চলতি বছর সারাদেশে ৬৭৬ শিশু হামে আক্রান্ত
চলতি বছর সারাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ৬৭৬ শিশু ভর্তি হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৩৮ জনের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি বিশেষ সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে— ১৫ জন শিশু। গত তিন মাসে শুধু এই হাসপাতালেই হামে আক্রান্ত হয়ে ৬০০ শিশু ভর্তি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল বিভাগের অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, ঢাকায় আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তবে শুধু ঢাকাতেই নয়, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, ময়মনসিংহ, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় হামের রোগী বাড়ছে। আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটসহ এসব এলাকার হাসপাতালে শিশুমৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের প্রকোপ বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ শিশুর অপুষ্টি এবং টিকাদানে ঘাটতি।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রথম ডোজে ৮৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজে ৮২ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে সংক্রমণ রোধে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ টিকাদান প্রয়োজন। এর ফলে কয়েক লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে। পাশাপাশি গত ১৮ মাস অনেক ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হয়নি এবং ২০২৪ সালে পরিকল্পিত বিশেষ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইনও অনুষ্ঠিত হয়নি।
হামে আক্রান্ত ৬৫ শতাংশ শিশুর টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি বলে জানিয়েছেন শ্যামলী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি ও অ্যাজমা হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়শা আক্তার। তিনি জানান, হামের টিকা সাধারণত ৯ মাস বয়সে দেওয়া হয়। হাম অত্যন্ত সংক্রামক— একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারেন। নতুন টিকা দিলে সাধারণত ১০ দিনের মধ্যে শরীরে সুরক্ষা তৈরি হয়, আর আগে টিকা নেওয়া থাকলে পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। তাই দ্রুত শিশুদের টিকার আওতায় আনা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
ইপিআইয়ের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, ২০২৯ সাল পর্যন্ত হামের টিকাসহ চারটি ভ্যাকসিনের মজুত রয়েছে। গাভীর (GAVI) সঙ্গে ২০২৯ সাল পর্যন্ত কো-ফাইন্যান্সিং চুক্তির আওতায় পেন্টা, পিসিভি, এইচপিভি ও টিসিভি ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে চলতি বছর গাভী ৪৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশ সরকার ৫১ শতাংশ অর্থায়ন করছে। ২০২৯ সালে গাভীর অংশ নেমে আসবে ১৯ শতাংশে। তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালে বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া এবং টিকাসংকটের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বক্তব্য দেবে।
রাজশাহী থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম এবং ৬ মাসের কাছাকাছি বয়সীদের সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। গত সোমবার (৩০ মার্চ) বিকেল পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে আরও ১০ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। সোমবার পর্যন্ত এই হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০২ জনে। গত তিন মাসে ভর্তি হয়েছে ২৭০ জন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, টিকাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। জুন মাসে টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আরও শিশুর প্রাণ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে