রাজশাহীর হাম বিপর্যয়: আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা নাকি কাঠামোগত সহিংসতা
হাম — চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি অত্যন্ত সংক্রামক, কিন্তু শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য একটি ভাইরাস। তবে রাজশাহীর বর্তমান পরিস্থিতিতে এই শব্দটি আর কেবল একটি ক্লিনিক্যাল পরিভাষায় সীমাবদ্ধ নেই— এটি হয়ে উঠেছে একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যর্থতার জীবন্ত দলিল। গত দেড় মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে এই রোগের জটিলতায় প্রাণ হারিয়েছে ৫৩টিরও বেশি শিশু। সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস এবং দেশের প্রধান গণমাধ্যমগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, মাত্র দুই সপ্তাহেই হামের গ্রাসে হারিয়ে গেছে ৪৪টি প্রাণ। আর এই লেখাটি চূড়ান্ত হওয়ার আগের মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় আইসিইউর দীর্ঘ সিরিয়ালে অপেক্ষা করতে করতে নিভে গেছে আরও ৩টি নিষ্পাপ শিশুর জীবনপ্রদীপ।
মহামারির দোরগোড়ায় রাজশাহী
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরীক্ষাগার তদন্ত বলছে, এই অঞ্চলে হামের পজিটিভিটি রেট বর্তমানে ২৯.৪ শতাংশ। মহামারি বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, হামের শনাক্তের হার ৫ শতাংশ ছাড়ালেই তাকে ‘মহামারি সীমা’ বা জরুরি অবস্থা হিসেবে ধরা হয়। সেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ শনাক্তের হার অর্থ হলো— আমরা একটি ভাইরাসের সামনে আমাদের গোটা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নিরস্ত্র করে রেখেছি। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গবেষণা সাময়িকী দ্য ল্যান্সেট হামের প্রাদুর্ভাবকে যেকোনো দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ‘লিটমাস টেস্ট’ বলে বর্ণনা করে। রাজশাহীর এই ছবি প্রমাণ করে দিচ্ছে, আমরা ৯৫ শতাংশ গণটিকার সুরক্ষা বজায় রাখতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি এবং তার ফলে গড়ে উঠেছে টিকাহীন শিশুদের এক বিশাল প্রজন্ম— যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধের কোনো ঢাল নেই।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন ৬৬১ কোটি টাকার জরুরি ভ্যাকসিন আমদানির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য নীতির মূল কথাই হলো— একটি প্রাণ যাওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক বিনিয়োগ করতে হয়। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, মাঠ পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘ স্থবিরতা এবং অপারেশন পরিকল্পনায় বারবার পরিবর্তনের কারণেই এই বিশাল টিকা-ফাঁক তৈরি হয়েছে। লাশের সারির ওপর দাঁড়িয়ে বাজেট ঘোষণা আসলে একটি বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া ছাড়া আর কিছু নয়। এটি কেবল প্রমাণ করে যে আমাদের নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় রোগ প্রতিরোধের চেয়ে সংকট ব্যবস্থাপনার দিকেই ঝোঁক বেশি।
ভাইরাসের পাশে আরেক ঘাতক — আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা
ভাইরাসের সমান্তরালে রাজশাহীতে আরেকটি ঘাতক সক্রিয় হয়ে উঠেছে— আমাদের সিদ্ধান্তহীন আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা। রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে যখন ছোট্ট শিশুরা অক্সিজেনের জন্য লড়াই করছে, সেখান থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে বহরমপুর সিটি বাইপাসে দাঁড়িয়ে আছে ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল। অথচ তার প্রবেশদ্বারে ঝুলছে বিশাল এক তালা। কারণ কী? হাসপাতালটির জনবল কাঠামোর ফাইল এখনো অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের টেবিলের গোলকধাঁধায় আটকে আছে।
হাম ভাইরাস কিন্তু কোনো দাপ্তরিক অনুমোদনের জন্য বসে থাকে না। ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮’-এর ধারা ১৪ ও ১৬ রাষ্ট্রকে জরুরি পরিস্থিতিতে যেকোনো অবকাঠামো ব্যবহারের সম্পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতার প্রয়োগ না ঘটিয়ে রামেক হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ শিশুদের সাথে একসাথে রাখা হচ্ছে— এতে রোগ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং তৈরি হচ্ছে এক ভয়াবহ সংক্রমণের ফাঁদ। এটি শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, এটি আমাদের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদ এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী যেখানে ভেন্টিলেটর সংকটে শিশুমৃত্যু নিয়ে হাসপাতাল পরিচালকের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, সেখানে পাশের তালাবদ্ধ হাসপাতালটিকে কাজে না লাগানো একটি ক্ষমার অযোগ্য প্রশাসনিক বিচ্যুতি।
মৃত্যু কি সত্যিই ‘প্রাকৃতিক’?
আইসিইউর অভাবে গত ৪৮ ঘণ্টায় যে ৩টি শিশু মারা গেল, তাদের মৃত্যুর কাগজে হয়তো লেখা থাকবে ‘হাম’ বা ‘জটিল নিউমোনিয়া’। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান ও আধুনিক মানবাধিকারের দৃষ্টিতে এটি আসলে এক ধরনের ‘কাঠামোগত সহিংসতা’। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোহান গালতুং বলেছেন— যখন জীবন বাঁচানোর মতো যথেষ্ট অবকাঠামো ও সম্পদ হাতের কাছে থাকা সত্ত্বেও কেবল ব্যবস্থার সিদ্ধান্তহীনতার কারণে প্রাণের অবসান ঘটে, তখন সেটিকে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বলার কোনো সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রীয় অবহেলাজনিত প্রাণহানি— যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘রাষ্ট্রীয় অবহেলা’ হিসেবে চিহ্নিত।
রাজশাহীর এই সংকট আসলে আমাদের প্রতিক্রিয়াশীল শাসনব্যবস্থার একটি নগ্ন উদাহরণ। এখানে প্রশাসন কেবল তখনই সক্রিয় হয় যখন মৃত্যুর মিছিল গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে ওঠে। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি যেখানে রোগ প্রতিরোধের চেয়ে সংকটের পরে চিকিৎসা এবং দায়িত্ব নেওয়ার চেয়ে দায় এড়ানোর সংস্কৃতিটাই প্রবল। মেগা অবকাঠামোর চাকচিক্য আর প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে একটি শিশুর শেষ নিঃশ্বাসের আর্তনাদ ঢাকা যায় না। যখন রাষ্ট্র একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি করেও তা তালাবদ্ধ রেখে শিশুদের মেঝেতে মরতে বাধ্য করে, তখন সেই ব্যবস্থাটি কেবল অকার্যকর নয়— নৈতিকভাবেও দেউলিয়া।
এখনই যা করা জরুরি
রাজশাহীর এই আর্তনাদ পরিসংখ্যানের কারচুপি বা দালানের চাকচিক্য দিয়ে ঢাকার কোনো উপায় নেই। আমলাতান্ত্রিক ফাইল বড়, নাকি ৫৩টি শিশুর প্রাণ বড়— রাষ্ট্রকে আজ এই নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। অবিলম্বে বহরমপুর হাসপাতালের তালা ভাঙতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে অ্যাড-হক নিয়োগের মাধ্যমে অন্তত একটি বিশেষায়িত হাম আইসোলেশন ও আইসিইউ ইউনিট চালু করা এখন সময়ের দাবি।
মনে রাখতে হবে— প্রতিটি শিশুর মৃত্যু আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কফিনে একেকটি পেরেক। রাজশাহীর এই বিয়োগান্তক অধ্যায় যেন আমাদের নীতিনির্ধারকদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির মতো যেন চিকিৎসাহীনতার সংস্কৃতিও আমাদের গ্রাস না করে— রাষ্ট্রের কাছে আজ এটাই আমাদের একমাত্র নিবেদন। আজকের সিদ্ধান্তহীনতা যদি কালকের আরও অনেক প্রাণের বিনাশ ঘটায়, তাহলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় এই প্রজন্মকে জবাবদিহি করতে হবে।
লেখক: মো. শামীউল আলীম শাওন
উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী (শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননা প্রাপ্ত)
সভাপতি, ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস), রাজশাহী

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে