Views Bangladesh Logo

নিউ জার্সিতে থেমে গেল মেসি-রূপকথা, লা রোহার হাতে বিশ্বকাপ

Sports Desk

ক্রীড়া ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন রেফারির শেষ বাঁশি বাজলো; তখন গ্যালারির একপ্রান্তে জ্বলে উঠলো লাল-হলুদ আতশবাজির রোশনাই, আর অন্যপ্রান্তে নেমে এলো এক নিঃশব্দ বিষাদের ছায়া। নির্ধারিত নব্বই মিনিট পেরিয়ে, তারপর অতিরিক্ত সময়ের প্রতিটি প্রহর পেরিয়ে যে ফয়সালার অপেক্ষায় ছিল গোটা ফুটবলবিশ্ব, তা শেষ পর্যন্ত লেখা হলো স্পেনের নামে। ফেরান তোরেসের একটিমাত্র গোল, মাত্র একটি স্পর্শ আর এক নিখুঁত মুহূর্ত; থামিয়ে দিলো লিওনেল মেসির হাত ধরে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের সেই রূপকথা, যা লেখা হলে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে যেত। ১-০ গোলের এই জয়ে আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি নিজেদের করে নিলো স্পেন।



সময়ের চাকা যেন ষোলো বছর পিছিয়ে গেল এক নিমেষে, ২০১০ সালের সেই গৌরবের পর আবারও বিশ্বসেরার আসনে গিয়ে বসলেন লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। আর অন্যদিকে, ইতিহাসের পাতায় যে নামটি ব্রাজিলের পাশে বসতে বসতেও বসা হলো না, সেটি আর্জেন্টিনার। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জেতা সেলেসাওদের কীর্তি ছুঁতে পারলো না মেসি-বাহিনী। মেটলাইফের সবুজ গালিচায় যেন একই সঙ্গে লেখা হলো দুটি গল্প; একটি উৎসবের, আরেকটি অসমাপ্ত এক স্বপ্নের নীরব বিদায়ের।



নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই জালের দেখা পায়নি। খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেও প্রথমার্ধের ১৫ মিনিটে ভাঙেনি সমতা। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই, ১০৬তম মিনিটে জ্বলে ওঠেন বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেস। ক্লান্ত আর্জেন্টাইন রক্ষণ ভেদ করে বক্সের ভেতরে বল পেয়ে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করেন তিনি। পুরো ম্যাচে ধারাবাহিক চাপ তৈরির যে পুরস্কার স্পেন খুঁজছিল, তা অবশেষে ধরা দেয় এই গোলেই। এর আগে ১১৩ মিনিটে তোরেসের আরও একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়, আর ৯৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের গোলও ভিএআর পর্যালোচনায় অফসাইডে কাটা পড়ে।



ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগে, যোগ করা সময়ের ৯০+৩ মিনিটে বিপজ্জনক ট্যাকলের জন্য দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে সরাসরি লাল কার্ড পান আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। এর আগে ৮২ মিনিটে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায় তিনি প্রথম হলুদ কার্ড দেখেছিলেন। ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে ষষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে লাল কার্ড দেখেন এনজো, আর তাঁর বিদায়ের পরই ১০ জনের দল নিয়ে বাকি লড়াই চালাতে হয় আর্জেন্টিনাকে।



কার্ড তালিকায় আরও ছিলেন আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ (৪১ মিনিট, বিপজ্জনক ট্যাকল) ও লিয়ান্দ্রো পারেদেস (৫২ মিনিট, প্রতিবাদ)। এমনকি টাচলাইনে রেফারির সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করায় ১০৪ মিনিটে হলুদ কার্ড দেখেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি স্বয়ং। স্পেনের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো কার্ড দেখা যায়নি, যা তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবলেরই প্রতিফলন।



ফিফার সবশেষ পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১২০ মিনিটের পুরো লড়াই শেষে বলের দখলে বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে ছিল স্পেন। প্রায় ৬২ থেকে ৬৫ শতাংশ সময় বল ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে, আর্জেন্টিনার ভাগে পড়েছে মাত্র ৩৫ থেকে৩৮ শতাংশ। আক্রমণের পরিসংখ্যানেও একচেটিয়া আধিপত্য দেখিয়েছে স্পেন; পুরো ম্যাচে তারা গোলমুখে মোট ২০টি শট নেয়, যার মধ্যে ১২টি ছিল লক্ষ্যে এবং প্রতিপক্ষের বক্সে তাদের বল স্পর্শের সংখ্যা ছিল ৩১ বার। বিপরীতে সম্পূর্ণ ম্যাচে আর্জেন্টিনা একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি, বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে যা এক নজিরবিহীন ঘটনা। পাস সাফল্যের হারেও এগিয়ে ছিল স্পেন, প্রায় ৮৯ শতাংশ নির্ভুল পাস দিয়ে তারা খেলাটাকে পুরোপুরি নিজেদের ছন্দে বেঁধে রাখে, যেখানে আর্জেন্টিনার পাস সাফল্যের হার ছিল তুলনামূলক কম।



শৃঙ্খলার হিসাবেও দুই দলের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক ছিল। আর্জেন্টিনার পক্ষে তিনটি হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, আর দ্বিতীয় হলুদের সৌজন্যে একটি লাল কার্ড দেখেন এনজো ফার্নান্দেজ; যা তাঁকে ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে ষষ্ঠ বহিষ্কৃত খেলোয়াড়ে পরিণত করে। ফাউলের সংখ্যাতেও আর্জেন্টিনা ছিল এগিয়ে, যা তাদের রক্ষণাত্মক ও শারীরিক লড়াইনির্ভর কৌশলেরই প্রতিফলন। অন্যদিকে স্পেনের কোনো খেলোয়াড়কেই কার্ড দেখতে হয়নি, যা তাদের সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত ফুটবলের সাক্ষ্য বহন করে। উল্লেখ্য, পুরো ম্যাচে কোনো দলই পেনাল্টি আদায় করতে পারেনি।



পরিসংখ্যানের বাইরেও এই ফাইনাল রেখে গেছে একাধিক স্মরণীয় মুহূর্ত। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ রেকর্ডসংখ্যক সেভ করেও শেষ পর্যন্ত দলকে হার থেকে বাঁচাতে পারেননি। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে হয়ে উঠেছেন বিশ্বকাপ জয়ী সবচেয়ে বয়স্ক কোচ, আর তাঁর অধীনে দলের রেকর্ড দাঁড়িয়েছে ১৪ জয়, শূন্য হার ও একটি ড্রয়ে। শেষ বাঁশি বাজার পরপরই মাঠে উত্তেজনার পারদ চড়ে যায়। উদযাপনরত স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের সঙ্গে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের ধাক্কাধাক্কির দৃশ্যও দেখা যায়, যা এই ঐতিহাসিক ফাইনালের এক তিক্ত সমাপ্তি হয়েই থেকে গেল। পুরো ম্যাচে কার্যত ছায়ার মতো নিষ্ক্রিয় থেকে যাওয়া লিওনেল মেসির জন্য এটি হয়তো ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল। মাঠের এক কোণে বসে থাকা তাঁর সেই নির্লিপ্ত দৃষ্টি যেন হয়ে রইল পুরো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আবেগঘন ছবি।



দুই দলই একাধিক পরিবর্তন এনেছে ম্যাচজুড়ে। বিরতির পর আর্জেন্টিনা নিকো গনসালেসের বদলে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে নামিয়ে মাঝমাঠ শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। এরপর ৫৮ মিনিটে গনসালো মন্তিয়েলের বদলে নাহুয়েল মলিনা এবং ৭০ মিনিটে রদ্রিগো দে পলের বদলে জিওভানি সিমিওনেকে নামিয়ে আক্রমণে ঝুঁকি নেন কোচ স্কালোনি। অন্যদিকে স্পেন ৬২ মিনিটে মিকেল ওইয়ারসাবাল ও ফাবিয়ান রুইজের বদলে ফেরান তোরেস ও পেদ্রিকে নামিয়ে আক্রমণে নতুন গতি আনে, পরে ৭৪ মিনিটে আলেক্স বায়েনা ও দানি ওলমোর বদলে নিকো উইলিয়ামস ও মিকেল মেরিনোকে মাঠে নামানো হয়। আর শেষ পর্যন্ত এই পরিবর্তনগুলোরই সুফল পায় স্পেন, বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেসের গোলে।



টুর্নামেন্টে ৩৭ ম্যাচের অপরাজিত যাত্রা এবং মাত্র একটি গোল হজম করা রক্ষণ নিয়ে ফাইনালে আসা স্পেন প্রথম মিনিট থেকেই বলের দখল ও পজিশনাল ফুটবলে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে রাখে। বিপরীতে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা দল হিসেবে (১৯ গোল) আসা আর্জেন্টিনা এই ফাইনালে নিজেদের চেনা সরাসরি ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার সুযোগই তেমন পায়নি।



পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে দেখা গেছে মূলত রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে, আর গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের একের পর এক অসাধারণ সেভ ছাড়া হয়তো আরও আগেই ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়ে যেত। লিওনেল মেসিকে ঘিরে আর্জেন্টিনার আক্রমণ গড়ে তোলার চেষ্টা স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ ও রদ্রি-ফাবিয়ান রুইজের মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের কাছে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।



হাফটাইমে ম্যাচ নিয়ে মতামত জানান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীরা। অনেকেই স্পেনের আধিপত্যের প্রশংসা করলেও প্রথমার্ধের গোলশূন্য লড়াইকে কিছুটা হতাশাজনক বলে মনে করেন কেউ কেউ। একজন সমর্থকের মতে, ইয়ামাল প্রথমার্ধে নিজের সেরা সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি, আর দ্বিতীয়ার্ধে বদলি মিকেল মেরিনোই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারেন বলে তার বিশ্বাস। আরেকজন স্পেনের বিপক্ষে খেলাকে তুলনা করেন অজগরের সঙ্গে লড়াইয়ের সঙ্গে, যারা ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষকে নিঃশ্বাস নেওয়ারও সুযোগ দেয় না। মেসি-ইয়ামালকে নিয়েও ছিল আলোচনা, সঙ্গে হাফটাইমের দীর্ঘ বিনোদন অনুষ্ঠান নিয়ে রসিকতাও করেন কেউ কেউ।



হাফটাইম বিনোদনের দ্বিতীয় পর্বে মঞ্চে ওঠেন পপ তারকা জাস্টিন বিবার, যাকে পরিচয় করিয়ে দেন টিভি সিরিজ টেড ল্যাসো-খ্যাত অভিনেতা জেসন সুদেইকিস ও ব্রেন্ডন হান্ট, নিজ নিজ চরিত্রে হাজির হয়ে। মঞ্চে নিজের জনপ্রিয় একটি গান পরিবেশন করেন বিবার, যা আগের পরিবেশনার তুলনায় ছিল কিছুটা শান্ত ও আবেগঘন।



এছাড়া বিরতিতে ছিল আরেকটি চমক; সুইজারল্যান্ড-কানাডা ম্যাচে কবিতা লিখে নজর কাড়া ১২ বছর বয়সী অলি এবারও ফাইনাল উপলক্ষে নতুন কবিতা লিখে জয় করে নেয় দর্শকদের মন।



এই জয়ে স্পেন যেন খোদাই করে নিলো একবিংশ শতাব্দীর ফুটবল-ইতিহাসের এক অক্ষয় অধ্যায়। ২০১০ সালের সেই প্রথম মুকুটের পর ষোলো বছরের প্রতীক্ষা শেষে দ্বিতীয়বার বিশ্বসেরার আসনে বসলো লা রোহা, আর তার সঙ্গে যুক্ত হলো সাম্প্রতিক ইউরোর মুকুটও। এক অর্থে ফুটবল দুনিয়ার সিংহাসনে এখন নিরঙ্কুশ প্রতাপে বসে আছে স্পেন। অথচ ঠিক তার বিপরীত প্রান্তে, মেটলাইফের সবুজ গালিচায় লেখা হলো আরেক অসমাপ্ত গল্প। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২, ব্রাজিলের সেই সোনালি জোড়া মুকুটের পাশে নিজের নাম বসানোর যে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল আর্জেন্টিনা, তা রয়ে গেল অধরাই।



এই হার-জিতের মাঝে যে নামটি সবচেয়ে বেশি ভারী হয়ে রইল, তা লিওনেল মেসির। ঊনচল্লিশ বছরের এক কিংবদন্তির শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল বোধহয় এটিই। আর সেই বিদায় হয়ে রইল ট্রফিহীন, নীরব, প্রায় করুণ এক সমাপ্তি; যেন এক মহাকাব্যের শেষ পাতাটি লেখা হলো কালির বদলে ছাইয়ে। অথচ ঠিক তখনই, সেই একই মাঠে, একই রাতে তরুণ লামিনে ইয়ামালের হাত ধরে জন্ম নিলো নতুন এক ভোরের গল্প। মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে ফুটবল বিশ্বের পরবর্তী নক্ষত্র হিসেবে নিজের অভিষেক নিশ্চিত করলেন তিনি। আর এভাবেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সেই রাত হয়ে রইলো ফুটবলের প্রজন্ম বদলের এক প্রতীকী, চিরস্মরণীয় মুহূর্ত; যেখানে একটি সূর্য অস্ত গেল, আরেকটি সূর্য উঠলো দিগন্তে।


মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ