Views Bangladesh Logo

অভিষেক বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে কাঁপিয়ে বিদায় কেপ ভার্দের

নাটকীয়তা, রুদ্ধশ্বাস, উত্তেজনা আর অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ভরা এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের জন্ম দিল মায়ামির আজকের রাত। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে আসা কেপ ভার্দে। ১২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে তিনবার সমতা ভেঙে শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জিতে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করে লিওনেল মেসির দল। তবে ম্যাচজুড়ে যেভাবে লড়াই করেছে ক্ষুদ্র আফ্রিকান দ্বীপরাষ্ট্রটি, তাতে হার মেনেও মাথা উঁচু করেই মাঠ ছেড়েছে তারা।

ম্যাচের ২৯ মিনিটে প্রথম গোলের দেখা পায় আর্জেন্টিনা। রদ্রিগো ডি পলের বাড়ানো বল থেকে তিয়াগো আলমাদার কাটব্যাক পেয়ে বক্সের ভেতর দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বল ধরেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, এরপর তার নিখুঁত থ্রু বল থেকে বক্সের ভেতরে বল পেয়ে দুর্দান্ত ফিনিশে জালে জড়ান অধিনায়ক লিওনেল মেসি। এই গোলের মধ্য দিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের ২০তম বিশ্বকাপ গোল করলেন মেসি; যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ এবং সেই সঙ্গে টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার নতুন বিশ্ব রেকর্ডও গড়েন তিনি। প্রথমার্ধে এই একমাত্র গোলের লিড নিয়েই বিরতিতে যায় আলবিসেলেস্তেরা। যদিও পুরো প্রথমার্ধেই শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ সংগঠন দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ভালোই ভুগিয়েছে কেপ ভার্দে।

দ্বিতীয়ার্ধে ৫৯ মিনিটে চমক দেখায় কেপ ভার্দে। পাল্টা আক্রমণ থেকে তৈরি হওয়া সুযোগে দুর্দান্ত ফিনিশে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন দেরয় দুয়ার্তে, সমতায় ফেরে আফ্রিকান দলটি। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ১-১ সমতায় শেষ হলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের ৯৩ মিনিটে কর্নার থেকে ফের এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। মেসির কর্নার কিক থেকে বক্সের ভেতর উঁচুতে উঠে হেডে জালে বল পাঠান লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, ব্যবধান দাঁড়ায় ২-১। তবে কেপ ভার্দের প্রতিরোধ তখনও শেষ হয়নি। ১০৩ মিনিটে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলে ফের সমতা ফেরান সিদনি লোপেস কাবরাল। বাঁ প্রান্ত থেকে ভেতরে কেটে ঢুকে ডান পায়ের অবিশ্বাস্য বাঁকানো শটে বল জড়ান গোলের ওপরের ডান কোণে, যা পুরোপুরি পরাস্ত করে গোলরক্ষক ভোজিনিয়াকে।

শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয় ১১১ মিনিটে। মেসির নেওয়া আরেকটি কর্নার থেকে বক্সের ভেতর উঁচুতে উঠে হেড করেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, বল পথে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়িয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে গোলটি রোমেরোর নামে লেখা হলেও পরবর্তীতে অফিসিয়াল পরিসংখ্যানে তা কেপ ভার্দে ডিফেন্ডার দিনেই বর্খেসের আত্মঘাতী গোল হিসেবে সংশোধন করা হয়। এই গোলেই ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়া আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত লিড ধরে রেখে নিশ্চিত করে শেষ ষোলোর টিকিট।

পুরো ১২০ মিনিটের ম্যাচে বল দখলে স্পষ্ট আধিপত্য দেখায় আর্জেন্টিনা; তাদের বল দখল ছিল ৬৪ শতাংশ, বিপরীতে কেপ ভার্দের ৩৬ শতাংশ। পাসিংয়েও বিশাল ব্যবধান দেখা যায়। আর্জেন্টিনা ৯২ শতাংশ নির্ভুলতায় খেলে মোট ৭৭৯টি পাস করে, যেখানে কেপ ভার্দে ৮৬ শতাংশ নির্ভুলতায় খেলে ৪০৮টি পাস করে। প্রত্যাশিত গোলের (এক্সজি) হিসাবেও বিশাল ব্যবধান; আর্জেন্টিনার ২.১৬, কেপ ভার্দের মাত্র ০.৪৬।

লক্ষ্যে শট রাখার হিসাবে আর্জেন্টিনা নিয়েছে ১০টি শট লক্ষ্যে (৪৬ শতাংশ নির্ভুলতা), কেপ ভার্দে ৫টি (৩১ শতাংশ)। বড় সুযোগ তৈরিতেও এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। তারা ৩টি বড় সুযোগ তৈরি করলেও কেপ ভার্দে করতে পারেনি একটিও, যদিও কেপ ভার্দে দুটি বড় সুযোগ নষ্ট করেছে। গোলরক্ষকদের পারফরম্যান্সেও ছিল বিস্তর ফারাক; কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া করেছেন ৮টি সেভ, বিপরীতে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের সেভ মাত্র ৩টি। যা প্রমাণ করে ম্যাচে আর্জেন্টিনার আধিপত্য সত্ত্বেও কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ ও গোলরক্ষক কতটা কার্যকর ছিলেন প্রতিরোধে।

ম্যাচে ফাউলের সংখ্যায় দুই দলই প্রায় কাছাকাছি ছিল; আর্জেন্টিনা করেছে ১৩টি ফাউল, কেপ ভার্দে ১২টি। ম্যাচে কোনো লাল কার্ড দেখানো হয়নি, তবে দুটি হলুদ কার্ড দেখানো হয়েছে। ৬৮ মিনিটে মেসিকে জার্সি টেনে থামানোর চেষ্টা করলে হলুদ কার্ড দেখেন কেপ ভার্দের কেভিন পিনা। অতিরিক্ত সময়ের ১১৫ মিনিটে আনাড়ি ট্যাকলের জন্য হলুদ কার্ড দেখেন আর্জেন্টিনার বদলি খেলোয়াড় গনসালো মন্তিয়েল। ম্যাচে কোনো পেনাল্টি কিক দেওয়া হয়নি কোনো দলকেই।

দুই দলই ম্যাচজুড়ে কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে। আর্জেন্টিনা ৬৩ মিনিটে লাউতারো মার্তিনেজের বদলে হুলিয়ান আলভারেজকে, ৬৪ মিনিটে তিয়াগো আলমাদার বদলে নিকোলাস গনসালেসকে মাঠে নামায়। এরপর ৮৪ মিনিটে রদ্রিগো ডি পলের জায়গায় লিয়ান্দ্রো পারেদেস এবং ৮৬ মিনিটে ফাকুন্দো মেদিনার বদলে নিকোলাস তালিয়াফিকো মাঠে নামেন। অতিরিক্ত সময়ে ক্র্যাম্পে ভোগা নাহুয়েল মোলিনার বদলে ১০৪ মিনিটে মাঠে নামেন গনসালো মন্তিয়েল, যিনি পরে হলুদ কার্ডও দেখেন। অন্যদিকে কেপ ভার্দেও একাধিক পরিবর্তন আনে। অতিরিক্ত সময়ে হলুদ কার্ড দেখা কেভিন পিনা ও লারোস দুয়ার্তেকে তুলে ইয়ানিক সেমেদো ও গিলসন বেনশিমলকে মাঠে নামানো হয়।

এই ম্যাচ দিয়ে মেসি বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ ৩০তম ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েন, পাশাপাশি এটি ছিল তার ২৭তম ম্যাচ যেখানে তিনি শুরুর একাদশে ছিলেন; এটিও এক নতুন রেকর্ড। তার গোলে ব্যক্তিগত বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২০-এ, চলতি আসরে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৭-এ, যা এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ। পাশাপাশি টানা আট বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করে এবং টানা পাঁচ নকআউট ম্যাচে গোল করে তিনি গড়েছেন আরও দুটি অনন্য রেকর্ড।

এই জয়ে বিশ্বকাপ শিরোপা রক্ষার মিশনে আরও এক ধাপ এগোল আর্জেন্টিনা। যদিও পুরো ম্যাচেই কেপ ভার্দের প্রতিরোধ তাদের বুঝিয়ে দিয়েছে- শিরোপা ধরে রাখার পথ মোটেও সহজ হবে না। অন্যদিকে নকআউট পর্বে ওঠা দলগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন র‌্যাঙ্কিং নিয়ে আসা কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ যাত্রা এখানেই থামল বটে, কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে তিনবার সমতায় ফিরে লড়াই করার মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় জয় করে নিয়েছে দ্বীপরাষ্ট্রটি।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ