শ্রম বিক্রি করতে এসেছিলেন তাঁরা, ফিরছেন নিথর দেহে
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। ফজরের নামাজ শেষে কারও কাঁধে গামছা, কারও হাতে ছোট একটি ব্যাগ—হেঁটে আসছিলেন বগুড়ার এরুলিয়ার শ্রমের হাটে। প্রতিদিনের মতোই দাঁড়িয়েছিলেন এই আশায় যে আজ কেউ ডাকবে, দিন শেষে ৭০০ টাকা হাতে নিয়ে বাজার করবেন, তারপর ফিরবেন বাড়ি।
সেই অপেক্ষা শেষ হলো একটি বাসের চাকার নিচে।
আজ শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের এরুলিয়ার সিল্কিবান্ধা এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস ঢুকে পড়ে শ্রমিকদের ওই জটলার ভেতর। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনজন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আরও চারজনের। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতজনে, যাঁদের অধিকাংশই কৃষিশ্রমিক।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে নওগাঁগামী শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের বাসটি একটি মোটরসাইকেলকে সাইড দিতে গিয়ে হঠাৎ ব্রেক করে। এতে বাসটি সড়কের পাশের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ধাক্কা দেয় এবং চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। বাসটি গিয়ে ঢোকে শ্রমিকদের হাটে। বাসের কোনো যাত্রী আহত হননি।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় ২১ জনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে চারজন মারা যান। বর্তমানে ১৭ জন চিকিৎসাধীন, যাঁদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
এই হাট আশপাশের অনেক জেলার দরিদ্র মানুষের জীবিকার ভরসা। রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলের নানা এলাকা থেকে কৃষিশ্রমিকেরা এখানে আসেন। অনেকে আগের দিন সন্ধ্যায় এসে ওঠেন স্থানীয় সস্তা আবাসিক হোটেলে—এক কক্ষে গাদাগাদি করে রাত কাটে, মাথাপিছু ভাড়া ২০ টাকা। ভোরে উঠে দাঁড়ান হাটে। কৃষক বা ঠিকাদার এসে দিনের জন্য শ্রমিক বেছে নেন। দিন শেষে মজুরি ৭০০ টাকা। কেউ সপ্তাহখানেক কাজ করে চাল-ডাল কিনে বাড়ি ফেরেন, কেউ স্ত্রী-সন্তানের জন্য জামাকাপড়।
আজ সেই হাটে পড়ে ছিল আহত ও নিহত মানুষের দেহ। কেউ স্বজনের নাম ধরে ডাকছিলেন, কেউ ব্যথায় ছটফট করছিলেন, কেউ আর কোনো সাড়াই দিচ্ছিলেন না।
নিহতদের একজন বগুড়ার কাহালু উপজেলার নরহট্ট সর্দারপাড়া গ্রামের কৃষক নূর মোহাম্মদ। শ্রমিকের সন্ধানে ফজরের নামাজ পড়ে বেরিয়েছিলেন তিনি। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কান্দিয়া এনায়েতপুর গ্রাম থেকে বাবা-ছেলে এসেছিলেন একসঙ্গে। বাবা আমিরুল হোসেন মারা গেছেন; গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাঁর ছেলে হুরায়রা। একই গ্রাম থেকে কাজের খোঁজে আসা শাহিদও ফিরছেন না।
জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল ওয়াজেদ বলেন, ‘আমাদের তথ্যমতে এখন পর্যন্ত সাতজন মারা গেছেন।’ নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
যাঁরা প্রতিদিন অন্যের জমিতে ফসল ফলান, দিনের শুরুতে বেরিয়েছিলেন পরিবারের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়ার আশায়—তাঁদের সাতজন আজ ফিরছেন কাফনে জড়ানো নিথর দেহে।
মতামত দিন