সংশয়ের ঘোর কাটিয়ে সুইস দুর্গ ভাঙল আর্জেন্টিনা
নব্বই মিনিটেও যে দুর্গ অটুট রেখেছিল দশজনের সুইজারল্যান্ড, অতিরিক্ত সময়ে সেই প্রাচীরও ভাঙল হুলিয়ান আলভারেজ ও লাওতারো মার্তিনেজের গোলে। ফুটবল কখনও শুধু ৯০ কিংবা ১২০ মিনিটের হিসাব নয়। কখনও এটি ধৈর্যের পরীক্ষা, কখনও বিশ্বাসের, আবার কখনও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার এক অনন্ত দর্শন। কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে সেই দর্শনেরই আরেকটি অধ্যায় লিখেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
সুইজারল্যান্ডের অবিচল প্রতিরোধ ভেঙে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলের জয় তুলে নিয়ে তারা নিশ্চিত করেছে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। বাংলাদেশ সময় রোববার সকালে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ৭২ মিনিটে লাল কার্ড দেখে ১০ জনের দলে পরিণত হলেও সুইসরা দীর্ঘ সময় লিওনেল মেসিদের আটকে রেখেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সময়ের স্রোত বদলে দেন হুলিয়ান আলভারেজ ও লাওতারো মার্তিনেজ। এই জয়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড, আর অন্য সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও স্পেন।
ম্যাচের ১০ম মিনিটে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির নিখুঁত কর্নার থেকে বক্সে ফাঁকায় থাকা অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার হেডে বল জালে জড়ান। এই অ্যাসিস্টের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১০তম অ্যাসিস্ট পূর্ণ করেন মেসি, যা তাকে দিয়েগো ম্যারাডোনার ৮ অ্যাসিস্টের রেকর্ড ছাড়িয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতায় পরিণত করে। প্রথমার্ধে বলের দখলে ৫৮ শতাংশ সময় নিয়ন্ত্রণ রাখলেও গোলের দেখা পায়নি সুইজারল্যান্ড; ব্রিল এমবোলোর একটি বড় সুযোগ ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। ১-০ ব্যবধানের লিড নিয়ে বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধে ৬৭ মিনিটে সমতায় ফেরে সুইজারল্যান্ড। রিকার্দো রদ্রিগেজের সঙ্গে দারুণ ওয়ান-টু খেলে তিন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকে কঠিন কোণ থেকে ঠান্ডা মাথায় শট নিয়ে গোলরক্ষকের নিচ দিয়ে বল জালে পাঠান ড্যান এনদোয়ে। তবে এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি সুইসদের জন্য। ৭২ মিনিটে ভিএআর পর্যালোচনায় রেফারি সিদ্ধান্ত পাল্টে ব্রিল এমবোলোকে ইচ্ছাকৃত ডাইভের জন্য দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখান, ফলে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। এরপর ২০ মিনিটেরও কম সময় এবং পুরো অতিরিক্ত সময় ১০ জন নিয়ে খেলেও দৃঢ় রক্ষণে ম্যাচকে টেনে নিয়ে যায় সুইজারল্যান্ড, নির্ধারিত সময় শেষ হয় ১-১ সমতায়।
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে, ১১২ মিনিটে অবশেষে সুইস দেয়াল ভাঙেন হুলিয়ান আলভারেজ। বদলি খেলোয়াড় হোসে ম্যানুয়েল লোপেজের পাস থেকে বল পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক ডান পায়ের শটে গোলের ডানদিকের ওপরের কোণা দিয়ে জালে বল পাঠান তিনি, যেখানে কোনো সুযোগই ছিল না গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের। আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে সবাইকে আক্রমণে তুলে আনে ১০ জনের সুইজারল্যান্ড, যার ফলে রক্ষণে তৈরি হয় বিশাল ফাঁকা জায়গা। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা প্রথম মিনিটে (১২০+১) দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে থিয়াগো আলমাদার শট কোবেল ঠেকিয়ে দিলেও ফিরতি বলে চূড়ান্ত ব্যবধান ৩-১ করেন লাওতারো মার্তিনেজ।
পুরো ম্যাচেই কার্যত ছন্দহীন ছিল আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ, বিশেষত মধ্যম সময়ে সৃজনশীলতার ঘাটতি স্পষ্ট ছিল মেসিদের খেলায়। বরং একজন কম নিয়েও শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ ও কার্যকর পাল্টা আক্রমণে বেশি ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে সুইজারল্যান্ড। বিশেষত এনদোয়ে ও এমবোলোর গতি বারবার বিপদে ফেলেছিল আর্জেন্টাইন রক্ষণকে। তবে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ এবং শেষ মুহূর্তের অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত সামর্থ্যের কাছেই হার মানতে হয় লড়াকু সুইসদের। ম্যাচ শেষে গ্যালারির ৯০ শতাংশের বেশি দর্শকের সমর্থন ছিল আর্জেন্টিনার পক্ষে, যা কানসাসের পরিবেশকে কার্যত হোম ম্যাচে পরিণত করেছিল।
ম্যাচে একমাত্র লাল কার্ডটি দেখেন সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলো, ৪৪ মিনিটে প্রথম হলুদ কার্ডের পর ৭২ মিনিটে ডাইভের জন্য দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন তিনি। আর্জেন্টিনার পক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ৯৮ মিনিটে হলুদ কার্ড দেখেন লাওতারো মার্তিনেজ, বক্সে হেডের লড়াইয়ে বাড়তি আক্রমণাত্মক ট্যাকলের জন্য। উল্লেখযোগ্যভাবে, প্রাথমিকভাবে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে একটি ফাউলের জন্য হলুদ কার্ড দেখানো হলেও ভিএআর পর্যালোচনার পর রেফারি সিদ্ধান্ত পাল্টে বুঝতে পারেন, আসলে এমবোলোই ইচ্ছাকৃত ডাইভ দিয়েছিলেন; ফলে কার্ডের সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়। ম্যাচে কোনো দলই পেনাল্টির সুযোগ পায়নি।
দুই দলই একাধিক কৌশলগত পরিবর্তন আনে ম্যাচজুড়ে। আর্জেন্টিনা ৭৮ মিনিটে তালিয়াফিকোর বদলে নিকোলাস গনসালেস, ৮৫ মিনিটে একসঙ্গে মলিনার বদলে মন্তিয়েল ও দে পলের বদলে লাওতারো মার্তিনেজকে নামায়। অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে এনজো ফের্নান্দেজের বদলে থিয়াগো আলমাদা এবং ১০৫ মিনিটে চোটে পড়া পারেদেসের বদলে হোসে ম্যানুয়েল লোপেজকে মাঠে নামানো হয়; যিনি পরে আলভারেজের গোলে অ্যাসিস্ট করেন। অন্যদিকে লাল কার্ডের পর ৮৬ মিনিটে সুইজারল্যান্ড একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন আনে; রিডারের বদলে মুইহাইম, গোলদাতা এনদোয়ের বদলে আমদুনি এবং সোয়ের বদলে উইডমারকে নামান কোচ মুরাত ইয়াকিন, দলের ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টায়।
ফিফার অফিসিয়াল ডেটা অনুযায়ী, পুরো ম্যাচেই বলের দখলে আধিপত্য দেখিয়েছে সুইজারল্যান্ড। বিশেষত প্রথমার্ধে এবং ১০ জনে নেমে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মধ্যমাঠের নিয়ন্ত্রণ তাদেরই হাতে ছিল। তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হওয়ার পথেও আর্জেন্টিনা মাত্র দুটি শট লক্ষ্যে রাখতে পেরেছিল। বল দখলে ও খেলা তৈরিতে এগিয়ে থাকলেও ফিনিশিংয়ে তাদের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই পরিসংখ্যানে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডও একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও গ্রানিত জাকার একটি দূরপাল্লার শট লক্ষ্যের অনেক ওপর দিয়ে চলে যাওয়াসহ বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ম্যাচে ফাউলের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য; দুই দলই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘন ঘন ফাউলের কারণে খেলার ছন্দ বারবার ব্যাহত হয়, যা ম্যাচটিকে করে তোলে শারীরিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
শৃঙ্খলার দিক থেকে ম্যাচে মোট তিনটি কার্ড দেখা যায়। সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলো প্রথমার্ধের শেষদিকে (৪৪-৪৫ মিনিট) লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউল করে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন, এরপর ৭২ মিনিটে ইচ্ছাকৃত ডাইভের জন্য দ্বিতীয় হলুদ কার্ডে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন—যা এই ম্যাচের একমাত্র লাল কার্ড। আর্জেন্টিনার পক্ষে অতিরিক্ত সময়ে থিয়াগো আলমাদা বিপজ্জনক খেলার জন্য এবং লাওতারো মার্তিনেজ আক্রমণাত্মক ট্যাকলের জন্য হলুদ কার্ড দেখেন। ম্যাচে কোনো দলই পেনাল্টি আদায় করতে পারেনি। উল্লেখ্য, ম্যাচ শেষের পূর্ণাঙ্গ অফিসিয়াল বক্স-স্কোর (মোট শট, কর্নার, নিখুঁত পাসের হার) এখনো ফিফার পরিসংখ্যান পাতায় হালনাগাদ না হওয়ায় চূড়ান্ত সংখ্যাগুলো সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে।
এই জয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয়, ফিফা র্যাঙ্কিং আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া ১৯৯২ সালের পর এই প্রথমবারের মতো র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল; আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেন একসঙ্গে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিল, যা এবারের আসরের শক্তির প্রকৃত প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা সুইজারল্যান্ডের বিদায় হতাশার হলেও তাদের এই যাত্রা প্রশংসিত হচ্ছে ফুটবল বিশ্বজুড়ে।
সেমিফাইনালে এখন আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড, যারা একই দিনে নরওয়েকে অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ চারে উঠেছে। মেসি-আলভারেজ-লাওতারো ত্রয়ীর ফর্ম এবং সুসংগঠিত রক্ষণ নিয়ে শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্যে আরও একধাপ এগিয়ে গেল লিওনেল স্কালোনির দল।
মতামত দিন