ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক: চুড়ি যেন না হয় বেড়ি…
ক্ষুদ্রঋণ কি শেকলের কবলে যাচ্ছে? ক্ষুদ্রঋণ সেক্টরে এ আলোচনা এখন টক অব দি সেক্টর!
দেশে প্রচলিত ব্যাংকের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো মাইক্রোফাইন্যান্স বা ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। এর লাইসেন্স দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক আর ব্যাংকটি পরিচালিত হবে ‘সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে—এমনটাই বলা হচ্ছে।
শুনতে ভালো। কাগজে-কলমে আরও ভালো। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উদ্যোগ কি সত্যিই ক্ষুদ্রঋণের মূল দর্শনকে শক্তিশালী করবে, না কি ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করে ফেলবে?
বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কোনো নতুন ধারণা নয়। কয়েক দশক ধরে এনজিও পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম গ্রামবাংলায় প্রান্তিক মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এনেছে। গ্রামীণ মানুষের যাপিত জীবনের যে ইতিবাচক পরিবর্তন সন্দেহ নেই- তা এনজিও পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমেই এসেছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতা, যার প্রায় ৯১ শতাংশ নারী। ঋণের স্থিতি প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কোনো পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নয়; এটি মাঠে প্রমাণিত বাস্তবতা। এর পুরোটাই মাঠে ঘাটে বাজারে বন্দরে খেটেখাওয়া মানুষদের নিয়ে উদয়াস্ত কাজ করে যাওয়া এনজিওর কারণেই হয়েছে।
বর্তমান এই বাস্তবতার পাশে দাঁড়িয়ে এখন প্রশ্ন অবশ্যই করা যায়—ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনার জন্য সত্যিই কি ব্যাংক বানাতে হবে?
প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ২০০ কোটি টাকা। শেয়ার কেনাবেচা যাবে না বলা হলেও বলা হচ্ছে এর মধ্যে ৬০ শতাংশ আসবে ঋণগ্রহীতা-শেয়ারমালিকদের কাছ থেকে। এ কথা বলা হলেও বাস্তবে এই অঙ্ক জোগাড় করা কি প্রান্তিক বা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব?
১৭টি শীর্ষ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান—ব্র্যাক, আশা, ব্যুরো বাংলাদেশ, টিএমএসএস—যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট বলেছেন, এই অধ্যাদেশ ক্ষুদ্রঋণবান্ধব নয়। বরং এতে বড় মূলধনের বাধা তৈরি করে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বাইরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন আসে—এই ব্যাংক কার জন্য? সাধারণ মানুষ, না বড় উদ্যোক্তার জন্য? না কি ঋণখেলাপি সংস্কৃতির সাফল্যে নতুন পালক যোগ করার জন্য?
এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে। কেউ কেউ বলছেন, এটি ইতিবাচক। অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরীও বলেছেন, শুরুতে সীমিতসংখ্যক লাইসেন্স দিয়ে পারফরম্যান্স দেখা যেতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশ ব্যাংক যে ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে, সেখানেই তো ঋণখেলাপি সংস্কৃতি, পুনঃতফসিলের অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম থামেনি। তাহলে ক্ষুদ্রঋণ একই নিয়ন্ত্রকের অধীনে এলে সেটি কি সত্যিই আলাদা থাকবে?
ক্ষুদ্রঋণ যেখানে চলে বিশ্বাসে, সামাজিক দায়বদ্ধতায় আর নিয়মিত মাঠ পর্যায়ের নজরদারিতে—সেখানে ব্যাংক কোম্পানি আইনের কাঠামো কি সেটিকে মুক্ত রাখবে, না কি ধীরে ধীরে কাগুজে শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলবে?
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক হবে সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। শেয়ার কেনাবেচা করা যাবে না, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া যাবে না—এগুলো নিশ্চিতভাবে ইতিবাচক দিক।
কিন্তু সামাজিক ব্যবসা শুধু নাম দিলেই হয় না। সামাজিক ব্যবসার প্রাণ হলো উদ্দেশ্য ও পরিচালনার দর্শন। প্রশ্ন হলো—যখন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে উদ্যোক্তা, নিয়ন্ত্রক, ব্যবস্থাপনা—সবাই ব্যাংকিং সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত—তখন মাঠের দরিদ্র নারী কি সত্যিই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারবেন? চারজন ঋণগ্রহীতা পরিচালক থাকলেও ক্ষমতার ভারসাম্য যে কাগজেই থাকবে, বাস্তবে নয়—এই অভিজ্ঞতা আমাদের অজানা নয়।
সরকারি বক্তব্যে বলা হচ্ছে, এনজিও পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দুটি কাঠামো পাশাপাশি থাকলে প্রতিযোগিতা হবে কোথায়? মাঠে? গ্রাহকের মধ্যে? নীতিনির্ধারণে?
ভয়ের জায়গাটা এখানেই। ধীরে ধীরে যদি বলা হয়—ব্যাংক আছে, এনজিও কেন?; ব্যাংকের লাইসেন্স আছে, এমআরএ কেন?; ব্যাংকিং কাঠামো আছে, সামাজিক সংগঠন কেন?; তাহলে ক্ষুদ্রঋণের মূল দর্শনটাই ঝুঁকিতে পড়বে।
উন্নয়ন মানে নতুন ব্যাংক নয়, উন্নয়ন মানে নতুন অধ্যাদেশ নয়। উন্নয়ন মানে বিদ্যমান কার্যকর ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।
এনজিও পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় সমালোচনার চাইতে প্রশংসাই শোনা যায় বেশি এবং যার বিস্তৃতি সারা বিশ্বজুড়ে। এমন জননন্দিত একটা ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রায় একই ধারায় আবার কেন একটি উদ্যোগ? অস্বীকারের সুযোগ নেই, এনজিও পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় সমস্যা কিছু থাকতেই পারে। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান কি নতুন ব্যাংক খোলা? নাকি দরকার ছিল—এমআরএকে আরও শক্তিশালী করা; নীতিগত সমস্যা থাকলে তা সমন্বয় করা; স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো; অতিরিক্ত সুদের অভিযোগ নিয়ন্ত্রণ; গ্রাহক সুরক্ষা জোরদার করা? এই পথ না ধরে হঠাৎ করে ব্যাংকিং কাঠামোয় ঢুকে পড়া মানে সফল ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া নয় কি?
ক্ষুদ্রঋণ কোনো ব্যাংকিং প্রোডাক্ট নয়। এটি বিশ্বাসের ওপর দাঁড়ানো একটি উন্নয়ন দর্শন। এই দর্শনকে যদি আমরা বড় মূলধন, ব্যাংক কোম্পানি আইন আর ঋণখেলাপি সংস্কৃতির ভেতরে ঢুকিয়ে দিই, তাহলে ক্ষুদ্রঋণ বাঁচবে না—শুধু নামটা থাকবে। প্রশ্ন তাই থেকেই যায়—ক্ষুদ্রঋণের হাতে বেড়ি পড়বে না তো?
একেএম জসীম উদ্দিন, উন্নয়নকর্মী
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে