‘চাউল কিনমু, নাকি মিটারে টেকা তুলমু’
‘কয়েকদিন ধরে কাজই নাই। ঘরে চাউল থাকে, থাকে না। হাতে টেকাও নাই। চাউলের দাম বাড়ছে, গ্যাসের দাম বাড়ছে। বিদ্যুতের বিল মেলা ট্যাকা আসে। মাসে যা কামাই করি, সংসার চলে না। কোনো কোনো দিন ইনক্যাম হয় যে, চাউল কিনমু নাকি মিটারে টেকা তুলমু? ধারদেনা করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছি।’
কথাগুলো বলেন বগুড়া মহানগরের ফুলতলা এলাকার বাসিন্দা সাজু হোসেন। পেশায় তিনি কাঠমিস্ত্রি। নিয়মিত কাজ পেলে মাসে তার আয় হয় প্রায় ১২ হাজার টাকা। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সাজুর সংসার।
সাজু হোসেন জানান, বর্তমানে বাজারের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। খাবারের তালিকা থেকে গরুর মাংস বাদই বলা চলে। ইলিশ মাছের স্বাদ তো ভুলেই গেছেন। সবকিছুর খরচই বেড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় বাড়িঘর বিক্রি করে কোনো এক গ্রামে গিয়ে থাকতে হবে।
এটা শুধু সাজুর গল্প নয়। শহর থেকে গ্রামের নিম্নআয়ের মানুষের সংসারে বর্তমানে একই হিসাব। আয় কম, দিনমজুরের কাজও অনিয়মিত। অথচ খাবার, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যাতায়াতসহ প্রায় প্রতিটি খাতেই বেড়েছে খরচ। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের সংসারে সঞ্চয়ের সুযোগ তো নেই-ই, উল্টো নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে ধার করতে হয়।
বগুড়া মহানগরের বনানী এলাকার নাপিত নির্মল শীল বলেন, ‘প্রায় পাঁচ মাস ধরে আগের মতো কাজ নাই। আগে দিনে ৩০ থেকে ৪০ জনের চুল-দাঁড়ি কাটতাম। এখন অনেকের চুল বড় হয়ে গেলেও সহজে কাটাতে আসেন না। অথচ আগে তারা মাঝেমধ্যেই চুল-দাঁড়ি কাটাতেন। এসব দেখেই বোঝা যায়, মানুষের হাতে টাকা-পয়সা কমে গেছে।’
বগুড়া মহানগরের কয়েকজন চা-দোকানির সঙ্গে কথা হয়।
তারা জানান, চায়ের দাম বাড়াতে পারছেন না। প্রতি কাপ লাল চা ৫ টাকা এবং দুধ চা ১০ টাকা দামেই বিক্রি করছেন। অথচ গ্যাস, খড়ি ও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। চা বিক্রির আয় দিয়েই তাদের চাল-ডালসহ সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে হয়। কিন্তু চায়ের দাম বাড়ানোর কথা বললেই ক্রেতারা ক্ষুব্ধ হন।
তারা আরও জানান, মানুষের আর্থিক সংকট এখন এতটাই প্রকট যে, সামান্য দাম বাড়লেও ক্রেতারা তা সহজে মেনে নিতে চান না। তবে অনেক দোকানিই চায়ের দাম বাড়িয়েছেন। সেগুলোতে ক্রেতাও আগের তুলনায় কমেছে।
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা রঞ্জু হোসেন জানান, এলপি গ্যাসের দাম ব্যবসায়ীরা বাড়িয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে বিভিন্ন দোকানে ১২ কেজির একটি গ্যাস সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সংসার চালানোর খরচ মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘সবকিছুর দামই বেড়েই চলেছে। কীভাবে চলব, কিছুই বুঝতে পারছি না। এক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। বেতন দিয়ে সংসার চলে না, চাকরি ছাড়লেও সহজে কাজ পাওয়া যাবে না।’
বগুড়া মহানগরের ফুলতলা এলাকার বাসিন্দা দিনমজুর বাবু মিয়া জানান, জীবনযাপনের খরচ আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে না এলে নিম্নআয়ের মানুষকে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হবে।
মতামত দিন