ডসেটিটি রেখে যাব, তার ব্যবস্থা আমার কাছে নেই। কারও কাছে রাখার ব্যবস্থা থাকলে ভোট দিয়ে এসে হ্যান্ডসেটটি ফেরত পাব কি’না তারও নিশ্চয়তা নেই। একই সঙ্গে ভোট কেন্দ্রের ভেতরে মোবাইল হ্যান্ডসেট নিয়ে ভোটাররা ঢুকছে কি’না তার জন্য ব্যাপক তল্লাশি নেবে আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী। আমি সে হয়রানিতেও পড়তে চাইনা। অতএব আমি হয়ত ভোট দিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারি। মোটা দাগে ঝুট ঝামেলা এড়িয়ে চলা নিম্ন থেকে মধ্যবিত্ত সবাই এভাবেই ভাববেন। ফলে ভোট গ্রহনের দিনের তিন দিন আগে ইসির এই সিদ্ধান্ত বিপুল সংখ্যক ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করবে, সন্দেহ নাই।
আমার পেশা সাংবাদিকতা। ভোট কেন্দ্রে খবর সংগ্রহের পাশাপাশি সংবাদপত্রে ছবি যায়, টিভিতে ভিডিও রিপোর্ট যায়। সংবাদ মাধ্যমগুলোর সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মে শর্ট ভিডিও, ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। এখন এ যুগে বড় ক্যামেরা বহন করার চেয়ে ভাল রেজুলেশনের ক্যামেরা সমৃদ্ধ স্মার্টফোনই বেশী ব্যবহৃত হচ্ছে। ইসির এই নতুন নির্দেশনার কারনে স্বাভাবিকভাবে সাংবাদিকতাও সংকুচিত হয়ে যাবে। বিগত সময়ের অভিজ্ঞতায় এটাও বলতে পারি, ইসির নির্দেশনা সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারনা ভোট কেন্দ্রে দায়িত্বপালনরত অনেকেরই থাকবে এবং তারা টেলিভিশনের ক্যামেরা নিয়ে ভোট কেন্দ্রে ঢুকতেও বাধা দেবে এবং এ নিয়েও বিশৃঙ্খলা এবং সাংবাদিক হয়রানির ঘটনা ঘটবে। ফলে ইসির নির্দেশনার কারনে টেলিভিশনের জন্য ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ কিংবা লাইভ রিপোর্টিং, দুটো নিয়েও ঝামেলা সৃষ্টির বড় আশংকা থেকেই যাচ্ছে। অবশ্য সাংবাদিকতা সংকুচিত হলে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোট চুরি কিংবা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বেশ সহজ হয়ে যায়!
হয়ত বলা হবে, ভোট কেন্দ্রে শত শত মোবাইল ফোন আর কয়েক ডজন ক্যামেরার উৎপাত সামলাবে কে? এখন তো শুধু স্বীকৃত মিডিয়ার সাংবাদিক না, এর বাইরে শত শত ইউটিউবার, টিকটকার, ফেসবুকার, তাদের মোবাইল ফোন সামলাবে কে? এ প্রশ্নের তো সহজ উত্তর আছে। স্বীকৃত মিডিয়ার সাংবাদিকরা নির্বাচন কমিশন থেকে ভোট গ্রহণের দিনে দায়িত্বপালনের জন্য কার্ড পেয়েছেন। অতএব “ভোট কেন্দ্রে নির্বাচন কমিশনের কার্ডধারীরা এবং ভোটাররা ছাড়া অন্য কেউ ভোট কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না। কার্ডধারী সাংবাদিকরাই কেবলমাত্র কেন্দ্রের ভেতরে, বাইরে ভিডিও ধারন বা ছবি তুলতে পারবেন ”, এমন নির্দেশনা দিলেও বুঝতাম উদ্দেশ্যটা ভালো । আর মোবাইল ফোন ব্হনের উপর নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে ভোট কেন্দ্রের ভেতরে সাধারণ ভোটাররা মোবাইল সঙ্গে রাখতে পারবেন কিন্তু ব্যবহার করতে পারবেন না, এমন নির্দেশনা দিলেও সেই নির্দেশনা নিয়ে কোন সন্দেহ, আংশকা থাকত না। কিন্তু মোবাইল ফোন বহনের উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া অবশ্যই সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। শুধুমাত্র মোবাইল ফোন পকেটে নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যাওয়া যাবে না বলে, অনেকেই ভোট দিতে যাবেন না, এ আশংকা তীব্র। ফলে সার্বিকভাবে ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির ক্ষেত্রে এর একটা বড় প্রভাব পড়বেই। ভোট গ্রহন ও গণনার ক্ষেত্রে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং সন্দেহটাও গভীর হবে।
আমি মনে করি ইসির এখনই এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে যেটা বাস্তবসম্মত, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। যে সিদ্ধান্ত নিলে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব, সে ধরনের সিদ্ধান্ত না নেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। আশাকরি নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টরা দ্রুত বিষয়টি ভেবে দেখবেন।
রাশেদ মেহেদী
সম্পাদক ভিউজ বাংলাদেশ
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে