২৫ মার্চ কালরাত: শহীদ চিশতী স্মরণে
পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম দুধর্ষ, দুঃখজনক, হৃদয়বিদারক ঘটনার মধ্যে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের শবদেহ থেকে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি। রাষ্ট্রটির জন্মের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে অনেক রক্তাক্ত ইতিহাস।
২৫ মার্চের গণহত্যার ঐ কালো রাতে
ইয়াহিয়া বিদায় নিয়ে চইল্যা গেলেও,
নিজের চোখে গণহত্যা দেখার জন্য
ভুট্টাে থাইক্যা গেছিল ঢাকাতেই।
সবসময় তো গণহত্যা দেখার এইরকম সুযোগ আসে না। - নির্মলেন্দু গুণ
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে অতর্কিতভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের সূত্রপাত ঘটায়। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চলাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু। এই হলটিকে তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্র মনে করত। কারণ আগরতলা ষড়যন্ত্রের কথিত আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক-কে পাকিস্তান আর্মি বন্দী অবস্থায় গুলি করে হত্যা করে। তাঁর হত্যার পর তৎকালীন ইকবাল হলের নাম পরিবর্তন করে সার্জেন্ট জহুরুল হকের নামে নামকরণ করা হয়। এই নামকরণের পর ছাত্রলীগের ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল থেকে।
অপারেশন সার্চলাইট শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যে পাক সেনারা জহুরুল হক হলে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। তাদের ধারণা ছিল জহুরুল হক হল ও জগন্নাথ হল থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধ আসবে। কারণ মার্চের অসহযোগ আন্দোলন চলার সময়ে জহুরুল হক হল মাঠে ছাত্রদের অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
পাকিস্তানি বাহিনী হলটিতে ভারী অস্ত্র, কামান ও মর্টার দিয়ে গোলাবর্ষণ করে এবং ভেতরে প্রবেশ করে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায় । সেই রাতে শুধু এই হলেই প্রায় ২০০ জন ছাত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শহীদ হন।
সেই ২০০ জনের একজন শহীদ চিশতী শাহ হেলালুর রহমান। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ১৪ ডিসেম্বর ১৯৯১ তারিখে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী টিকেট নবম পর্যায়’- এ হেলালুর রহমানের নামে স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করে। তিনি ছিলেন বগুড়ার প্রথম শহীদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি ১৭ জানুয়ারি ১৯৯৮ সালে শহীদ চিশতী লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করে।
হেলালুর রহমান ১৯৪৯ সালে বাংলাদেশের বগুড়া জেলার রহমাননগরে জন্মগ্রহণ করেন। বেসরকারী চাকরিজীবী চিশতী মনসুর রহমান এবং সাজেদা খাতুনের ৪ সন্তানের মধ্যে হেলালুর ছিলেন সবার বড়। বগুড়া জেলা স্কুল থেকে তিনি ১৯৬৫ সালে মাধ্যমিক এবং বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে ১৯৬৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে যথাক্রমে ১৯৭০ ও ১৯৭১ সালে।
মাকে তিনি বড় বেশি ভালোবাসতেন, স্কুল কলেজ জীবনে তিনি লেখাপড়া আর অন্য কাজের ফাঁকে মাকেও দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করতেন। স্কুল জীবনেই তিনি স্কাউটিংয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি একাধিকবার জাম্বুরীতে অংশগ্রহণ করেছেন। স্কুল নাট্যদলেরও সক্রিয় সদস্য ছিলেন তিনি, একাধিক নাটকেও অংশগ্রহণ করেছেন। আবাসিক ছাত্র হিসেবে হেলালুর সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ২১২ নম্বর কক্ষে থাকতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থাতেই তার সাংবাদিকতা শুরু। ১৯৭১ সালে তিনি দৈনিক আজাদ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা ছিলেন। বস্তুনিষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনে তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল। তিনি ১৯৬৯ সালে ইকবাল হল শাখা ছাত্র সংসদের পাঠাগার সম্পাদক এবং বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সহ-সভাপতি ছিলেন।
হেলালুর রহমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রনেতা হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন, সাহসী এবং সংগঠক হিসেবে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে ছিল তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সাহসী ভূমিকা। ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলা পতাকা উত্তোলন দিবসে তিনি ছাত্রলীগ প্যারেডে নেতৃত্ব দেন।
সিরাজুল আলম খান প্রতিষ্ঠিত বাস্তুহারা সমিতির প্রতিষ্ঠাকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন চিশতী শাহ। কাটাবন-নীলক্ষেত-পলাশী বস্তিবাসীদের স্বাধীনতার পক্ষের কর্মী তৈরির কাজটি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে পালন করতেন তিনি। পাকিস্তানকে নিজের দেশ মনে করতেন না বিধায় পাকিস্তানের পতাকা এবং জাতীয় সংগীতকে সম্মান দেখাননি।
আলোকচিত্রী পাভেল রহমান তাঁর লেখা ‘আমার মুক্তিযুদ্ধ’ বইতে লিখেছেন তিনি কীভাবে হেলালুর রহমান চিশতীর সাথে পরিচিত হন। পাভেল রহমান স্কুলে পড়া অবস্থায় ছাত্র ইউনিয়নের ছাত্র সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। উত্তাল মার্চে তখন সবেমাত্র তাঁরা মালিবাগ থেকে আজিমপুর কলোনিতে বাবার নামে বরাদ্দ বাসায় এসে উঠেছেন। তাঁর স্কুলের ছাত্র ইউনিয়নের বড় ভাই কামরুল আহসান খান জানালেন ছাত্র ইউনিয়ন মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং দেবে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতার পক্ষ থেকে কর্মীদের জন্য নির্দেশ এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ময়দানে ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণে যোগ দিতে। এদিক দিয়ে ছাত্রলীগ এক ধাপ এগিয়ে- ‘জয় বাংলা বাহিনী’ ইতোমধ্যে বুয়েটের শেরে বাংলা হলে প্রশিক্ষণ শুরু করেছে।
আজিমপুর কলোনি থেকে শেরে বাংলা হল কাছে। বন্ধু টুকু তাকে পরামর্শ দিলেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন বলে আলাদা কিছু নেই। যেখানে পারো ট্রেনিংয়ে ঢুকে পড়ো। বন্ধুর কথায় পাভেল শেরে বাংলা হল, জয় বাংলা বাহিনীর কমান্ডার চিশতী শাহ হেলালুর রহমানের কাছে হাজির হলেন। চিশতী ভাই তাঁকে কোন প্রশ্ন না করেই প্রশিক্ষণের জন্য যুক্ত করে নিলেন। ‘জয় বাংলা বাহিনী’র কাছে গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন পাভেল রহমান।
ক’দিন পরে এলো পঁচিশে মার্চ, অন্যান্য দিনের মত আজও তারা প্রশিক্ষণ শেষ করলেন। তবে অন্যান্য দিনের মত আজকের সন্ধ্যাটা একটু আলাদা। অন্যান্য দিন প্রশিক্ষণ শেষ করে বাড়ি ফিরে গেলেও ওই দিন ‘জয় বাংলা বাহিনী’র কমান্ডার চিশতী ভাই তাঁদের অপেক্ষা করতে বলেছেন।
কিছু পরে সন্ধ্যা নামলো- অপেক্ষা করছেন- সন্ধ্যায় আলো আধারির ফাঁক দিয়ে হঠাৎ একটা জিপ গাড়ি হলের গেট দিয়ে প্রবেশ করলো। জিপে আসা নেতারা ধুপধাপ করে কিছু মাল নামালো। জিপটা চলে যাওয়ার পর তাদের লাইন করে দাঁড় করানো হলো। এরপর প্রত্যেকের হাতে একটি করে মল্টভ ককটেল তুলে দেওয়া হলো। এগুলো নেতারা নিয়ে এসেছেন, তাঁদের জন্য। প্রতি দু’জনের জন্য একটি করে মল্টভ ককটেল দেয়া হলো। পাভেলের সঙ্গে ছিল বন্ধু চাঁদু। চাঁদু আর পাভেল মিলে পেলো একটি। এর আগেই তারা গেরিলা কায়দায় মল্টভ ককটেল ছোঁড়ার নিয়ম হাতে-কলমে শিখেছিলেন। তারপরে চিশতী ভাই শিখিয়ে দিলেন কীভাবে আগুন লাগাতে হবে, জ্বলন্ত ককটেল কীভাবে ছুঁড়ে মারতে হবে এইসব। চিশতী ভাই জানালেন- আজ রাতেই চূড়ান্ত হামলা করবে পাকিস্তানি মিলিটারিরা।
রাস্তায় ব্যারিকেড দিতে হবে আজ রাতেই। ব্যারিকেডে মিলিটারিদের গাড়ি থামা মাত্রই ছুঁড়ে মারতে হবে ককটেল। সেভেন আপের বোতলে রাখা লিকুইড পেট্রল বোতলটা উল্টালেই ছিপিতে লাগানো সুতলি ভিজে যাবে। আর তখনই আগুন ধরিয়ে ককটেল ছুঁড়ে মারতে হবে লক্ষ্যবস্তুর উদ্দেশ্যে। ব্যস তারপর দৌড়। সটকে পড়তে হবে মুহূর্তে, যদি বেঁচে থাকো। চিশতী ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় তিনি বললেন- সাবধানে থাকিস। বেঁচে থাকলে দেখা হবে। জয় বাংলা।
ছাত্রলীগের গোলাম ফারুক আর চিশতী শাহ হেলালুর রহমান এই দুই জনের মধ্যে দৃঢ় বন্ধুত্ব ছিল। তিনি মাঝে মাঝে বন্ধু ও সাথী গোলাম ফারুক, এবং ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি মনিরুল ইসলামের বাড়িতে যেতেন। মার্শাল মনিরুল ইসলামের বাড়ি ছিল ছাত্রলীগের সদস্যদের জন্য সবসময় উন্মুক্ত। মার্শাল মনির মা বেগম সুফিয়া- ছেলের সংগঠনের ছেলে-মেয়েদের নিজ সন্তানের মত স্নেহ ভালবাসা দিতেন। ভাইবোনেরা মাকে অনুসরণ করতেন। চিশতী ভাই মাছ খাওয়ার লোভে মার্শালের বাসায় মাঝেমধ্যে যেতেন। তিনি মাছ বেছে খেতে পারতেন না। মনি ভাইয়ের বাসায়, মা কিংবা বোনেরা তাঁকে পরম স্নেহ ভালবাসায় মাছ বেঁছে দিতেন।
১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাত ন'টা কিংবা দশটা নাগাদ, সম্ভবত তারা তিনজন- মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিস, গোলাম ফারুক ও শাহ চিশতী হেলালুর রহমান, ইকবাল হলের গেটের কাছে বসে রাজনৈতিক আড্ডায় ছিলেন। এমন সময় আবদুর রাজ্জাক ,অডিটরিয়ামের সামনে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে এসে বললেন- ‘শহরে সেনাদের ঘোরাঘুরি দেখা যাচ্ছে, তোমরা হলে থেকো না- হল থেকে চলে যাও।’ গোলাম ফারুক ক্ষুধার্ত ছিলেন, তিনি চিশতিকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর সঙ্গে তাঁর বাসায় যেতে, কিন্তু চিশতী যেতে রাজি হলেন না। হলেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
ছাত্রলীগের কনিষ্ঠ সদস্য রোজী আর বেবীর বাসা ছিল ১৭ নম্বর বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় ইকবাল হলের বিপরীতে একতলা মুখোমুখি বাড়িতে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকা, আর ইকবাল হলে কোন সীমানা প্রাচীর ছিল না। রোজী, বেবী, খুব ভোরে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে চিশতিকে পাক আর্মি ধরে নিয়ে যাচ্ছে। রোজী-বেবী দুই বোন চিৎকার করে ক্রন্দন করতে থাকে, তাঁদের বাবা জানালার পাশ থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। ওরা তখন চিশতী ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনতে পায়- ‘রোজী, বেবী আমাকে বাঁচাও।’
জহুর হলের মাঠে শুয়ে আছে একদল সারিবদ্ধ যুবা,
যন্ত্রণাবিকৃত মুখ তবু দেশপ্রেমে অমলিন। - নির্মলেন্দু গুণ
‘আত্মকথা ৭১’ বইতে নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন ২৭ মার্চ সকাল সাড়ে দশটার দিকে তিনি সাহস করে বন্ধু হেলাল হাফিজের সন্ধানে সার্জেন্ট জহুরুল হলে যান। অনেকেই প্রাণের ভয়ে সেখানে প্রবেশ করতে সাহস পাচ্ছিল না। সামান্য কিছু লোক সেখানে জড়ো হয়েছিল। তিনি এগিয়ে গিয়ে মাঠে প্রবেশ করে দেখেন মাঠের পাশে কয়েকটি মৃতদেহ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তাঁদের দেহ রক্তাক্ত, যন্ত্রণাবিকৃত, আগুনে ঝলসানো। ভাল করে চেনা যায় না। মৃতদেহের মধ্যে তাদের বন্ধু হেলাল হাফিজ নেই, আরেক বন্ধু চিশতী হেলালুর রহমান আছেন। ছাত্রলীগের চিশতী হেলালুর রহমান। চিশতী কবিতা লিখতো, দু'তিনদিন আগে শরীফ মিঞার কেন্টিনে একটি কবিতা নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছিলো। আজ চিশতীর লাশ তার সামনে।
মোস্তফা মহসিন মন্টুর সঙ্গে ওই রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চিশতী সম্পর্কে তিনি কিছু তথ্য পান, তা জেনে তার মন অপরাধবোধে আক্রান্ত হয়। ২৫শে মার্চ রাতে মোস্তফা মহসিন মন্টু বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে ফিরে নেতার নির্দেশক্রমে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে রাখা অস্ত্র বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জে পাচার করছিলেন, তখন ওই দুঃসাহসিক দায়িত্ব সম্পাদনে চিশতী ছিলেন তাঁর সর্বক্ষণের সাথী। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে মন্টু জহুরুল হক হল ত্যাগ করে নদীর ওপারে চলে যান। তিনি চিশতীকে নদীর ওপারে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চিশতী যেতে রাজি হয়নি। সে বলেছিলো রাতে তার কিছু কর্মী হলে তার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। তাদের সবাইকে নিয়ে ২৬শে মার্চ সে নদীর ওপারে মন্টুর বাড়িতে যাবে। সেটাই ছিল চিশতীর সাথে মন্টুর শেষ কথা। চিশতী জানতো না তার প্রিয় ছাত্রাবাসে এটাই তাঁর শেষ রাত।
বাংলা একাডেমির সাবেক কর্মকর্তা মফিজুল ইসলামের ‘আমার বন্ধু’ রচনা থেকে।তিনি লিখেছেন, ‘‘সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের দু’শো বারো নম্বর রুম থেকে-
পঁচিশে মার্চ রাতে হানাদার বাহিনী যখন ঘুমন্ত ছাত্রদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু করে তখন চিশতী দোতলায় ওর জানালার পাশের হল আর অডিটরিয়ামের মাঝামাঝি শেডটির ওপর লাফিয়ে পড়ে।
সারাটা রাত ওই শেডের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকে চিশতী। জীবন-মৃত্যুর লড়াই হলো সারারাত।
পূর্বের আকাশ ফরসা হয়ে গেছে। সারারাত গুলিবর্ষণের পর পাকিস্তানী হায়েনাদের যন্ত্রগুলো তখন নিশ্চুপ। অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেয়েছে, চিশতী হয়তো তাই ভেবেছিলো।
হানাদার বাহিনীর কেউ কোথাও আছে কিনা দেখার জন্য চিশতী যখন মাথাটা সামান্য উঁচু করলো, ঠিক তখনই খালেকের দোকানের সামনে পাহারারত হানাদার কুকুরটা তেড়ে এলো।
নুরু নামের এক রিকশাওয়ালাকে লাশ কুড়িয়ে এক জায়গায় জমা করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছিলো। চিশতী শেডের ওপর থেকে লাফ দিতে চাইলে ও বাধা দিয়ে বললো, ‘পাইপ বেয়ে নেমে আসুন স্যার, লাফ দিবেন না।’
হলের সামনে পুকুরের পাশে মেজর। তার কাছে নিয়ে যাওয়া হলো চিশতীকে। দৈনিক আজাদ’র বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে নিজের পরিচয় পেশ করলো চিশতী। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না।
হলের পেছনদিক থেকে ডাইনিং হলের দিকে যেতে যে সরু রাস্তাটা— তারই পাশে ড্রেনের কাছে গাছটির নীচে দাঁড় করিয়ে পর পর তিনটি গুলি করা হলো চিশতীকে। প্রথম গুলিটি যখন ওর বুকের বামপাশ ভেদ করে বেরিয়ে গেল, তখনই তিনি 'জয় বাংলা' বলে চিৎকার করে উঠেছিলেন।
চিশতী কি কোন বধ্যভূমিতে পঁচে গলে মাটির সাথে মিশে গিয়েছিলো, নাকি বর্বর বাহিনী পেট্রোল দিয়ে তার দেহটা জ্বালিয়ে দিয়েছিলো, তা আমরা কেউ জানতে পারিনি।’’
(স্মৃতি: ১৯৭১, তৃতীয় খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯৯০, সম্পাদনা রশীদ হায়দার)
আমার স্মৃতিতে শহীদ শাহ চিশতী হেলালুর রহমান, মিটিং মিছিলে দেখা মোটা ফ্রেমের চশমা, পাঞ্জাবি, পায়জামা পড়া কাঁধে ঝোলা ব্যাগ।
পাঞ্জাবি, পরিপাটি পায়জামা,
হে যুবক, তুমি কি স্নিগ্ধতার উপমা?
কাঁধের ওপর ঝুলন্ত ব্যাগ
নিভৃত মনে কোনো স্বপ্নের সাজ।
চলার পথে ধুলোমাখা এক পথিকের হাসি,
মুঠোয় তোমার একগুচ্ছ বুনোফুলের রাশি।
চোখে মোটা ফ্রেমের গভীরে চশমার নীচে জমে আছে কত না বলা কথা,
বুকের ভেতর সুপ্ত কোনো গভীর মমতা।
শান্ত পায়ে হেঁটে যাও, সজীব এ ভূমি।
পাঞ্জাবির ভাঁজে লুকোনো তোমার সারল্য,
তুমি যেন স্নিগ্ধ ভোরের প্রথম কাব্য।
কবির নাম খুঁজে পেলাম না। অন্তর্জাল থেকে নেওয়া। শব্দবন্ধটি সম্ভবত একক কারও লেখা নয়, তাই চিশতি ভাইয়ের সাথে মিলিয়ে, আমি দু'একটা শব্দ যুক্ত করেছি।
লেখক পরিচিতি: কাজী ফেরদৌসী হক লিনু, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে