স্বপ্নের বিদায় হলো না মেসির
লিওনেল মেসি আরেকটি বিশ্বকাপ জিতে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হওয়ার বিতর্কে চূড়ান্ত ইতি টানতে পারতেন। কিন্তু ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় আর্জেন্টিনার। ম্যাচ শেষে অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
৩৯ বছর বয়সী মেসি পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে শিরোপাধারী আর্জেন্টিনাকে টেনে তুলেছিলেন আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে। আসরে তিনি আটটি গোল করেন এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে দুটি অ্যাসিস্টও করেন।
তবে কাতার বিশ্বকাপে চার বছর আগে দলকে শিরোপা জেতানোর পর আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত পূরণ হলো না।
যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ১০ জনের আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে স্পেনকে কার্যত কোনো চ্যালেঞ্জই জানাতে পারেনি। বরং ১০৬ মিনিট পর্যন্ত গোল না খেয়ে টিকে থাকাই ছিল তাদের জন্য সৌভাগ্যের। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে জয় নিশ্চিত করে স্পেন।
ম্যাচজুড়ে নিষ্প্রভ ছিল দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। নির্ধারিত সময়ের যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
ফাইনালে মেসিকে দেখা যায়নি তাঁর স্বাভাবিক ছন্দে। শেষ বাঁশি বাজার পর কান্নায় ভেঙে পড়া মেসিকে দেখে অনেকেরই মনে হয়েছে, ২০২২ সালে দোহায় বিশ্বকাপ জয়ের পরই হয়তো আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোই তাঁর জন্য সবচেয়ে স্মরণীয় সমাপ্তি হতে পারত।
কাতারের সেই শিরোপা জয়ে মেসি কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার কীর্তির পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। তবে এবার ভিন্ন এক অর্থে ম্যারাডোনার পথই অনুসরণ করলেন তিনি।
১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয়ের পর ১৯৯০ সালে শিরোপাধারী হিসেবে ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু সেবার পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় তারা। নয়জনের দলে পরিণত হওয়া সেই আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স ছিল রক্ষণাত্মক ও বিতর্কিত।
এবারও স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার কৌশল ছিল মূলত প্রতিপক্ষকে শারীরিক খেলায় চাপে ফেলা। আক্রমণভাগে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়েনি।
পুরো ম্যাচে মেসি বল স্পর্শ করেন মাত্র ৫৪ বার, যার প্রায় অর্ধেকই আসে অতিরিক্ত সময়ে। বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পের সর্বোচ্চ ২২ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করার মতো কোনো সুযোগও তিনি তৈরি করতে পারেননি।
১০ জনের দলে অসহায় মেসি
এনজো ফার্নান্দেজের বিদায়ের পর একমাত্র স্ট্রাইকার হিসেবে মাঠে ছিলেন মেসি। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত কোচ লিওনেল স্কালোনি আক্রমণে সতেজ শক্তি হিসেবে লাউতারো মার্তিনেজকে নামাতেন। কিন্তু মেসিকে মাঠে রাখায় আক্রমণভাগে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি।
আর্জেন্টিনা ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়তে ব্যর্থ হলেও দিনটি ব্যক্তিগতভাবে মেসির জন্য ঐতিহাসিক।
বিশ্বকাপের তিনটি ফাইনালে খেলা মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার হয়েছেন তিনি। এ কীর্তিতে তিনি স্পর্শ করেছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুকে। পেলে তিনটি বিশ্বকাপ জিতলেও ১৯৬২ সালের ফাইনালে চোটের কারণে খেলতে পারেননি। আর ম্যারাডোনা খেলেছেন দুটি ফাইনালে।
তবে সমালোচকেরা মনে করিয়ে দিতে পারেন, মেসি এখন পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেললেও জিতেছেন মাত্র একটি। ২০১৪ সালে জার্মানির কাছে পরাজয়ের পর এবারও ফাইনালে হারতে হলো তাঁকে।
অবসরের ঘোষণা
রোববারের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই, যেখানে ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হেরে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন ২৯ বছর বয়সী মেসি।
তখন তাঁর আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা ছিল শতাধিক। বার্সেলোনার হয়ে অসাধারণ সাফল্যের কারণে তিনি ইতোমধ্যেই সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।
তবে জাতীয় দলের হয়ে ২০১৪ বিশ্বকাপসহ টানা তিনটি বড় ফাইনাল হারের হতাশা থেকেই এসেছিল সেই অবসরের ঘোষণা।
পরে অবশ্য সিদ্ধান্ত বদলে দেশের হয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করেন মেসি। ২০২১ ও ২০২৪ সালে টানা দুটি কোপা আমেরিকা এবং মাঝখানে ২০২২ বিশ্বকাপ জিতে তিনি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
বিশ্বকাপে শেষ অধ্যায়?
উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপের শুরুটা ছিল যেন মেসির বিজয়যাত্রা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচেই করেন হ্যাটট্রিক, এরপরও গোলের ধারা অব্যাহত রাখেন।
বর্তমানে তাঁর আন্তর্জাতিক ম্যাচ সংখ্যা ২০০-এরও বেশি। যৌথভাবে রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৩৪টি ম্যাচও খেলেছেন।
২০৩০ বিশ্বকাপের সময় তাঁর বয়স ৪০ পেরিয়ে যাবে। তাই অনেকের ধারণা, এটাই বিশ্বকাপে মেসির শেষ ম্যাচ।
তবে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তি থাকায় জাতীয় দলের হয়ে আরও কিছুদিন খেলার দাবি উঠতেই পারে।
অসাধারণ সব অর্জনে ভরা এক বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের পরও রোববারের বিশ্বকাপ ফাইনাল মেসি ও আর্জেন্টিনার জন্য হয়ে থাকল এক বেদনাময় সমাপ্তির গল্প।
মতামত দিন