রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত মির্জা ফখরুল আলমগীর
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নির্বাচনে মোট ৩৪৩টি বৈধ ভোটের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। অন্যদিকে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশ্যে ভোট গণনা করা হয়। গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন।
ভোটগ্রহণের শুরুতে সংসদ সদস্যদের মধ্যে প্রথম ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ অন্যান্য সংসদ সদস্য ভোট দেন।
এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন।
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা এই রাজনীতিকের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায়। শৈশব-কৈশর নিজ জন্মস্থানে কাটালেও কলেজ জীবনে পাড়ি জমান রাজধানীতে। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন মির্জা ফখরুল। সে সময়ই ছাত্ররাজনীতিতে হাতেখড়ি। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক কারণে জেলও খেটেছেন তিনি। তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন তিনি। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে এস এ বারীর পদত্যাগের পর তিনি আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে কর্মরত অবস্থায় তিনি সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও ইউনেসকো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেছেন।
১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন এবং সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় যোগ দেন বিএনপিতে। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একইসাথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপি সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০১১ সালের মার্চে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি মহাসচিব হন। বিএনপির ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে দীর্ঘসময় মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। রাজনীতির জন্য জেল খেটেছেন, অবরুদ্ধ হয়েছেন, হামলার শিকার হয়েছেন বারবার কিন্তু দলের দুঃসময়ে কখনোই হাল ছাড়েননি। একাই টেনে নিয়ে গেছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। হাজারও ত্যাগ স্বীকার করেছেন কিন্তু কোনো প্রলোভনেই আদর্শ বিসর্জন দেননি মির্জা ফখরুল ইসলাম। আর তারই স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে ২৩ তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মনোনীত করে বিএনপি। আজ মির্জা ফখরুল যেন তার দীর্ঘ এই ত্যাগের যথোপযুক্ত সম্মানই পেলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে রাহাত আরা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন মির্জা ফখরুল। এই দম্পতির দুই মেয়ে, শামারুহ মির্জা ও সাফারুহ মির্জা। দু'জনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশনা করেছেন। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, কিন্তু বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্টডক্টরাল গবেষণায় যুক্ত। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবন হলেও অতি সাধারণ জীবন যাপন বরেন্য এই রাজনীতিবিদের। জনগণের সঙ্গে মিশেছেন একদম কাছ থেকে। কখনোই বৈষম্য করেননি। সব কিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবনে উঠবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মতামত দিন