ইরান-ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, তিনজন নিহত, আহত অন্তত ৮৫
ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নারীসহ তিন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। এর পর পরই আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইসরায়েল। পাল্টাপাল্টি এসব হামলায় দুই দেশ মিলিয়ে আহত হন অন্তত ৮৫ জন।
বিস্ফোরণ ও আগুনে পুড়ে গেছে ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি বিমানবন্দর এবং ইসরায়েলের বাণিজ্যিক রাজধানী তেলআবিবের অন্তত দশটি ভবন। শনিবার (১৪ জুন) প্রথম প্রহর থেকে সকাল পর্যন্ত দুই দেশ পরস্পরের বিরুদ্ধে এ হামলা চালায়।
টাইমস অব ইসরায়েল জানায়, ইসরায়েলে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলো তিনটি পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। তেলআবিবে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং বেশ কয়েকটি আঘাতস্থল থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে।
ইসরায়েলের হারেৎজ সংবাদপত্রের খবর অনুসারে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তেলআবিবের কেন্দ্রস্থলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি উঁচু ভবনে আঘাত হানায় ভবনটির নিচের এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেলআবিবের শহরতলি রামাত গানেও নয়টি ভবন ধ্বংস হয়েছে।
এসব হামলায় অন্তত ৮০ জন আহত হন, যার মধ্যে একজন নারীসহ তিনজন গুরুতর আহত ইসরায়েলি পরে মারা গেছেন। আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। অন্যরা হালকা থেকে মাঝারি আহত হয়েছেন অথবা তীব্র উদ্বেগে ভুগছেন। তাদেরকেও বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হিব্রু মিডিয়াও জানিয়েছে, একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ওই নারী ও দুজন পুরুষ গুরুতর আহত হলে হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যান।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত মিডিয়া দাবি করেছে, শত শত ক্ষেপনাস্ত্রের এসব হামলায় ইসরায়েলের অন্তত দুটি যুদ্ধবিমানও ভূপাতিত করেছে দেশটি। অবশ্য রাজধানী তেহরানে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণে বেশ কয়েকজনের আহত হওয়ার খবরও দিয়েছে গণমাধ্যমটি। তবে, ইসরায়েলের দাবি, ইরানের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা শতাধিক, যেগুলোর বেশিরভাগ প্রতিহত করা ছাড়াও কড়া জবাব দিয়েছে তাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলি ভূখণ্ডে পৌঁছানোর আগেই প্রতিহত করেছে মার্কিন বাহিনীও।
আইডিএফের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডিফ্রিন জানিয়েছেন, পাল্টা চারটি আক্রমণে ডজন ডজন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। অন্যদিকে ইসরায়েলের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র আভিচায় আদ্রাই বলেছেন, ভোররাতের হামলার জবাবে শনিবার সকালে তেহরানের মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালানো হয়। কমপক্ষে দুটি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র বিমানবন্দরটিতে আঘাত হানে। ফলে বিশাল আগুনের সূত্রপাত হয়।
ইসরায়েলি হামলার কয়েকঘণ্টা পরও ইরানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি জ্বলতে থাকা এবং ইরানের হামলায় ওই ইসরায়েলি নারীর মৃত্যুর খবর দিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম। বার্তা সংস্থা এএফপিও তাদের একজন সংবাদদাতাকে উদ্ধৃত করে বিমানবন্দরে আগুন ও ব্যাপক ধোঁয়া দেখতে পাওয়ার খবর দিয়েছে। ইরানের মেহর সংবাদ সংস্থা ওই বিমানবন্দরে বিস্ফোরণের তথ্য প্রকাশ করলেও এই আগুনের কারণ সম্পর্কে কিছু জানায়নি।
আর সামাজিক মাধ্যম এক্স এ দেয়া পোস্টে ইসরায়েলি কমান্ডার আভিচায় আদ্রাই দাবি করেছেন, ইরানের ছােড়া বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। ‘কয়েকটি ভবনে আঘাত হয়েছে। এগুলো প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্রের অংশবিশেষ। তবে বিভিন্ন স্থানে হামলায় আহত অন্তত ৮০ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে’- বলেছেন তিনি।
বিবিসি জানায়, ইসরায়েলের দিকে ইরানের ছোঁড়া মিসাইল শ্রাপনেলে আহত ৬৩ জনের মধ্যে রয়েছেন পাঁচজন ফিলিস্তিনিও। দক্ষিণ পশ্চিম তীরের হেবরনের কাছে সাইর শহরের কাছে আহতদেরকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। শ্রাপনেল মানে হলো, মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের পর তার বিভিন্ন খণ্ড-বিখণ্ড ধাতব টুকরা।
আহতদের মাঝে তিনজনই শিশু, এমনটা জানিয়েছে ফিলিস্তিনের বার্তা সংস্থা ওয়াফাও। তাদের বয়স যথাক্রমে ছয়, সাত ও ১২ বছর।
এদিকে ইসরায়েলের তেলআবিব ও জেরুসালেমে সতর্কতামূলক সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তেল আবিবের আকাশে কালো ধোঁয়া দেখা গেছে। আইডিএফ জানিয়েছে, ‘ইরান আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে’- এমন সতর্কতা পাওয়ার পর থেকেই দেশটির বিভিন্ন জায়গায় এসব অ্যালার্ট বা সতর্কতা দেয়া হচ্ছে।
‘হামলা প্রতিহত এবং হুমকি সম্পূর্ণ নির্মূলে যা করা দরকার সেটিই করা হচ্ছে’ বলেও তাদের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। তবে আরেকটি বার্তায় বলা হয়েছে, ‘সুরক্ষিত এলাকায় আশ্রয় নেয়া লোকজন অন্যত্র যেতে পারেন’। যদিও তাদের কাছাকাছি থাকারই পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
ইরানে হামলার পর পরই ‘পাল্টা হামলার শঙ্কায়’ নিজ দেশে জরুরি অবস্থাও জারি করে ইসরায়েলি সরকার। এমন আশঙ্কা থেকে জেরুজালেমের সুপারশপগুলোতেও দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে খাদ্য ও পানি।
হামলার পর সকালে ইরান সতর্ক করে দিয়েছে, যেকোনো দেশ হস্তক্ষেপের চেষ্টা চালালে তাদের আঞ্চলিক অবকাঠামোও প্রতিশোধের মুখোমুখি হবে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ইসরায়েলের হামলার পর তার দেশকে ধৈর্য ধারণের আহবান জানানাে ‘অযৌক্তিক’। তার দেশের পক্ষ থেকে ‘দৃঢ়’ জবাব দেয়ার ওপর জোরও দেন তিনি।
এদিকে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নইলে আরও ‘ভয়াবহ হামলার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। এখনই উত্তেজনা প্রশমনে ইরান ও ইসরায়েলের প্রতি আহবান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস।
ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডগত সংহতি লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়েছে চীন। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে জাতিসংঘে দেশটির দূত ফু কং এই নিন্দা জানান। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া নিয়ে বেইজিং মারাত্মক উদ্বিগ্ন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ফু কং বলেন, ‘পারমাণবিক জ্বালানির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের অধিকার ইরানের আছে’। চীন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী, বিশেষ করে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে।
আল জাজিরা জানায়, শুক্রবার (১৩ জুন) ভোর থেকে দিনভর ইরানে হামলা চালিয়ে অন্তত আটটি স্থানে (শহরে) লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে ইসরায়েল। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৩’ নামের ওই অভিযানে অন্তত ২০০ যুদ্ধবিমান দিয়ে ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাকে মূল লক্ষ্যবস্তু করে পাঁচ দফায় হামলা চালানো হয়েছে।
পরে ওই হামলায় দেশটির সশস্ত্র বাহিনী প্রধান ও রেভ্যুলেশনারি গার্ড প্রধানসহ বেশ কয়েকজন সামরিক কমান্ডার ও অন্তত ছয়জন পরমাণু বিজ্ঞানীর মৃত্যু এবং বেশ কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করে ইরান। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি, রেভ্যুলেশনারি গার্ড এর কমান্ডার হোসেইন সালামিসহ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত রাজনীতিক আলি শামখানিও।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম নুর নিউজ জানায়, ইসরায়েলি হামলায় ১৩৮ জন নিহত ও ৩২৯ জন আহত হন। এরপর রাত থেকেই ইসরায়েলে পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে