ম্যানকিপিং: নারীর কাঁধে পুরুষের মানসিক ভার বহনের অদৃশ্য শ্রম
সম্পর্কের ভেতরে এমন অনেক কাজ আছে, যেগুলো চোখে দেখা যায় না, এর জন্য কোনো বেতনও পাওয়া যায় না। এমনকি অনেক সময় এসব কাজের স্বীকৃতিও মেলে না। অথচ প্রতিদিন অনেক নারী নীরবে এই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। সঙ্গীর মন খারাপ হলে তাঁর কথা শোনা, বন্ধুর জন্মদিন মনে করিয়ে দেওয়া, পরিবারের সবার সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখা কিংবা সঙ্গীর সামাজিক জীবন ঠিক রাখতে নানা দায়িত্ব নেওয়া এর উদাহরণ। এসব অদৃশ্য দায়িত্বকে এখন একটি নতুন নামে ডাকা হচ্ছে, ‘ম্যানকিপিং’। সহজ বাংলায় বলা যায়, ‘পুরুষের সামাজিক ও মানসিক দেখভাল’।
শব্দটি প্রথম সামনে আনেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী অ্যাঞ্জেলিকা ফেরারা। তিনি সহগবেষক ডিলান ভেরগারার সঙ্গে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ‘সাইকোলজি অব মেন অ্যান্ড ম্যাস্কুলিনিটিজ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এই ধারণা তুলে ধরেন।
তাঁরা ‘কিনকিপিং’ নামের একটি পুরোনো ধারণা থেকে ‘ম্যানকিপিং’ শব্দটি তৈরি করেন। ‘কিনকিপিং’ বলতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো রাখার সেই অদৃশ্য দায়িত্বকে বোঝানো হয়, যা ঐতিহাসিকভাবে নারীরাই বেশি পালন করে আসছেন। ১৯৮৫ সালে সমাজবিজ্ঞানী ক্যারোলিন রোজেন্থাল এই ধারণাটি সামনে আনেন।
তবে ম্যানকিপিং কিছুটা আলাদা। এখানে মূল বিষয় হলো, নারীরা তাঁদের পুরুষ সঙ্গীর সামাজিক ও মানসিক জীবন ঠিক রাখতে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। যেমন স্বামীর বন্ধুর জন্মদিন মনে রাখা, উপহার কেনা, কার সঙ্গে কখন যোগাযোগ করতে হবে তা মনে করিয়ে দেওয়া, ছেলের সামাজিক সময়সূচি ঠিক করে দেওয়া কিংবা কোনো পুরুষ আত্মীয়ের মানসিক সমস্যার সময় তাঁর প্রধান ভরসা হয়ে ওঠা।
এই কাজগুলো অনেক সময় ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকেই করা হয়। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন সব দায়িত্ব একতরফাভাবে একজনের ওপর পড়ে যায়। একজন সবসময় অন্যজনের মন ভালো রাখবেন, সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখবেন এবং সামাজিক যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করবেন, কিন্তু তাঁর নিজের প্রয়োজনের সময় একই ধরনের সহযোগিতা পাবেন না, তখন সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
গবেষকদের মতে, এর সঙ্গে পুরুষদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব কমে যাওয়ার বিষয়টিও জড়িত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক পুরুষের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সংখ্যা আগের তুলনায় কমছে। ফলে মানসিক সমর্থনের জন্য তাঁরা অনেক বেশি নির্ভর করছেন তাঁদের রোমান্টিক সঙ্গীর ওপর। ছোটবেলা থেকেই পুরুষদের আবেগ প্রকাশ না করতে শেখানো এবং দুর্বলতা প্রকাশকে নিরুৎসাহিত করার সামাজিক সংস্কৃতিও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
ফলে অনেক ক্ষেত্রে একজন নারী শুধু তাঁর সঙ্গী হিসেবেই থাকছেন না, একই সঙ্গে হয়ে উঠছেন তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু, মানসিক সহায়তাকারী এবং সামাজিক যোগাযোগের প্রধান ব্যক্তি। অর্থাৎ একজন পুরুষের যে সামাজিক ও মানসিক সহায়তা কয়েকজন মানুষের কাছ থেকে পাওয়ার কথা, তার বড় একটি অংশ এসে পড়ছে একজন নারীর ওপর।
তবে ‘ম্যানকিপিং’ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। কেউ মনে করেন, সম্পর্কের ভেতরে নারীরা যে অতিরিক্ত অদৃশ্য দায়িত্ব পালন করেন, এই শব্দটি সেটিকে বোঝার একটি সহজ উপায় দিয়েছে। আবার কেউ মনে করেন, সঙ্গীর পাশে দাঁড়ানো, তাঁর কথা শোনা বা তাঁকে মানসিকভাবে সহায়তা করাকে শুধু ‘শ্রম’ হিসেবে দেখলে সম্পর্কের ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি খুব সরল করে দেখা হয়।
আসলে সঙ্গীর পাশে থাকা কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই, যখন এই দায়িত্ব একতরফা হয়ে যায়। একজন সবসময় দেবেন, আর অন্যজন শুধু নেবেন, এমন সম্পর্ক দীর্ঘদিন সুস্থভাবে টিকে থাকা কঠিন।
তাই ম্যানকিপিংকে শুধু নারীদের অভিযোগ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং এটি সম্পর্কের ভেতরে দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে কথা বলার একটি সুযোগ। কে কার মানসিক ভার কতটা বহন করছেন, কে পরিবারের ও সামাজিক সম্পর্কগুলো ধরে রাখছেন, আর দুজনেই কি সমানভাবে একে অন্যকে সহযোগিতা করছেন, এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
সুস্থ সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিকতা। ভালোবাসার সঙ্গে দায়িত্বও ভাগ করে নিতে হয়। তাই সম্পর্কের অদৃশ্য কাজগুলোকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলাই হতে পারে ভারসাম্য তৈরির প্রথম ধাপ।
মতামত দিন