Views Bangladesh Logo

যুদ্ধবিধ্বস্ত শৈশব পেরিয়ে কিংবদন্তি, শেষ হলো লুকা মদ্রিচের বিশ্বকাপ অধ্যায়

Sports Desk

ক্রীড়া ডেস্ক

ফুটবল কেবল ট্রফি, গোল কিংবা রেকর্ডের গল্প নয়। কখনো কখনো এটি একজন মানুষের জীবনসংগ্রাম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর একটি জাতির স্বপ্নের প্রতিচ্ছবিও হয়ে ওঠে। লুকা মদ্রিচ সেই বিরল ফুটবলারদের একজন, যার ক্যারিয়ারকে কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ৪০ বছর বয়সে নিজের পঞ্চম ও শেষ বিশ্বকাপে খেলে আন্তর্জাতিক ফুটবল ও বিশ্বকাপের সোনালী মঞ্চকে বিদায় জানিয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার এই সর্বকালের সেরা ফুটবলার।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে পর্তুগালের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে ক্রোয়েশিয়া। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপের মঞ্চেও শেষ হলো মদ্রিচের দীর্ঘ ও গৌরবময় পথচলা। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সমতাসূচক গোল এবং যোগ করা সময়ে গনসালো রামোসের জয়সূচক গোলে বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে যায় ক্রোয়েশিয়ার। শেষ মুহূর্তে বল জালে জড়িয়েও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হওয়ায় আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে মদ্রিচদের বিদায়।

এটাই ছিল বিশ্বকাপে মদ্রিচের শেষ নাচ। পাঁচটি বিশ্বকাপ, অগণিত স্মরণীয় মুহূর্ত, অসংখ্য নিখুঁত পাস আর এক ছোট্ট দেশকে বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিদের কাতারে দাঁড় করানোর অনন্য গল্পের এখানেই ইতি।

তবে মদ্রিচের গল্পের শুরু ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৮৫ সালে ক্রোয়েশিয়ার ছোট্ট গ্রাম মোদ্রিচিতে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলারের শৈশব কেটেছে যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে। ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পরিবার হারায় ঘরবাড়ি। শরণার্থী হিসেবে হোটেলে আশ্রয় নিতে হয়েছিল তাদের। সেই কঠিন সময়েই হোটেলের পার্কিং এলাকায় ফুটবল নিয়ে ছুটে বেড়াত ছোট্ট লুকা। যুদ্ধ তার শৈশব কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি।

সেই শিশুই পরে হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। ডিনামো জাগরেবে নিজেকে গড়ে তুলে টটেনহ্যাম হটস্পারের মাধ্যমে ইউরোপের বড় মঞ্চে পা রাখেন। এরপর রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়ে রচনা করেন ইতিহাস। স্প্যানিশ ক্লাবটির হয়ে ছয়টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ অসংখ্য শিরোপা জেতেন। ক্লাব ফুটবলে অর্জনের দিক থেকে তিনি ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে সফল ফুটবলারদের একজন।

তবে মদ্রিচকে অনন্য করেছে তার খেলার ধরন। তিনি ছিলেন না শুধুই একজন প্লেমেকার কিংবা বল বিতরণকারী। ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের সূচনা, প্রতিপক্ষের চাপ ভেঙে বেরিয়ে আসা এবং সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে নেতৃত্ব দেওয়া; সবকিছুতেই ছিল তার অসাধারণ দক্ষতা। গোল বা অ্যাসিস্টের সংখ্যার চেয়েও বড় ছিল মাঠে তার প্রভাব।

জাতীয় দলের জার্সিতেই সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার ক্যারিয়ার। ২০১৮ বিশ্বকাপে প্রায় একক নেতৃত্বে ক্রোয়েশিয়াকে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। যদিও ফ্রান্সের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়, তবুও পুরো আসরের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে জেতেন গোল্ডেন বল। একই বছর দীর্ঘদিনের মেসি-রোনালদো আধিপত্য ভেঙে নিজের হাতে তুলে নেন ব্যালন ডি'অর; যা তার অসাধারণ ফুটবল প্রতিভার বিশ্ব স্বীকৃতি।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও বয়সকে হার মানিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে সেমিফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। আর ২০২৬ সালে, ৪০ বছর বয়সেও দলের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা ছিলেন মদ্রিচ। অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব আর অনুপ্রেরণায় তিনি ছিলেন ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় ভরসা। কিন্তু পর্তুগালের বিপক্ষে নাটকীয় পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায় তার বিশ্বকাপ অধ্যায়।

মদ্রিচের উত্তরাধিকার কেবল ট্রফির নয়। তিনি প্রমাণ করেছেন, সীমিত জনসংখ্যার একটি দেশও সঠিক নেতৃত্ব, নিষ্ঠা ও বিশ্বাস নিয়ে বিশ্ব ফুটবলের শিখরে পৌঁছাতে পারে। মাঠের বাইরে বিনয়, শৃঙ্খলা ও ব্যক্তিত্বের জন্যও তিনি সমানভাবে সম্মানিত।

বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে লুকা মদ্রিচ বিদায় নিলেন, কিন্তু শেষ হলো না তার অনুপ্রেরণার গল্প। যুদ্ধবিধ্বস্ত এক শিশুর পৃথিবীর অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হয়ে ওঠার এই যাত্রা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সাহস, সংগ্রাম আর স্বপ্ন পূরণের এক চিরন্তন উদাহরণ হয়ে থাকবে। ফুটবল ইতিহাসে অনেক তারকা আসবেন, নতুন নতুন রেকর্ডও গড়া হবে। কিন্তু লুকা মদ্রিচের মতো একজন শিল্পী, নেতা এবং যোদ্ধার গল্প সময়ের সীমানা পেরিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ