সর্বোচ্চ মঞ্চে মেসি বনাম ইয়ামাল: বিশ্বকাপ ফাইনালের সম্ভাবনা, বিশ্লেষণ ও পূর্ণাঙ্গ প্রিভিউ
ফুটবলের সর্বোচ্চ পুরস্কার নির্ধারিত হবে এই রোববার, মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, যেখানে বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হবে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। ইউরোপ চ্যাম্পিয়নের বিপক্ষে দক্ষিণ আমেরিকা চ্যাম্পিয়নের এই মহারণে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ— ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির মুখোমুখি হবেন ১৯ বছর বয়সী লামিনে ইয়ামাল, যাকে বার্সেলোনায় মেসির উত্তরসূরি হিসেবেই দেখা হয়।
মাঠে এই প্রথমবার একে অপরের বিপক্ষে খেলতে নামলেও দুজনের সম্পর্কের শিকড় অনেক গভীরে। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে এক দাতব্য ফটোশুটে পাঁচ মাস বয়সী শিশু ইয়ামালকে গোসল করাতে সাহায্য করেছিলেন মেসি নিজেই। রক্ষণে দুর্দান্ত কীর্তি নিয়ে ফাইনালে উঠেছে স্পেন— পুরো আসরে সাত ম্যাচে তাদের জালে বল ঢুকেছে মাত্র একবার। ১৬ বছর আগের প্রথম শিরোপার পর এবার দ্বিতীয় বিশ্বকাপের লক্ষ্যে তারা। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার লক্ষ্য ২০২২ সালের শিরোপা ধরে রাখা এবং সব মিলিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়। অনেকের ধারণা, এটিই হতে যাচ্ছে বিশ্ব মঞ্চে মেসির শেষ ম্যাচ।
স্পেন কীভাবে ফাইনালে
স্পেনের পথচলা শুরু হয়েছিল এক বড় ধাক্কা দিয়ে— বিশ্বকাপে অভিষিক্ত ও র্যাঙ্কিংয়ে ৬৭তম দল কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে তারা। এরপর দ্রুতই ছন্দে ফেরে দলটি, প্রথম কুলিং ব্রেকের আগেই সৌদি আরবের বিপক্ষে তিন গোল করে ফেলে তারা— মিকেল ওইয়ারসাবাল দুটি গোল করেন ও একটি অ্যাসিস্ট করেন লামিনে ইয়ামালকে, আর হাসান আলতামবাকতির আত্মঘাতী গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৪-০। গ্রুপ এইচ-এর শীর্ষে থেকে পরের পর্বে যাওয়া নিশ্চিত করে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল কঠিন লড়াই শেষে উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে, যেখানে জয়সূচক গোলটি করেন আলেক্স বাইনা। শুরু থেকেই পরিকল্পনা ছিল— ইয়ামাল ও রোদ্রির মতো তারকারা সাম্প্রতিক চোট কাটিয়ে পূর্ণ ছন্দে ফিরলে দল টুর্নামেন্টে এগিয়ে যাবে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে।
শেষ বত্রিশে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে সেই ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা অব্যাহত রাখে স্পেন, যেখানে আবারও জোড়া গোল করেন ওইয়ারসাবাল, আর দুর্দান্ত দলগত গোল করেন পেদ্রো পোরো। শেষ ষোলোয় পর্তুগালের বিপক্ষে উত্তেজনাপূর্ণ এক আইবেরিয়ান লড়াইয়ে ৯১ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর নাটকীয় গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় তারা, যা দিয়ে শেষ হয়ে যায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে স্পেন আরও উজ্জ্বল খেলা উপহার দেয়— বেলজিয়ামের বিকল্প গোলরক্ষক সেন লামেন্সের ভুলে মেরিনো শেষদিকে আরেকটি গোল করলেও, ২-১ স্কোরলাইন আসলে ফুটিয়ে তুলতে পারেনি স্পেনের আধিপত্যের প্রকৃত মাত্রা— যে বেলজিয়াম আগেই বিদায় করে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে।
আসল পরীক্ষা আসে সেমিফাইনালে, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থেকেই ফেভারিট ধরা ফ্রান্সের বিপক্ষে। মাঠের দুই প্রান্তেই অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখায় স্পেন— ২০২৪ সালের ব্যালন ডি'অর জয়ী রোদ্রি মধ্যমাঠ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখে নিষ্ক্রিয় করে দেন কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসের মতো ফরাসি তারকাদের। ইয়ামালের চতুর বল দখল ও নাছোড় প্রচেষ্টায় আদায় হয় পেনাল্টি, যা থেকে গোল করেন ওইয়ারসাবাল। দ্বিতীয়ার্ধে প্লেমেকার দানি ওলমোর বাড়ানো বলে পোরো গোল করলে ২-০ ব্যবধানের সুনিশ্চিত জয় পায় স্পেন।
আর্জেন্টিনা কীভাবে ফাইনালে
আর্জেন্টিনার যাত্রাকে ঠিক এক কথায় বলা যায়— টিকে থাকার লড়াই। বারবার শারীরিক ও কৌশলগত কোণঠাসা অবস্থা থেকেও বেরিয়ে আসার সামর্থ্য দেখিয়েছে দলটি, যা তাদের অগ্রগতিকে করে তুলেছে আরও অসাধারণ। গ্রুপ পর্বে অবশ্য আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের বিপক্ষে খুব সহজেই এগিয়ে যায় তারা। মেসি তখন ছিলেন অপ্রতিরোধ্য, রক্ষণেও তেমন চাপ আসেনি— আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পরই মূলত গ্রুপ-শীর্ষে থাকা নিশ্চিত হয়ে যায়।
এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ফিফা র্যাঙ্কিং ব্যবহার করে ড্র হওয়ায় নকআউট পর্বের আগ পর্যন্ত বড় বিপদের আশঙ্কা কম ছিল— আর ঠিক তখনই শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। শেষ বত্রিশে কেপ ভার্দে আর্জেন্টিনাকে একেবারে চরম পরীক্ষায় ফেলে দেয়, অতিরিক্ত সময়ে যেন পা অচল হয়ে আসছিল তাদের। শেষ ষোলোয় মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে বিদায়ের প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল তারা, এরপর ৩-২ ব্যবধানে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন ঘটে— যদিও সেই ম্যাচের রেফারিংয়ের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো উল্লেখ না করে এই জয়ের কথা বলা যায় না।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও আরেক দফা কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়— ব্রিল এমবোলো লাল কার্ড দেখার আগ পর্যন্ত ১-১ ব্যবধানে পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল সুইসদের হাতে। এমনকি সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেতেও আরেকবার বিপজ্জনক অবস্থা থেকে জয় ছিনিয়ে আনতে হয়েছে তাদের। আট গোল ও চার অ্যাসিস্ট নিয়ে মেসির প্রভাব যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি লিওনেল স্কালোনির দলও সমানভাবে নির্ভরশীল কঠিন মুহূর্তে টিকে থাকার সহজাত দক্ষতা, ঝড় সামলে নেওয়ার সক্ষমতা এবং শেষদিকে গোল খুঁজে নেওয়ার প্রবণতার ওপর। এমন প্রতিরোধী এক যাত্রা, যা দেখে মনে হতে পারে ট্রফিতে যেন আগে থেকেই তাদের নাম লেখা হয়ে আছে।
স্পেনের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা
বল দখলে রেখে ছোট ছোট পাসে খেলার চিরচেনা পরিচয় পুরো টুর্নামেন্টে বজায় রেখেছে স্পেন— সাত ম্যাচে গড়ে ৬৩.৭ শতাংশ বল দখল রেখেছে তারা। প্রতিপক্ষের জন্য এই নিয়ন্ত্রণ শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্লান্তিকর, কারণ স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের নিখুঁত পাসিংয়ের মধ্যে ছুটতে ছুটতেই তারা হাঁপিয়ে ওঠে। তবে স্পেনের কৌশল শুধু বল দখলে রেখে ফাঁক খোঁজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়— খেলোয়াড়দের অবস্থান বদল ও আচমকা দৌড়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে ফেলার কৌশলও দারুণভাবে কাজে লাগায় তারা।
ফুলব্যাকদের গভীরে উঠে আসার দৌড় বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছে। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে পোরোর গোলটিও এসেছিল ঠিক এই কৌশল থেকেই, আর বাঁ প্রান্তে মার্ক কুকুরেয়া আরও বেশি সক্রিয় থেকেছেন— টুর্নামেন্টে রক্ষণের পেছন দিয়ে দৌড়ের হিসাবে যা তাকে পঞ্চম স্থানে রেখেছে। এত ঘন ঘন এমন দৌড় সত্ত্বেও প্রতিপক্ষরা বারবার হিমশিম খেয়েছে কাকে সামলাবে তা ঠিক করতে গিয়ে। মধ্যমাঠ ও আক্রমণভাগে দানি ওলমোও এই টুর্নামেন্টে স্পেনের অন্যতম সেরা পারফর্মার হিসেবে উঠে এসেছেন।
বল দখলের এই আসক্তির পাশাপাশি বল হারানোর পরপরই তা ফিরে পাওয়ার তীব্র তাগিদও সমান দেখা যায় স্প্যানিশদের মধ্যে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের ফরোয়ার্ডরা আগ্রাসীভাবে প্রেসিং করেন, আর সেন্টারব্যাক পাউ কুবারসি ও এইমেরিক লাপোর্তে উঁচু রক্ষণ-রেখা বজায় রেখে মাঠ সংকুচিত করে প্রতিপক্ষকে পিছনে আটকে ফেলেন। পুরো ব্যবস্থাটি একসাথে বেঁধে রাখেন অপ্রতিরোধ্য রোদ্রি, যিনি আলগা বল কুড়িয়ে নেন এবং অসাধারণ পজিশনাল সচেতনতায় প্রতি-আক্রমণ নস্যাৎ করে দেন। সব মিলিয়ে, এবারের আসরে সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট খেলার ধরন স্পেনেরই— নিয়ন্ত্রণ, সংহতি, বল ছাড়া অবস্থাতেও অদম্য তীব্রতা এবং প্রত্যেকের নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট বোঝাপড়ায় গড়া। এর সঙ্গে লামিনে ইয়ামালের বাড়তি জাদু যোগ হলে আর্জেন্টিনার জন্য তা এক ভীতিকর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
আর্জেন্টিনার কাছ থেকে কী প্রত্যাশা
আর্জেন্টিনার এই যাত্রার পরিচয় লড়াকু মানসিকতা, হার-না-মানা মনোভাব আর মেসির প্রতিভায়। ম্যাচের দীর্ঘ সময় ধরে ধুঁকতে থাকলেও শেষদিকে জ্বলে ওঠার প্রবণতা বারবার দেখা গেছে স্কালোনির দলে— এই আসরে তাদের ১৯ গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে নির্ধারিত সময়ের ৭৫ মিনিটের পর। প্রতিপক্ষ যদি ছেড়ে বসে খেলে, যেমনটা সেমিফাইনালে শেষদিকে মারাত্মকভাবে করেছিল ইংল্যান্ড, তাহলে বল সহজেই ঘুরিয়ে সুযোগ তৈরির মতো মধ্যমাঠের গুণমান আর্জেন্টিনার আছে। প্রতি পর্যায়ে গড়ে ৫.৪টি পাস দিয়ে টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ধৈর্যের প্রমাণ রেখেছে তারা, প্রতিপক্ষকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ফাঁক তৈরির অপেক্ষায় থেকেছে। এসব সমন্বয় বেশিরভাগই ঘটে মাঝমাঠ দিয়ে, যেখানে সাধারণত ঘোরাফেরা করেন মেসি— অন্য যেকোনো দলের তুলনায় প্রান্তের দিকে কম পাস দেয় আর্জেন্টিনা।
মেসির সীমাহীন প্রতিভাই তাদের এই পর্যায়ে টেনে এনেছে ঠিকই, তবে ৩৯ বছর বয়সী এই তারকার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে স্পেনের মতো আগ্রাসী হাই-প্রেস আর্জেন্টিনা প্রয়োগ করে না। প্রতিপক্ষের অর্ধে বল দখলে নেওয়ার হার তাদের ম্যাচপ্রতি মাত্র ২.৯ বার, যা স্পেনের প্রায় অর্ধেক। তার বদলে তারা কিছুটা পিছিয়ে থেকে প্রতিপক্ষ মধ্যমাঠে ঢুকলেই ট্যাকল করে ফাউলের আশ্রয় নেয়। এছাড়া, টুর্নামেন্টের সবচেয়ে খাটো দলগুলোর একটি হয়েও বাতাসে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে আর্জেন্টিনা— চারটি হেডে গোল করেছে তারা। এর মধ্যে তিনটি হেডেড গোল, যার মধ্যে আছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লাউতারো মার্তিনেসের শেষদিকের জয়সূচক গোলটিও, তৈরি হয়েছে মেসির ক্রস থেকে। তার নিখুঁত ক্রসিং তাদের প্রান্ত দিয়েও ভীষণ বিপজ্জনক করে তোলে, যদিও তাদের মূল খেলা মূলত মাঝমাঠ ঘিরেই আবর্তিত হয়।
দলের কেন্দ্রবিন্দু স্পষ্ট হলেও আর্জেন্টিনাকে শুধু এক-খেলোয়াড়ের দল বলাটা সরলীকরণ হবে। হুলিয়ান আলভারেস সামনে শক্তি ও গুণমান জোগান, এনসো ফের্নান্দেস গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দেরিতে গোল করে দলকে এগিয়ে দিয়েছেন, আর এমি মার্তিনেস গোলপোস্টের নিচে আত্মবিশ্বাসী ও নির্ভরযোগ্য উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। স্পেন হয়তো ফাইনালে বেশি পরিপূর্ণ দল হিসেবে নামবে, কিন্তু আর্জেন্টিনার আছে অক্লান্ত এক মনোবল এবং সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে ব্যক্তিগত জাদু দেখানোর অসাধারণ সামর্থ্য।
দুই দলের তারকা খেলোয়াড়
আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে, সতীর্থরা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অবদান রাখলেও পুরো টুর্নামেন্টই মূলত ঘুরপাক খাচ্ছে মেসিকে কেন্দ্র করে। আট গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এমবাপের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন তিনি, আর্জেন্টিনার ১৯ গোলের মধ্যে সরাসরি ১২টিতে অবদান তার। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ৯০ মিনিটে শট ও সুযোগ তৈরিতে দলের শীর্ষে থেকে তিনিই যেন দলের প্রধান আক্রমণাত্মক অস্ত্র ও মূল স্রষ্টা।
অচেনা কারও চোখে হয়তো মনে হতে পারে ৩৯ বছর বয়সী মেসির শারীরিক সামর্থ্য আর সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকার মতো নেই— এই বিশ্বকাপে ৬৩ শতাংশ সময় তিনি হেঁটে কাটিয়েছেন, যা অন্য যেকোনো মাঠের খেলোয়াড়ের চেয়ে ঢের বেশি। তবে এই হাঁটাচলা আসলে জাদুকরের ছলনার অংশমাত্র, যা দেশের প্রয়োজনের ঠিক মুহূর্তে জ্বলে ওঠার সুযোগ করে দেয় তাকে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তিনি ১০টি টেক-অন সম্পন্ন করেন, যা টুর্নামেন্টের বাকি ১০১টি ম্যাচের যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি। প্রতিপক্ষকে আটকে দুই দিকেই কাটিয়ে যাওয়ার তার অবিশ্বাস্য মূল শক্তি ও সামর্থ্য এখনও আগের মতোই ভয়ঙ্কর।
অন্যদিকে, ইয়ামাল স্পেনের আক্রমণে ঝলক দিলেও দে লা ফুয়েন্তের দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় রোদ্রি। ম্যানচেস্টার সিটির এই মিডফিল্ডার স্পেনের বিল্ড-আপের অটল ভিত্তি, যিনি দলকে আক্রমণ শুরুর নিয়ন্ত্রণ ও স্থিরতা জোগান। ফিফার পরিসংখ্যানও এই প্রভাব তুলে ধরে— চাপের মধ্যে থেকে প্রতি ম্যাচে ৪৭টি পাস সম্পন্ন করেছেন রোদ্রি, যা টুর্নামেন্টে যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি।
বলের ওপর শান্ত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ২০২৪ সালের ব্যালন ডি'অর জয়ী এই মিডফিল্ডার রক্ষণেও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী— তীক্ষ্ণ পূর্বাভাস দিয়ে আলগা বল কুড়িয়ে নেন, শারীরিক শক্তি দিয়ে জয় করেন লড়াই। তার রক্ষণাত্মক অবদান পুরো মাঠজুড়েই বিস্তৃত, বিশেষত স্পেনের কাউন্টার-প্রেসে তিনি অপরিহার্য— প্রতিপক্ষের অর্ধে ম্যাচপ্রতি গড়ে দুটি ট্যাকল জিতেছেন তিনি, যা কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি।
দুই দলের ইতিহাস
স্পেন ও আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক সংযোগের শিকড় বিস্তৃত ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত, যখন ইবেরীয় অভিযাত্রীরা প্রথম পা রাখেন বর্তমান বুয়েনস আইরেসে, আর দুই দেশের মধ্যে সেই সম্পর্ক গভীরভাবে টিকে আছে আজও। মাঠের লড়াইয়ে দুই জাতীয় দলের রেষারেষি একেবারে সমতায়— এ পর্যন্ত ১৪ বারের মোকাবিলায় ৬টি জয় আর্জেন্টিনার, ৬টি স্পেনের, বাকি ২টি ড্র। আশ্চর্যজনকভাবে, এই দুই ফুটবল পরাশক্তির একমাত্র বিশ্বকাপ সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে, যেখানে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই ২-১ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা।
এটিও লক্ষণীয় যে, দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মেসি স্পেনের বিপক্ষে খেলেছেন মাত্র তিনবার— যদিও ক্লাব ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন বার্সেলোনায়, যারা তাকে স্পেনের জাতীয় দলের হয়ে খেলাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল। স্পেনের বিপক্ষে মেসির সবশেষ সাক্ষাৎ ছিল ২০০৯ সালের নভেম্বরে মাদ্রিদে এক প্রীতি ম্যাচে। সেই ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করেন তিনি এবং জেরার্ড পিকে ও সের্হিও বুসকেতসের মতো নিজের বার্সেলোনা সতীর্থদেরও নিজের চেনা কারিকুরিতে বিভ্রান্ত করে দেন, তবে শাবি আলোনসোর জোড়া গোলে শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জয় পায় স্পেন। দুই দেশের সবশেষ মোকাবিলা হয়েছিল ২০১৮ বিশ্বকাপের আগে এক প্রীতি ম্যাচে, যেখানে মেসিহীন আর্জেন্টিনাকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দেয় স্পেন। সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন ইস্কো, আর আর্জেন্টিনার একমাত্র সান্ত্বনাসূচক গোলটি করেন নিকোলাস ওতামেন্দি, যিনি এই রোববারও মাঠে নামতে পারেন।
লা লিগার সুবাদে দুই দলের খেলোয়াড়রা একে অপরের বেশ চেনা— দুই দলের ৫২ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ২৪ জনই খেলেন স্প্যানিশ ক্লাবে, যার মধ্যে স্পেনের ১৮ জন ও আর্জেন্টিনার ৬ জন। এর একটি আকর্ষণীয় উপকাহিনী হলো আতলেতিকো মাদ্রিদের সতীর্থদের মুখোমুখি হওয়া— স্পেনের আলেক্স বাইনা ও মার্কোস ইয়োরেন্তে হয়তো সরাসরি লড়বেন আর্জেন্টিনার নাহুয়েল মোলিনা ও হুলিয়ান আলভারেসের বিপক্ষে। এছাড়া স্পেনের হয়ে খেলা আট বার্সেলোনা খেলোয়াড়ের মধ্যে অনেকেই, যার মধ্যে ইয়ামালও আছেন, শৈশবে ক্যাম্প ন্যুতে মেসিকে খেলতে দেখেই বড় হয়েছেন। তাদের মধ্যে কেবল মিডফিল্ডার পেদ্রিই সরাসরি ক্লাবের মাঠে মেসির সঙ্গে খেলেছেন, কারণ ২০২১ সালে মেসি ক্লাব ছাড়ার সময় ইয়ামালের বয়স ছিল মাত্র ১৪।
মেসি না ইয়ামাল, ট্যাকটিক্যাল লড়াইয়েই নির্ধারিত হবে বিশ্বকাপ
ফাইনালের ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করবে স্পেনের তীব্র চাপ আর্জেন্টিনা কতটা সামলাতে পারে তার ওপর। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের প্রথমদিকের হাই-প্রেসের বিপক্ষে যথেষ্ট ভুগেছিল আর্জেন্টিনা, প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে প্রতিপক্ষের বক্সে তারা মাত্র তিনবার বল স্পর্শ করতে পেরেছিল। তবে ইংল্যান্ডের মতো স্পেনের পিছিয়ে পড়া বা ম্যাচ যত গড়াবে ততই ক্লান্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম, ফলে এই টানা তীব্রতা মোকাবিলার কৌশল বের করতে হবে স্কালোনিকে।
এই চাপের মাঝে আর্জেন্টিনার জন্য সামান্য স্বস্তির বিষয় হলো, স্পেন যতটা আগ্রাসীভাবে উঁচুতে গিয়ে বল দখলে নেয়, ততটা দ্রুতগতির প্রতি-আক্রমণ তারা সাধারণত করে না— প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে মাত্র ১.৯টি সরাসরি আক্রমণ চালায় তারা। ইয়ামাল বাদ দিলে সামনের সারিতে স্পেনের তেমন গতি নেই, যা আগে আর্জেন্টিনার জন্য সমস্যা তৈরি করেছিল এমন এলাকা।
যেহেতু আর্জেন্টিনা এমন একটি দল যারা স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচে ধীরে ধীরে ছন্দে ফেরে, তাই স্পেনের নিঃশ্বাসরুদ্ধকর কাউন্টার-প্রেস সামলানোই এই ফাইনালকে নিয়ন্ত্রণের এক কৌশলগত লড়াইয়ে পরিণত করতে পারে। পাসিং নির্ভুলতায় স্পেনের চেয়ে সামান্য এগিয়ে আছে আর্জেন্টিনা— টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৯০.৫ শতাংশ পাস সম্পন্নতার হার তাদের, যেখানে স্পেনের ৮৯.৮ শতাংশ। এই স্থিরতা কাজে লাগিয়ে ম্যাচে পা রাখা এবং লাইনের ফাঁকে বারবার মেসিকে বিপজ্জনক অবস্থানে খুঁজে বের করাই হবে আর্জেন্টিনার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
মধ্যমাঠের আধিপত্যের লড়াই ছাড়াও, দুই প্রান্তে ব্যক্তিগত দ্বৈরথও শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে। স্পেনের ডান প্রান্তে ইয়ামাল ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক— সেমিফাইনালে ফ্রান্সের লেফটব্যাক লুকাস দিন্যেকে একেবারে টুকরো টুকরো করে দিয়েছেন তার বিস্ফোরক ড্রিবলিংয়ে, যা আর্জেন্টিনার ওই প্রান্তে যাকেই খেলানো হোক— সম্ভবত নিকোলাস তাগলিয়াফিকো— তার জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে, বার্সেলোনার শুরুর দিনগুলোর মতোই প্রান্ত দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অবদান রেখেছেন মেসি। মিশর ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ার পর মেসি ডান প্রান্তে সরে গিয়েছিলেন, যেখান থেকে ভেতরে ঢুকে নিখুঁত ক্রস ও থ্রু বল দিয়ে দুই ম্যাচেরই মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি— এমন এক কৌশলগত অস্ত্র, যা আবারও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যদ্বাণী
বিশ্লেষকদের অধিকাংশই এগিয়ে রাখছেন স্পেনকে। কেউ কেউ ২-১ ব্যবধানে স্পেনের জয়ের পূর্বাভাস দিয়েছেন, ম্যাচে হাইড্রেশন ব্রেক, দীর্ঘ বিরতির অনুষ্ঠান, আর্জেন্টিনার কৌশলগত ফাউল এবং স্পেনের মধ্যমাঠ ঘূর্ণনের কারণে খেলা খানিকটা ছন্দহীন হবে বলে মনে করছেন তারা— তাদের ধারণা, আর্জেন্টিনা গোল পাবে সম্ভবত মেসির বাড়ানো বলে হেড থেকে, তবে শেষ পর্যন্ত তা যথেষ্ট হবে না। আরেকদল বিশ্লেষকও ২-১ ব্যবধানে স্পেনকে এগিয়ে রাখছেন, তাদের যুক্তি— সেমিফাইনালে স্পেন পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল, অথচ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার শারীরিকভাবে কঠিন প্রত্যাবর্তনের ধকল প্রভাব ফেলবে ফাইনালে।
কেউ কেউ স্পেনের ৩-১ ব্যবধানে জয়ের কথা বলছেন, তাদের মতে আর্জেন্টিনার বিশৃঙ্খল যাত্রা এবার এমন এক স্পেনের সামনে পড়বে যারা প্রতিটি বিভাগেই শ্রেষ্ঠ। আবার কেউ কেউ ২-০ ব্যবধানে স্পেনের জয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছেন, মেসির বিপক্ষে বাজি ধরাটা ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও স্পেনের সম্মিলিত মানকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে মত তাদের। আরেকজন বিশ্লেষকও ২-০ ব্যবধানে স্পেনের জয়ের কথা বলছেন এই যুক্তিতে যে অনেক বেশি পরিপূর্ণ দল হিসেবে যুক্তির পাল্লা স্পেনের দিকেই ভারী— যদিও তিনি স্বীকার করেন, আর্জেন্টিনা ও মেসির যুক্তিকে অগ্রাহ্য করার এক অতিপ্রাকৃত অভ্যাস আছে, তবু তিনি স্পেনের দ্বিতীয় শিরোপার পক্ষেই বাজি ধরছেন, যেখানে গোল করবেন ওইয়ারসাবাল ও ইয়ামাল দুজনেই।
ফাইনালের বাঁশি বাজাবেন স্লাভকো ভিনচিচ
রোববারের ফাইনাল পরিচালনা করবেন স্লোভেনিয়ান রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ, যা ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে আর্জেন্টিনার চমকপ্রদ ২-১ গোলের হারের ম্যাচ পরিচালনার পর আর্জেন্টিনার কোনো ম্যাচে তার প্রথম দায়িত্ব। অন্যদিকে, ৪৬ বছর বয়সী এই রেফারি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে স্পেনের তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন আগে, যার সবগুলোতেই জিতেছিল স্পেন— এর মধ্যে আছে ২০২৪ সালের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে তাদের জয়, যার পরপরই স্পেন সেই টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতে। এই দায়িত্ব তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এবং সব মিলিয়ে চতুর্থ বড় জাতীয় দলের টুর্নামেন্ট। তার উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতার তালিকায় আছে ২০২১-২২ ইউরোপা লিগ ফাইনাল (আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্ট বনাম রেঞ্জার্স) এবং ২০২৩-২৪ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল (রিয়াল মাদ্রিদ বনাম বরুশিয়া ডর্টমুন্ড) পরিচালনার অভিজ্ঞতাও।
বিতর্ক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি নতুন নন। গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ার্টার ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদ ও বায়ার্ন মিউনিখের দ্বিতীয় লেগে, সামগ্রিক ব্যবধান ৪-৪ থাকা অবস্থায়, ৮৬ মিনিটে বল ছুঁড়ে খেলা বিলম্বিত করার অভিযোগে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে রিয়ালের এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গাকে মাঠের বাইরে পাঠান ভিনচিচ, এরপর শেষদিকে দুই গোল করে বায়ার্ন এগিয়ে যায়। একই ম্যাচের শেষদিকে প্রতিবাদের জন্য দুটি বুকিং পেয়ে মাঠ ছাড়েন রিয়ালের আরদা গুলেরও, যা তারই সিদ্ধান্ত।
এই ফাইনাল হতে যাচ্ছে ভিনচিচের ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ম্যাচ। এবারের আসরে তিনি ইতিমধ্যে পরিচালনা করেছেন গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল-মরক্কো এবং জর্ডান-আলজেরিয়া ম্যাচ। এই আসরে তার সবশেষ দায়িত্ব ছিল শেষ বত্রিশে মেক্সিকো-ইকুয়েডর ম্যাচে, যেখানে মেক্সিকোর সান্তিয়াগো হিমেনেসের মুখোমুখি হয়ে মুখ ঢাকার অভিযোগে ইকুয়েডরের পিয়েরো ইনকাপিয়েকে লাল কার্ড দেখিয়ে বহুল আলোচিত এক সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তার অতীত বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতায় আছে ২০২২ সালে ওয়েলসের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ৩-০ গোলের গ্রুপ পর্বের জয় পরিচালনার অভিজ্ঞতাও। এই নিয়োগের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৃহস্পতিবার, যখন মিয়ামিতে ফিফার রেফারি দলের ঘাঁটিতে খবরটি পেয়ে আবেগে কেঁদে ফেলেন ভিনচিচ নিজেই।
মতামত দিন