বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে ট্রাকের দীর্ঘ সারি, বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গে বাড়ছে ভোগান্তি
পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারি। একটির পেছনে আরেকটি ট্রাক। কোনো চালক একদিন ধরে, কেউবা দুই দিন ধরে অপেক্ষায় আছেন বন্দরের প্রবেশপথে। কারও ট্রাকে পোশাক কারখানার ঝুট, কারও গাড়িতে ভূষি, আবার কোনো ট্রাকে রয়েছে ফাইবার গ্লাসসহ নানা পণ্য। তাদের গন্তব্য নেপাল, ভারত অথবা ভুটান। তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে সীমান্তে পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
সোমবার (১৭ আগস্ট) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশ অংশের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ট্রাকগুলোকে ভারতীয় সীমান্তে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় পরপর সীমান্তের ওপারে ট্রাক ঢুকছে। সেখানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) চালান ও গাড়ির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদন দিচ্ছে।
ট্রাক চালকরা জানান, গত দুই বছরের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে এই রুটে পণ্য পরিবহন বেড়েছে। প্রতিদিন বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৬০টি পণ্যবাহী ট্রাক ভারত, নেপাল ও ভুটানের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে। তবে রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ অনেক বেশি। বিশেষ করে ভারত ও ভুটান থেকে বিপুল পরিমাণ পাথর আসছে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ ও ভারতের ট্রাক চালকরা জানান, প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২৫০টি পাথরবাহী ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর মধ্যে ভুটান থেকে আসা পাথর বোঝাই ট্রাকের সংখ্যা বেশি।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ভারতে বেশি যাচ্ছে পোশাক কারখানার ঝুট। ভারতের বিভিন্ন কারখানায় এসব ঝুট প্রক্রিয়াজাত করে তুলা ও সুতা বের করা হয়। একই সঙ্গে এসব ঝুট থেকে কম্বলসহ বিভিন্ন পণ্যও তৈরি করা হয়।
বাংলাদেশে ভুটান থেকে পাথর পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে আটকা পড়েন কয়েকজন ভারতীয় ট্রাকচালক।
তারা জানান, ভুটান থেকে পাথর নিয়ে তারা বাংলাদেশে আসেন। পণ্য খালাসের পর খালি ট্রাক নিয়ে ফেরার কথা থাকলেও এখনও সীমান্ত পার হতে পারছেন না। তাদের মধ্যে কেউ একদিন, কেউ দুদিন ধরে সীমান্তে আটকে আছেন।
তারা আরও জানান, কী কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে তারা পরিষ্কারভাবে কিছু জানেন না। তবে এর ফলে সময় নষ্ট হচ্ছে। সেইসাথে বাড়ছে দুর্ভোগ।
সুরুজ্জামান সুরুজ নামের এক ট্রাকচালক বাংলাদেশ থেকে ভূষি নিয়ে যাচ্ছেন নেপালে। তিনি জানান, নেপালে ব্যাপক ভূষির চাহিদা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ থেকে নেপালে পাটও ভালো বিক্রি হয়।তবে সীমান্তে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলেও জানান তিনি।
নেপালি বংশোদ্ভূত ভারতীয় ট্রাকচালক রাজু কার্জি জানান, ট্রাক খুব ধীরগতিতে পার করা হচ্ছে। এক-দুই দিন সীমান্তে আটকে থাকলে চালকদের বাড়তি খরচ হয়। অনেক চালক খাবার ও থাকার সমস্যায় পড়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ না খেয়েও সময় কাটাচ্ছেন। তিনি নিজেও দুদিন হলো আটকে আছেন।
তিনি জানান, বলা যায় ব্যবসায় কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু এভাবে দীর্ঘ সময় গাড়ি আটকে থাকলে তাদের খরচও বাড়ে। এতে তারা আর্থিক সমস্যায় পড়েন।
চালকরা জানান, কয়েক মাস হলো এই স্থলবন্দর দিয়ে আগের তুলনায় ট্রাক চলাচল বেড়েছে। কিন্তু সীমান্ত পারাপারের গতি থমকে যাচ্ছে। ফলে তাদের ভোগান্তি বাড়ছে।
ভারতীয় ট্রাক চালক জীবন প্রধান জানান, এই স্থলবন্দরের মাধ্যমে শুধু যে ব্যবসায়ীরাই লাভবান হচ্ছেন তা কিন্তু নয়। ট্রাকচালক ও শ্রমিকদের আয়ের উৎস এই বন্দর। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের বাণিজ্য ভালো হলে তাদের সঙ্গে শ্রমিকের আয়ও বাড়ে।
বাংলাবান্ধা বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরকে ঘিরে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে এক সূতায় গেঁথে গেছে। এতে ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কাগজপত্র যাচাই, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অনুমোদন এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা দ্রুত সম্পন্ন করে ট্রাক পারাপারের গতি বাড়াতে হবে। তাহলে তাদের সমস্যা দূর হবে।
মুন্জু ইসলাম নামের এক ট্রাক চালক জানান, তিনি বাংলাদেশ থেকে ভূষি নিয়ে যাচ্ছেন নেপালে। বছর দুয়েক আগে বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে দিনে ২০-২৫ টি ট্রাক পার হত। তবে বর্তমানে ব্যবসা বেড়েছে এখন দিনে ৪০-৬০টি ট্রাক প্রতিদিন ভারত সীমান্ত পার হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ভারত ও নেপাল থেকে বেশি গাড়ি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেগুলোর অধিকাংশেই পাথর ও ঝাঁড়ু আসে। তবে বর্তমানে প্রবেশপথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বরত কোনো কর্মকার্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ট্রাক পারাপারে কেন দীর্ঘ সময় লাগছে-এ বিষয়ে স্থানীয় অধীনস্থ কর্তৃপক্ষ (বাংলাবান্ধা কর্তপক্ষ) ভালো বলতে পারবেন।
মতামত দিন