একদিনের ছুটি, একটা রিকশা, আর তুমি
কখনো কখনো প্রেমের জন্য পাহাড় ডিঙানো, সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার দরকার হয় না। একটা সকাল, একটা রিকশা, আর পাশে প্রিয় মানুষটা থাকলেই যথেষ্ট। ঢাকা শহরের কোলাহলের ঠিক বাইরেই লুকিয়ে আছে এমন কিছু জায়গা, যেখানে একদিনের ছুটিতেই মন ভরে যায়। আসুন, সেই রকম একটা দিনের গল্প বলি।
সকাল: রিকশায় চড়েই শুরু হোক ঘোরাঘুরি
গাড়ি নয়, রিকশাই হোক আজকের বাহন। শহরের ভেতরে ঘুরতে গাড়ির চেয়ে রিকশা অনেক বেশি রোমান্টিক— গতি কম, তাই চারপাশ দেখার সময়ও বেশি। ছুটির দিনের সকালে হাতিরঝিলের কোনো এক মোড় থেকে একটা রিকশা ঠিক করে নিন, আর মামাকে বলুন, ‘একটু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যাবেন, তাড়া নেই।’ এই একটা লাইনেই বদলে যায় পুরো দিনের মেজাজ।
রিকশার হুড তুলে দুজনে গা ঘেঁষে বসা, রোদ এড়াতে একে অপরের কাঁধে মাথা রাখা, প্যাডেলের ছন্দে শহর পেছনে সরে যাওয়া— এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আসল রোমান্স। রিকশার টুংটাং ঘণ্টি, মামার সঙ্গে টুকটাক গল্প, রাস্তার পাশের ফুলওয়ালা মেয়েটার থেকে একগোছা বেলিফুল কিনে প্রিয় মানুষটার হাতে বা খোঁপায় গুঁজে দেওয়া— শহরের রিকশা-ভ্রমণে এসব মিলিয়েই তৈরি হয় একটা আলাদা মুড। রমনা পার্কের ধার দিয়ে, নীলক্ষেতের গলি পেরিয়ে, চাইলে পুরান ঢাকার সরু রাস্তা দিয়েও চালিয়ে নিতে পারেন— প্রতিটা মোড়েই নতুন কিছু চোখে পড়বে।
মাঝপথে কোথাও রিকশা থামিয়ে ফুটপাতের ঝালমুড়িওয়ালার কাছে দুই ঠোঙা ঝালমুড়ি নিয়ে আবার রিকশায় ওঠা— এটাই আসলে ছুটির দিনের আসল স্বাদ। তাড়াহুড়ো নেই, গন্তব্য বাঁধা নেই, শুধু পথটাই উপভোগ করার একটা দিন।
দুপুর: সদরঘাট থেকে বুড়িগঙ্গার বুকে
রিকশা থেকে নেমে এবার নৌকায়। সদরঘাট থেকে একটা ছোট নৌকা ভাড়া করে বুড়িগঙ্গার বুকে ভেসে পড়া— এ যেন সময়টাকে থামিয়ে দেওয়ার এক জাদু। নদীর ঢেউয়ে দুলতে দুলতে দুপাশের পুরনো ঢাকার ইট-কাঠের গল্প দেখা, নৌকার মাঝির সঙ্গে টুকটাক কথা, মাঝনদীতে বসে মুড়ি-বাদাম খাওয়া। যাঁরা শহর ছেড়ে একটু দূরে যেতে চান, তাঁরা যেতে পারেন সোনারগাঁওয়ের দিকে। পানাম নগরীর ভাঙাচোরা রাজবাড়িগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা, পুরনো ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হাত ধরে হাঁটা— এই অনুভূতি অন্যরকম।
বিকেল: পূর্বাচলের সবুজ নির্জনতা
শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা পেরিয়ে পূর্বাচলের দিকে গেলে চোখে পড়ে জিনঞ্জিরা পার্কের মতো এক টুকরো সবুজ, যেখানে ধানখেত, ছোট ছোট জলাশয় আর গ্রামীণ নিস্তব্ধতা মিলেমিশে আছে। বিকেলের নরম আলোয় এখানে বসে গল্প করা, হাত ধরে হাঁটা— মনে হয় যেন ঢাকা থেকে অনেক দূরে কোথাও চলে এসেছেন।
যাঁরা লেকের ধারে শান্ত সময় কাটাতে চান, তাঁদের জন্য আছে গুলশান সোসাইটি লেক পার্ক কিংবা রমনা পার্ক। শতবর্ষী গাছের ছায়ায়, লেকের পাড়ে বসে দুজনে চুপচাপ সময় কাটানো— কখনো কখনো কথার চেয়ে নীরবতাই বেশি কিছু বলে দেয়।
সন্ধ্যা: বুড়িগঙ্গার পাড়ে ঢাকা উদ্যানে সূর্যাস্ত
দিনের শেষটা রাঙিয়ে দিতে চলে যেতে পারেন ঢাকা উদ্যানে। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জায়গার ওয়াকওয়ে ধরে হাঁটতে হাঁটতে নদীর দিগন্তে সূর্য ডোবা দেখার মতো নির্মল দৃশ্য শহরের আর কোথাও পাওয়া মুশকিল। খোলা আকাশ আর নদীর বাধাহীন দিগন্তের কারণে এখানকার সূর্যাস্ত সত্যিই অন্যরকম সুন্দর। ওয়াকওয়ে ধরে হাত ধরে হাঁটা, নদীর হাওয়ায় চুল উড়তে দেওয়া, আকাশ লাল-কমলা হয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে পাশের কোনো দোকান থেকে চা নিয়ে বসে পড়া— এই মুহূর্তটার জন্যই আসলে পুরো দিনটা সাজানো।
শেষ কথা, রোমান্টিক ভ্রমণের জন্য বিশাল বাজেট বা দূরের কোনো গন্তব্য লাগে না। একটা রিকশা, একটু সময়, আর মন খুলে উপভোগ করার ইচ্ছে থাকলেই ঢাকার আশপাশে তৈরি হতে পারে এক জীবনের মতো মনে রাখার স্মৃতি। আজকের দিনটা হোক এমনই এক গল্প— যেখানে গন্তব্যের চেয়ে যাত্রাটাই বেশি সুন্দর।
মতামত দিন