মেটার নতুন শর্ত: ফেসবুক পেজে লিংক শেয়ার করলেই ওয়েবসাইটের কনটেন্ট কপি করবে মেটা এআই!
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা তাদের বাণিজ্যিক শর্তাবলিতে (মেটা কমার্শিয়াল টার্মস) বড় পরিবর্তন আনছে। আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন শর্তে মেটাকে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার দিয়ে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ওয়েবসাইটে ঢোকা, কনটেন্ট সংগ্রহ করা এবং সেই কনটেন্ট নিজেদের পণ্য ও সেবার উন্নয়ন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
শর্তে প্রশিক্ষণ বা ‘ট্রেইন’ শব্দটি থাকায় এর আওতায় মেটার এআই মডেলের প্রশিক্ষণও পড়ে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফেসবুক পেজ পরিচালনা, বিজ্ঞাপন দেওয়া বা মেটা বিজনেস সুইট ব্যবহার করে, এমন সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই শর্তটি প্রযোজ্য। সংবাদমাধ্যমও এর বাইরে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আইন বিশেষজ্ঞরা গণমাধ্যমে দেওয়া মন্তব্যে বলেছেন, নতুন শর্তের মাধ্যমে সংবাদ মাধ্যমের অনলাইন থেকে বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট শর্তহীনভাবে এবং বিনামূল্যে কপি করার সুযোগ পাচ্ছে মেটা।
শর্তে যা বলা হয়েছে
নতুন শর্তের প্রথম ধারায় বলা হয়েছে, ‘ব্যবহারকারী মেটাকে (বা মেটার পক্ষে কাজ করা যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে) ওয়েব স্ক্র্যাপার, বট, রোবট, স্পাইডার, ক্রলার ও ইউজার এজেন্টের মতো স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছেন। এসব সফটওয়্যার দিয়ে মেটা টেস্ট ক্রেডেনশিয়াল তৈরি করে ওয়েবসাইটে প্রবেশ, ইনডেক্স, বিশ্লেষণ ও তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যও টেনে নিতে পারবে।’
এই অনুমতি দুই ধরনের ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একটি হলো ব্যবহারকারীর পণ্য বা সেবার সঙ্গে যুক্ত ডোমেইন। অন্যটি হলো মেটার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে যেসব ডোমেইন সামনে আসে।
একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘মেটা এসব ডোমেইন, ওয়েব পেজ বা ইউআরএলের যেকোনো কনটেন্ট মেটার পণ্য, সেবা ও ফিচার সরবরাহ, উন্নয়ন, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং সেগুলোর সুরক্ষায় ব্যবহার করতে পারবে।’ এখানে প্রশিক্ষণ অর্থ ওয়েবসাইটগুলোর কনটেন্ট মেটা এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করতে পারবে।
শর্তে ‘ব্যবসায়িক বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য’ বলতে বোঝানো হয়েছে বিজ্ঞাপন বা মার্কেটিং মেসেজ পাঠানো, পণ্য বিক্রি, অ্যাপ তৈরি, পেজ পরিচালনা, ব্যবসায়িক গ্রুপ পরিচালনা এবং অ্যাডস ম্যানেজার বা মেটা বিজনেস সুইটের মতো পণ্য ব্যবহারকে। প্রতিষ্ঠানের ধরন যা-ই হোক, এসব কাজে মেটার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করলেই শর্তটি প্রযোজ্য।
ব্যবহার চালিয়ে গেলেই সম্মতি
শর্তের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, হালনাগাদের নোটিশের পর কেউ ব্যবসায়িক কাজে মেটার পণ্য ব্যবহার চালিয়ে গেলে নতুন শর্ত মেনে নিয়েছেন বলে ধরা হবে। আলাদা করে শর্ত প্রত্যাখ্যানের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। শর্ত না মানলে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে মেটার পণ্য ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
মেটা অক্টোবরের শুরুতে বিজনেস সুইটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের এই হালনাগাদের কথা জানিয়েছে। শর্তের হালনাগাদ সংস্করণ ফেসবুকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। পাতাটির ওপরে লেখা আছে, হালনাগাদ কার্যকর হবে ৩০ অক্টোবর ২০২৬।
মেটা কী বলছে
মেটার যোগাযোগ বিভাগের কর্মকর্তা অ্যান্ডি স্টোন এক্স হ্যান্ডলের পোস্টে লিখেছেন, ‘এই হালনাগাদের উদ্দেশ্য বিক্রির জন্য রাখা পণ্যের সঠিক তথ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করা, সংবাদ সাইট স্ক্র্যাপ করা নয়।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘মেটা যেভাবে ওয়েব ক্রলার ব্যবহার করে, তাতে কোনো পরিবর্তন আসছে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গণমাধ্যমকে দেওয়া বিবৃতিতে মেটার আর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, কনটেন্টের মালিকেরা robots.txt (রোবট.টিএক্সটি) ব্যবহার করে নিজেদের কনটেন্টে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। robots.txt হলো ওয়েবসাইটের কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের একটি ফাইল, যেখানে কোন বট সাইটে ঢুকতে পারবে আর কোনটি পারবে না, তা লিখে দেওয়া যায়।
আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
তবে যুক্তরাষ্ট্রের আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শর্তের ভাষা এতটাই বিস্তৃত যে এর আওতায় সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটও পড়ে। প্রায় প্রতিটি সংবাদমাধ্যমেরই অন্তত একটি মেটা বিজনেস অ্যাকাউন্ট আছে।
তাঁদের আশঙ্কা, নতুন শর্তে সম্মতির যুক্তি দেখিয়ে মেটা দাবি করতে পারে, robots.txt-এর নিষেধ আর প্রযোজ্য নয়। এতে সংবাদ প্রকাশকদের সঙ্গে কনটেন্ট লাইসেন্সিং চুক্তির প্রয়োজনও এড়ানো সম্ভব হতে পারে। একজন বিশেষজ্ঞের মতে, লাইসেন্সিং বাজারে এই কনটেন্টের মূল্য হতে পারে বহু মিলিয়ন ডলার।
মেটা অবশ্য এই আশঙ্কা নাকচ করে বলছে, তাদের ক্রলার ব্যবহারে কোনো পরিবর্তন আসছে না।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের উপর প্রভাব
বাংলাদেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলোর পাঠকের বড় অংশ আসে ফেসবুক থেকে। খবর প্রচারের জন্য প্রায় সব প্রতিষ্ঠান ফেসবুক পেজ পরিচালনা করে, অনেকে বিজ্ঞাপনও দেয়। ফলে নতুন শর্ত দেশের সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
শর্তে বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ও ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মেটার বাণিজ্যিক বিরোধ হলে তা নিষ্পত্তি হবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে, অথবা আয়ারল্যান্ডের আদালতে। অর্থাৎ বাংলাদেশি কোনো প্রকাশক আপত্তি তুলতে চাইলে তাকে দেশের বাইরের আদালতে যেতে হবে।
প্রকাশকেরা নিজেদের ওয়েবসাইটের robots.txt ফাইলে মেটার এআই ক্রলার meta-externalagent (মেটার একটি ক্রলারের নাম) বন্ধ করে দিতে পারেন। তবে facebookexternalhit নামের ক্রলারটি বন্ধ করা হলে ফেসবুক পেজে সংবাদ মাধ্যমের লিংক শেয়ার অনেকটাই অর্থহীন হয়ে যাবে। কারণ ফেসবুকে শেয়ার করা লিংকের প্রিভিউ এই ক্রলারের মাধ্যমেই প্রদর্শিত হয়। ফলে এটি বন্ধ করলে সংবাদের লিংক ক্লিকেবল হবে না এবং কোন প্রিভিউ দেখা যাবে না।
মতামত দিন