চলুন সবাই বরগুনা যাই
হাজারো ঘটনার ভিড়ে শিশু আইলান কুর্দিকেও হয়তো আমরা ভুলে গেছি। ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ইউরোপে পাড়ি জমানোর সময় ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবে শিশুটি মারা যায়। তুরস্কে সাগরের তীরে বালুতে মুখ গুঁজে পড়েছিল তার লাশটি। ছবিটি বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় প্রায় সব পত্রপত্রিকা ছেপেছিল। এই ছবিটি সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশ্ব নেতারা তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন, ভালোবাসা দেখিয়েছিলেন। ৩ বছর বয়সী আইলান কুর্দির সঙ্গে তার তার বড় ভাই ৫ বছরের গালিব কুর্দি এবং তাদের মা রেহানা মারা যান ওই দুর্ঘটনায়।
শিশু দুটির বাবা আব্দুল্লাহ কুর্দি সিরিয়ার বাসিন্দা। সেখানে ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে সপরিবারে তিনি আশ্রয় নেন পাশের দেশ তুরস্কে। সেখান থেকেই নৌকায় করে গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তারা। তাদের লক্ষ্য ছিল কানাডা; সেখানে আব্দুল্লাহর বোন টিমা কেশবিন্যাসের কাজ করেন। শোকে বিহ্বল আব্দুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আমার সন্তানরা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শিশু। ওরা প্রতিদিন আমার ঘুম ভাঙাত। খেলা করত আমার সঙ্গে। এর চেয়ে সুন্দর মুহূর্ত আর কী হতে পারে? এ সবকিছুই হারিয়ে গেছে।’ এমন আর্তনাদ সন্তানহারা সব বাবার।
বিপজ্জনক উপায়ে ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে ডুবে ওই বছর আড়াই হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। তবে আয়লানের ছবিটি মর্মস্পর্শ করেছে বিশ্ববাসীকে। রাজনীতিক ও জনসাধারণের মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়। তখনকার ফরাসি প্রধানমন্ত্রী মানুয়েল ভালস টুইটারে লেখেন, ‘ইউরোপকে সংহত করতে আমাদের জরুরি ভিত্তিতে তৎপর হতে হবে।’
ফ্রান্স ও জার্মানি দ্বিধাদ্বন্দ্ব বাদ দিয়ে একমত হয় যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) উচিত- নির্ধারিত সংখ্যা (কোটা) অনুযায়ী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জায়গা দিতে সদস্যদেশগুলোকে বাধ্য করা। শরণার্থী ও অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকার তখনকার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও আয়লানের ছবিটি দেখে ‘গভীরভাবে প্রভাবিত’ হন। তিনি ঘোষণা দেন, তার দেশ কয়েক হাজার সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দেবে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) দুই দিনে সারা বিশ্ব থেকে ১ লাখ ডলার সহায়তা পায়। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি সিরিয়া ও ইরাকের শরণার্থীদের জন্য জরুরি তহবিল সংগ্রহ শুরু করার পর অভাবনীয় সাড়া পেয়েছে। আর সব ঘটেছিল আইলানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে।
প্রিয় পাঠক, ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ‘শাক তুলতে বেহুলার গীত গাওয়া’র জন্য। কেন এই প্রসঙ্গে এত কথা বললাম, তা খোলাসা করছি। আইলানের ছবি যেমন সারা বিশ্বকে ঝাঁকুনি দিয়েছিল, তেমনি মাগুরার আছিয়া সারা দেশকে ঝাঁকুনি দিয়েছে। ধর্ষণের শিকার আট বছরের শিশুটির পাশে দাঁড়িয়েছে সারা দেশের মানুষ। তার জন্য যে কত মানুষ প্রার্থনা করেছেন- সেই সংখ্যা হয়তো কখনো জানা যাবে না। ধর্ষকের প্রতি ঘৃণা আর বিচার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল অগণিত মানুষ। রাষ্ট্রযন্ত্রও সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে তার চিকিৎসার জন্য। অবশেষে সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ১৪ মার্চ না ফেরার দেশে পাড়ি জমায় আছিয়া। এই মামলায় আইনি লড়াইয়ে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর আগে থেকেই তিনি পরিবারটির পাশে ছিলেন।
আর শিশুটির পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এই দুই রাজনীতিকের ভূমিকা ভালো এবং প্রশংসার দাবিদার। আছিয়া মরে গেছে, আমরা তার জন্য বিলাপ করছি। কিন্তু ধর্ষণের শিকার হয়ে গ্লানি নিয়ে বেঁচে আছে যারা, তাদের খবর আমরা রাখছি কী? তারা প্রতিনিয়ত অপদস্থ হচ্ছে। হয়রানি হচ্ছে। বিচার পেতে গিয়ে পড়ছে বিড়ম্বনায়। মামলা তুলে নিতে অনেককে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, মেয়েকে ধর্ষণ-অপহরণের মামলা করে খুন হয়েছেন এক বাবা। ঘটনাটি ধীরে ধীরে চাপা পড়ছে। এবার সময় হয়েছে বরগুনায় যাওয়ার। চলুন, আমরা সবাই বরগুনায় যাই। এখন প্রশ্ন করতে পারেন- কেন বরগুনা যাব? সেখানে এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর কয়েক দিন পর খুন হয়েছে তার বাবা। এখন নিরুপায় হয়ে পড়েছে পরিবারটি। তার মা চাইছে পুরো পরিবারের মৃত্যু। আহ্! কী নির্মম পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে পরিবারটি যাচ্ছে, তা হয়তো আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। কিন্তু তাদের পাশে কেউ দাঁড়াচ্ছে না।
সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, স্কুলে যাওয়ার পথে এক কিশোরীকে অপহরণ ও ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় ৫ মার্চ বরগুনা সদর থানায় বাদী হয়ে মামলা করেন তার বাবা। পরে ওই দিন অভিযুক্ত একমাত্র আসামি সৃজীব চন্দ্র রায়কে গ্রেপ্তার করা হয়। ১১ মার্চ রাতে বরগুনা পৌরসভার কালীবাড়ি এলাকার নিজ বসতবাড়ির পেছনের ঝোপ থেকে স্কুলছাত্রীর বাবার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন নিহতের স্ত্রী অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের নামে মামলা করেছেন। হত্যা মামলার পর সৃজীবের বাবা শ্রীরাম রায়, সৃজীবের সহযোগী কালু ও রফিকুল ইসলামকে আটক করা হয়। তবে কাউকে হত্যা মামলায় আসামি করা হয়নি। এলাকাবাসী ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তিসহ নিহতের পরিবারের নিরাপত্তা দাবি করেছেন। নিহতের বোন বলেন, আসামি সৃজীব আগে থেকে অপকর্মে জড়িত। ৪ মার্চ সন্ধ্যায় পর থেকে ভাতিজি নিখোঁজ হয়।
নিখোঁজের পর প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় খুঁজলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ৫ মার্চ সকালে বাড়ির পাশের ডিসিপার্ক সংলগ্ন জায়গা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর জিজ্ঞাসা করলে কিশোরী জানায়, সৃজীব তাকে মুখ চেপে ধরে অপহরণ করে নিয়ে নির্যাতন চালায়। এই অপহরণ-ধর্ষণ মামলার ধার্য তারিখ ছিল ১২ মার্চ। ১১ মার্চ প্রতিদিনের মতো সকালে দোকানে যায় আমার ভাই। সন্ধ্যায় তার স্ত্রী আমাকে ফোন দিয়ে বাড়িতে আসতে বলে। সৃজীবের পরিবার আপস-মীমাংসা করতে চায়। আমি ভাইকে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানাই। সৃজীবের বাবা হুমকি দিয়ে বলে আপস-মীমাংসা না হলে আমাদের সবাইকে দেখে নেবে। ওইদিন রাত ১টার দিকে ভাবি আমাকে ফোন দিয়ে বলেন- তোমার ভাই এখনো বাড়ি ফেরেননি। আমি ওদের বাড়িতে যাই। তার বড় মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ির পেছনে গিয়ে মরদেহ দেখতে পাই। মেয়ের অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনায় সম্পৃক্তদের ছাড়া তার কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল না।
নিহতের স্ত্রী বলছেন, আমার মেয়ে ধর্ষণ ও অপহরণ মামলা করার পরে যেদিন মামলার ধার্য তারিখ ছিল, তার আগের দিন রাতে আমার স্বামীকে হত্যা করে বাড়ির পেছনে ফেলে রেখে যায়। আমার সন্দেহ এ কাজ ওরা (ধর্ষকের স্বজন-সহযোগী) করতে পারে। বর্তমানে আমি সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে আছি। সামনে আমি কী করব বা আমার সংসার কীভাবে চলবে আমি জানি না। বরগুনা সদর থানার ওসি দেওয়ান জগলুল হাসান বলেন, মামলাটির তদন্ত চলমান। এখন পর্যন্ত কোনো আসামি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। সন্দেহজনক চারজনের মধ্যে তিনজনকে ধর্ষণ ও অপহরণ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় একজনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
নারী নিপীড়ন-ধর্ষণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। তাহলে এ নিয়ে এত হৈচৈ হচ্ছে কেন? কারণ হঠাৎ করেই এটা মহামারির রূপ নিয়েছে। অভিযুক্তের তালিকায় খোদ বাবাও রয়েছেন। নিজ কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগে সম্প্রতি রাজধানীর রামপুরায় এক রিকশাচালককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া নিকটাত্মীয়, শিক্ষকরাও অভিযুক্ত হচ্ছেন। সব মিলিয়ে নারী-শিশুরা যে কোথাও নিরাপদ না, তা উঠে আসছে বারবার।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, গত জানুয়ারি মাসে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৯ জন নারী। একক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২১টি এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮ জন। ফেব্রুয়ারি মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৭টি, এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১৭টি, ধর্ষণের পর হত্যা দুটি। পাঁচজন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে ধর্ষণের শিকার ৫৭ জনের মধ্যে ১৬ জন শিশু, ১৭ জন কিশোরী রয়েছেন। অন্যদিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তিনজন কিশোরী ও ১৪ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন দুই নারী। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা ১৯টি, যৌন হয়রানি ২৬টি, শারীরিক নির্যাতনের ৩৬টি ঘটনা ঘটেছে এই মাসে।
নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। সবাই এসব ঘটনার বিচার পাচ্ছেন। এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্ত শেষ করতে হবে। কোনোভাবেই ৭ থেকে ১০ দিনের বেশি সময় নেওয়া যাবে না। পজিটিভ মনোভাব দেখাতে হবে আইনজীবীদেরও। সময়ের আবেদন করে এসব মামলায় কালক্ষেপণ করা উচিত হবে না। যত দ্রুত সম্ভব বিচার কাজ শেষ করতে হবে। বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সচেতন হতে হবে সবাইকে। কারও প্রলোভনে পড়া যাবে না। বাচ্চার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে অভিভাবকদের। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে ধর্ষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেই সবাইকে এক হয়ে লড়তে হবে। যেমনটা আমরা লড়েছি আছিয়ার ক্ষেত্রে।
লেখক: সাংবাদিক
মতামত দিন