Views Bangladesh Logo

পর্যটন সীমিতকরণে থমকে সেন্টমার্টিন দ্বীপবাসীর জীবন-জীবিকা, একবেলা খেয়ে মানবেতর জীবনযাপন

Esmat Ara Issu

ইসমত আরা ইসু

সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত সীমিতকরণের পাশাপাশি স্থানীয়দের জন্য সাগরে মাছ ধরাসহ নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এতে পর্যটননির্ভর দ্বীপবাসীর জীবন-জীবিকা পড়েছে গভীর সংকটে।

বঙ্গোপসাগরের বুক চিড়ে জেগে ওঠা দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগে সারা বছরই ছুটে যান দেশি-বিদেশি পর্যটক ও দর্শনার্থীরা। দুই বছর আগেও পর্যটন মৌসুমে হাজারো পর্যটকের আনাগোনায় মুখর থাকতো দ্বীপটি। অন্য সময়ও আসতেন উল্লেখযোগ্য পর্যটকরা। ফলে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দ্বীপের মানুষের জীবন-জীবিকা অনেকটা পর্যটনে নির্ভরশীল।

কিন্তু পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দাবি, বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আনাগোনার পাশাপাশি প্লাস্টিকসহ নানা বর্জ্যে হুমকির মুখে পড়ে গেছে দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। এজন্য গত বছর একদফায় এবং গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ মাসের জন্য দ্বিতীয় দফায় সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াতে সীমিতকরণের পাশাপাশি স্থানীয়দের জন্য নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা মতে, ১ অক্টোবর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত পর্যটন মৌসুমে দিনে দ্বীপে দুই হাজারের বেশি পর্যটক যাতায়াত করতে পারবেন না। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে রাতযাপনেও দেয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। শুধুমাত্র জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে রাতযাপনের অনুমতি থাকলেও বছরের অন্য সময় পর্যটকের পাশাপাশি বহিরাগতদেরও যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

সাড়ে দশ হাজারেরও বেশি মানুষের বসবাস দ্বীপটিতে। আগে দ্বীপবাসীর মূল জীবিকা ছিল সাগরে মাছ ধরা এবং কৃষিকাজ; কিন্তু পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় দুই দশক ধরে তারা মূলত পর্যটন নির্ভরশীল। আদি পেশার পাশাপাশি পর্যটন মৌসুমের ছয় মাসের উপার্জন দিয়েই ভালোভাবেই নির্বাহ হয়ে আসছিল দ্বীপবাসীর জীবন-জীবিকা; কিন্তু পর্যটক যাতায়াত সীমিতকরণ এবং নানা বিধিনিষেধে বন্ধ রয়েছে হোটেল, কটেজ, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁসহ পর্যটননির্ভর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে জীবন-জীবিকা নিয়ে চরম বিপাকে প্রবালদ্বীপটির বাসিন্দারা।

সেন্টমার্টিন পূর্বপাড়ার নূর বানু বলেন, ‘সংসারে আয়ের মানুষ দুজন। স্বামী শুঁটকির দোকানে কাজ করতেন আর ছেলে পর্যটকদের লাগেজ টানাসহ সৈকতে ঝিনুকের মালা বিক্রি করত; কিন্তু এ বছর ভরা মৌসুমেও পর্যটক না আসায় দুই বেলার ভাত জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছি। এখন এক বেলা খাই, তেল আর মসলার খাবারও ছেড়েছি অনেক দিন হলো।’

একই পাড়ার জানে আলম বলেন, ‘সৈকতে ডাব বিক্রি করে সংসার চলে যেত কোনো রকমে। পর্যটন মৌসুমে যা জমাতাম তাই দিয়ে আর সাগরে মাছ ধরেই বছরের খোরাক জোগাতাম; কিন্তু এখন মাছ ধরতে যাওয়াও নিষেধ। সরকার থেকে কিছু চাল ত্রাণ হিসেবে পেয়ে কয়েক দিনের ভাত জোগাড় হলেও সংসারের অন্য খরচ চালানো যেন পাহাড় টানার সমান হয়ে গেছে।’

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, জলে ও স্থলে আয়ের উৎস বন্ধ থাকায় দ্বীপের শুধু সাধারণ মানুষই নন, ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত। বিধিনিষেধ আরোপের আগে পর্যটনের মৌসুমসহ সারা বছরই পর্যটকদের যাতায়াত ছিল। এখন হোটেল, কটেজ, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ। সাগরে মাছ ধরায় ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞায় দ্বীপের ৮০ শতাংশ মানুষই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

যদি পর্যটক আসতে না-ই দেয়া হয় সেক্ষেত্রে পেশার পুনর্বাসন এবং প্রতি মাসে ত্রাণ সহযোগিতার দাবি জানান সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য খোরশেদ আলম।

তিনি বলেন, ‘দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের কথা বলে পর্যটকদের আসা বন্ধ করে দিয়েছে সরকার; কিন্তু দ্বীপের মানুষের কথা একবারও ভাবলো না। গত ২০ থেকে ২২ বছরে দ্বীপের মানুষের পেশা বদলেছে। তারা আগে মাছ ধরার পাশাপাশি কৃষিকাজে জীবন নির্বাহ করতেন; কিন্তু এখন প্রায় ৯০ শতাংশ দ্বীপবাসীই পর্যটন ব্যবসা ও অন্য কাজে জড়িত। পর্যটকদের আসা বন্ধে এসব মানুষ এখন অনেকটা উপোস দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।’

এই জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘পর্যটকদের আসা বন্ধ করে দিয়ে দ্বীপের আর কোনো খবর রাখেনি সরকার। মানুষগুলো কীভাবে বাঁচবেন, তারও কোনো খবরই নিল না কেউ।’

তার দাবি, সারা বছর নির্দিষ্টসংখ্যক পর্যটকদের সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আসতে দেয়ার ব্যবস্থা করা। সেটি না করা হলে দ্বীপের মানুষকে পুনর্বাসন সরকারের কর্তব্য বলেও মন্তব্য করেন খোরশেদ আলম।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নানা সরকারি নানা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে জানান কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন।

তিনি বলেন, দ্বীপবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে পরিবেশ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থা বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। দ্বীপবাসীকে সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনে নানা কর্মতৎপরতাও চালানো হচ্ছে।

সেভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমরা পরিবেশকর্মীরা কখনোই চাইনি সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকের যাতায়াত একেবারে বন্ধ করে দিক সরকার। আমরা চেয়েছিলাম যাতায়াত সীমিত করা। সারা বছর দ্বীপের মানুষ কীভাবে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করবে তা সরকারের ভাবা উচিত ছিল।’

‘পরিবেশের দোহাই দিয়ে সরকার দ্বীপে শুধু পর্যটকদের যাওয়া বন্ধ করে দেয়া ছাড়া আর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সেখানকার ভারী স্থাপনা সরানো এবং পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণেও কোনো কিছুই করা হয়নি। এই কয়েক মাসে অন্যরাও তেমন কিছু করেছে বলে আমাদের জানা নেই।’

‘দ্বীপে পর্যটকদের যাওয়া সীমিত করে এবং ইট-পাথরের স্থাপনা সরিয়ে ইকোট্যুরিজম নিশ্চিত করাটাই উচিত ছিল সরকারের’- বলেন মোয়াজ্জেম হোসেন।

দ্রুততার সঙ্গে দ্বীপবাসীর জীবন-জীবিকায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনে ব্যর্থ হলে মানুষ একটা পরিস্থিতিতে দ্বীপ ছেড়ে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হবে বলেও মনে করেন তিনি।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ