Views Bangladesh Logo

হামের ‘কামড়’ কি শুধুই অবহেলা, নাকি আমাদের ঘুম ভাঙানিয়া ডাক?

ভেবেছিলাম শত্রুকে আমরা চিরতরে কুপোকাত করে মাঠ থেকে তাড়িয়েছি। পোলিও আর ধনুষ্টঙ্কারের পর 'হাম' নামের যে পুরনো শত্রুটিকে আমরা প্রায় বিদায় জানিয়ে বুক ফুলিয়ে হাঁটছিলাম, সে যে এত তাড়াতাড়ি গোপনে শক্তি সঞ্চয় করে এমন মরণকামড় দেবে, তা বোধহয় কেউ ভাবেনি। এনজিওতে সামাজিক উন্নয়ন বিষয়ে কাজ করার সুবাদে প্রতিদিন মাঠপর্যায়ের নানা তথ্যে আমাদের চোখ রাখতে হয়, ভাবনায় মন রাঙ্গাতে হয় বা ব্যথায় ভারাক্রান্ত হতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় যখন দেখছি যে, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৭০০ ছাড়িয়ে গেছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় লাখ ছুঁইছুঁই, তখন বুকের ভেতরটা সত্যি কেঁপে ওঠে। আমরা যারা শিশুদের অধিকার আর সুস্থ জীবন নিয়ে মাঠে রাতদিন এক করি, আমাদের জন্য এটি শুধু আশঙ্কার নয়, রীতিমতো আতঙ্কের!

দোষ কার? অন্তর্বর্তী সরকার নাকি আমাদের সম্মিলিত ঘুম?
আজকাল চায়ের দোকান থেকে শুরু করে টিভির টকশো—সবখানেই একটা আলোচনা বেশ চড়া সুরে শোনা যাচ্ছে, "সব দোষ অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলার!" শুনতে বেশ মুখরোচক লাগে, সন্দেহ নেই। আমাদের একটা চিরন্তন স্বভাবই হচ্ছে, ঘরে তরকারিতে লবণ কম হলেও আমরা সরকারের নীতি নির্ধারণকে দোষ দিই। তবে একজন মাঠকর্মী হিসেবে একটু নিরপেক্ষ চশমা চোখে লাগিয়ে যদি বাস্তবতার দিকে তাকাই, তবে দেখব এই সংকটের বীজ কিন্তু শুধু আজ বোনা হয়নি, এর পেছনে অতীত ও বর্তমান দুইয়েরই কম-বেশি 'কন্ট্রিবিউশন' আছে।

কঠিন সত্যটা হলো, এখানে অন্তর্বর্তী সরকারেরও একটা বড় দায় থেকে যায়, যা কোনোভাবেই এড়ানো মুশকিল। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কিন্তু বেশ আগেই ঘণ্টা বাজিয়ে আগাম সতর্কতা দিয়েছিল যে, দেশে হামের একটা বড় প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে। কিন্তু অন্তর্বর্তী প্রশাসন তখন হয়তো অন্য কাজে এতই মশগুল ছিল যে, সেই 'রেড অ্যালার্ট' দেখার পরও সঠিক সময়ে টিকা কেনার ফাইলটি সই করতে একটু দেরি করে ফেলেছে! সরকারের এই সাময়িক ঢিলেমি আর আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতের দৌরাত্ম্যে টিকার চালান যখন দেশে পৌঁছাতে দেরি হলো, ততক্ষণে হামের ভাইরাসটি তার 'কামড়' বসানোর জন্য মাঠে নেমে গেছে।

তবে চালকের আসনের এই ভুলের পাশাপাশি যদি আমরা পেছনের ইতিহাসটা ভুলে যাই, তাহলেও কিন্তু অবিচার হবে। রোগতত্ত্ববিদদের তথ্য বলছে, আক্রান্ত ও মারা যাওয়া শিশুদের একটা বিরাট অংশ গত কয়েক বছর ধরেই হাম-রুবেলার নিয়মিত টিকাই পায়নি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় আমাদের পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে ছন্দপতন হয়েছিল, নিয়মিত টিকাদানের যে চেইনটি ভেঙে গিয়েছিল, আমরা কি পেরেছিলাম অলসতা ঝেড়ে তা দ্রুত জোড়া লাগাতে? পূর্ববর্তী সময়ের সেই অবহেলা আর নজরদারির অভাবটাই আজকের এই বারুদ জমার মূল কারণ।

সংকট মোকাবিলায় বর্তমান উদ্যোগ ও আশার আলো
হামের স্বভাবটাই এমন, সে যদি সুরক্ষার সামান্যতম দেয়ালও ভাঙা পায়, তবে বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি, এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায়। তার বিস্তারের গতি রকেটের চেয়ে কম নয়। বর্তমানে দেশের প্রায় সিংহভাগ জেলাই এই সংক্রমণের শিকার। হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে তাকালে বুকটা ভেঙে যায়, নিউমোনিয়া আর তীব্র জ্বরে আক্রান্ত শিশুদের উপচে পড়া ভিড় আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে রোগটি কতটা ভয়ানক রূপ নিয়েছে।


তবে এতসব হতাশার মাঝেও আশার কথা হলো, সরকার এবার আর 'নকশী কাঁথা' মুড়ি দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী ঘুমে মগ্ন হয়ে নেই। শুরুর দিকের ধাক্কা সামলে নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বর্তমান সরকার নির্ধারিত রুটিন সময়ের জন্য হাত গুটিয়ে অপেক্ষা না করে দ্রুত কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, আগুন যখন লেগেছে, তখন ফায়ার সার্ভিসকে চিতার গতিতেই ছুটতে হবে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কিন্তু একা সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই ইউনিসেফ (UNICEF), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আমাদের মতো অন্যান্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে নিয়ে ১ কোটি ৭৮ লাখের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার একটি সুনির্দিষ্ট ও বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। শুরু হয় জরুরি গণটিকাদান কর্মসূচি। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, মাইকিং করে, প্রতিটি পাড়ায় ক্যাম্প করে শিশুদের এই সুরক্ষার আওতায় আনতে দিনরাত এক করে দিয়েছেন।


সরকারি সর্বশেষ পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে একটু স্বস্তি পাওয়া যায়। তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ১ কোটি ৭২ লাখেরও বেশি শিশু হাম-রুবেলার এই জীবনরক্ষাকারী টিকা পেয়ে গেছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৬ শতাংশ! এটি নিঃসন্দেহে একটি বিরাট অর্জন। মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের কাছ থেকে আরও একটি সুখবর আসছে — যেসব এলাকায় শতভাগ টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে নাকি সংক্রমণের গ্রাফটা আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতেও শুরু করেছে। নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমছে, যা আমাদের মাঠকর্মীদের মনে নতুন করে আশার আলো জোগাচ্ছে। যাক, শুরুর দিকে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কর্তৃপক্ষের যে 'কচ্ছপ গতি' আমরা দেখেছিলাম, সেখান থেকে যে তারা এই 'চিতা গতিতে' রূপান্তর হতে পেরেছে তা অন্তত আমাদের কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করে। তবে এই গতি যেন লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ পূরণ না হওয়া পর্যন্ত একচুলও না কমে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এনজিওদের ভাবনা: শুধু টিকা দেওয়াই কি শেষ কথা?
আমরা এনজিও কর্মীরা একটু খুঁতখুঁতে স্বভাবের হই। সরকার যখন টিকাদানের সংখ্যা গোনে, আমরা তখন গোনার চেষ্টা করি, কারা বাদ পড়ে গেল। দুর্গম চরাঞ্চল, উপকূলের প্রত্যন্ত গ্রাম, কিংবা শহরের ভাসমান বস্তির যে শিশুটি এখনো টিকার ছোঁয়া পায়নি, তাকে কে খুঁজবে? আমাদের মূল দুশ্চিন্তা হলো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই সমন্বহীনতা নিয়ে। শুধু একটা বড় ক্যাম্পেইন করে তালি বাজালেই কিন্তু দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নিয়মিত টিকাদানের যে চেইন, তা যেন কখনো আর কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পটপরিবর্তনের ঝড়ে থমকে না যায়, সেই স্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার। মা-বাবার মনে টিকার ব্যাপারে যে অনীহা বা সচেতনতার অভাব রয়েছে, তা দূর করতে এনজিওগুলো দিনরাত কাজ করছে। আমরা ভাবছি, শুধু প্রেস রিলিজ আর সেমিনারে এ সংকটের সমাধান হবে না, সমাধান লুকিয়ে আছে প্রতিটি দুয়ারে কড়া নাড়ার মধ্যে।

সম্মিলিত প্রয়াস: যেভাবে আমরা করবো জয়
কঠিন কথাটা একটু সহজ করে বলি — হাম কোনো রাজনৈতিক দল বোঝে না, কোনো আদর্শ চেনে না; সে চেনে শুধু সুরক্ষাহীন ও অবহেলিত শিশু। তাই এই অদৃশ্য শত্রুকে হারাতে হলে সরকার, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণ — সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

সরকারের কাজ: প্রথমত, টিকার সরবরাহ শৃঙ্খল বা কোল্ড চেইন যেন কখনো ভেঙে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, কোন এলাকায় টিকাদানের হার কম বা কোথায় শিশুরা বাদ পড়ছে, সেই আসল ডেটা বা তথ্য কোনো রকম লুকোছাপা না করে স্বচ্ছতার সাথে সবার সামনে তুলে ধরা। তথ্য লুকিয়ে কখনো রোগ লুকানো যায় না, বরং তা সংকটকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এনজিওদের দায়িত্ব: সরকারের হাতকে মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী করা। দুর্গম চরাঞ্চল, চা-বাগান, পাহাড়ি এলাকা কিংবা শহরের ভাসমান বস্তির মতো 'হার্ড-টু-রিচ' বা পৌঁছানো কঠিন — এমন এলাকার মানুষকে সচেতন করা। আমাদের কাজ শুধু ক্যাম্পেইনের হিসাব মেলানো নয়, বরং প্রতিটি বাদ পড়া শিশুকে আক্ষরিক অর্থেই কেন্দ্রের দোরগোড়ায় ধরে নিয়ে আসা।


ধর্মীয় ও স্থানীয় নেতা এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা: অনেক সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকার ব্যাপারে নানা রকম গুজব বা কুসংস্কার ডালপালা মেলে। এখানে আমাদের মসজিদের ইমাম, স্কুলের শিক্ষক এবং স্থানীয় ইনফ্লুয়েন্সারদের এগিয়ে আসতে হবে। জুমার খুতবায় বা ক্লাসের শুরুতে টিকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দুটি কথা বললে মানুষের মনের ভয় দূর হয়। পাশাপাশি গণমাধ্যমকে শুধু মৃত্যুর সংখ্যা না ছেপে, কোথায় টিকা পাওয়া যাচ্ছে এবং এর কার্যকারিতা কেমন — সেই সচেতনতামূলক বার্তাগুলো বেশি বেশি প্রচার করতে হবে।

তরুণ ও যুবসমাজের উদ্যম: আমাদের দেশের তরুণদের যখনই কোনো ভালো কাজে নামিয়ে দেওয়া গেছে, তারা কিন্তু ইতিহাস তৈরি করেছে। পাড়ার যুব ক্লাব বা তরুণ ভলান্টিয়াররা যদি দায়িত্ব নেন যে, 'আমাদের এলাকায় একটা শিশুও টিকা ছাড়া থাকবে না', তবে সরকারি কর্মীদের খোঁজার আগেই মায়েরা সন্তানদের নিয়ে কেন্দ্রে হাজির হবেন। তরুণদের এই এনার্জিকে টিকাদান কার্যক্রমে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

সাধারণ মানুষের ভূমিকা: সব দোষ ভাগ্যের বা সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। সরকার বা এনজিও আপনার দুয়ারে টিকা এনে দিতে পারে, কিন্তু সন্তানকে কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আপনার। নিজের সন্তান তো বটেই, পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর শিশুটি টিকা পেল কি না, সেই খবরটাও রাখা চাই। টিকা দেওয়ার খবর যখন আসবে তবে 'আজ কাজের চাপ আছে' বলে অবহেলা করবেন না। পরম যত্নে, আদর করে সন্তানকে টিকার আওতায় আনুন। মনে রাখবেন, সচেতনতা কোনো দামী পানীয় বা আমদানিকৃত ওষুধ নয় যে কিনতে লাখ টাকা লাগবে; এটা কেবল একটু সদিচ্ছার ব্যাপার, সামান্য একটু সচেতনতার বিষয়। আমরা যদি যার যার জায়গা থেকে এই দায়িত্বটুকু পালন করি, তবে হাম কেন, যেকোনো রোগকেই সীমানা পার করে দেওয়া কোনো ব্যাপারই না!

শেষ কথা-যাবে না হাল ছাড়া
ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশ এমন এক আশ্চর্য দেশ, যা বহুবার বহু মহামারি আর দুর্যোগের মুখ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো বেঁচে ফিরেছে। ওআরএস (ORS) খাইয়ে ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা বা পোলিও কিংবা হালের কোভিড অতিমারি বা করোনা মুক্ত দেশ গড়ার যে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমাদের আছে, তা কিন্তু এই এনজিও এবং সরকারের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করারই ফসল।

হাম সাময়িকভাবে আমাদের একটু চমকে দিয়েছে সত্যি, আমাদের কিছু প্রিয় শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়ে আমাদের বুক খালি করেছে। কিন্তু এই দুঃখ আমাদের থামিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, বরং আরও শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর জন্য। আমাদের ভ্যাকসিনেটরদের ক্লান্তিহীন হাত, মায়েদের সচেতন চোখ আর মাঠকর্মীদের উদ্যমই বলে দেয় — এই লড়াইয়ে পরাজয়ের কোনো সুযোগ নেই।

মেঘের পরেই যেমন সূর্য হাসে, তেমনি আমাদের এই সম্মিলিত চেষ্টায় হামের এই অন্ধকার মেঘ কেটে যাবেই। আমরা আবার হাসব, আমাদের শিশুরা আবার নির্ভয়ে খেলবে ধুলোবালি মাখা উঠোনে — কোনো এক রোগমুক্ত, সুন্দর সকালে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ