এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী বাড়তি সুবিধা: বাংলাদেশের ভবিষ্যতের পথ
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সাধারণ পরিষদের সভায় সদস্যদের গৃহীত সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে নতুন হাওয়া বইছে। টেকসই উন্নয়নে এসব দেশে বিশেষ সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে উপ-বিধান সংযুক্তির পথ অবারিত রয়েছে।
'লিস্ট-ডেভেলপড কান্ট্রিজ (এলডিসিএস)'-এর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিরাজমান। কাজেই বাজারে প্রবেশ এবং নানামুখী বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিতকরণে দেশটিকে গুটিকয়েক দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় চুক্তিতে জড়িয়ে এ সিদ্ধান্তের বাড়তি সুবিধা ভোগ করতে হবে।
বেশিরভাগ স্বল্পোন্নত দেশকে বৈদেশিক আয়ের জন্য কৃষি, বনায়ন, মৎস্য, পর্যটন কিংবা সীমান্তে সেবাভিত্তিক বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে কম্বোডিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশও একটি দেশ, যারা রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। পাশাপাশি এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) তালিকার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশই ওষুধ রপ্তানিতে সম্ভাবনাময়।
তবে এ সম্ভাবনার দ্বার যখন উন্মোচিত হলো, তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক এবং নানাবিধ দ্বিপক্ষীয় পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এলডিসি পরিস্থিতি জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত ৪৬টি দেশের তালিকার ছয়টি দেশ- বতসোয়ানা, কেপ ভার্দে, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, মালদ্বীপ, সামোয়া এবং ভানাতু ২০২০ সালের মধ্যে এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে।
কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ২০২১ সালে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) তাদের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে বেরিয়ে আসতে পাঁচটি দেশকে পাঁচ বছরের সময়সূচি বেঁধে দেয়। এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে ভুটান এবং সাও তোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপে-কে ২০২৩-এর ১৩ ডিসেম্বর, অ্যাঙ্গোলাকে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এবং ২০২৭-এর ১৩ ডিসেম্বর সলোমন আইল্যান্ডসকে সময় দেওয়া হয়েছে। অন্য দেশগুলো হয় এ তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে মতপার্থক্যের কবলে পড়েছে, কিংবা বিবেচনাধীন রয়েছে।
স্বল্পোন্নত দেশগুলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অন্তর্ভুক্ত উন্নত দেশগুলোর বাজারে সহজতর ও বিনামূল্যে প্রবেশের সুবিধা পায়। তাদের আরও মেলে শিথিল কোটা ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট মেধাস্বত্ব অধিকারের (দ্য অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্রেড-রিলেটেড অ্যাসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইটস-ট্রিপস) সুবিধা।
দীর্ঘ প্রত্যয় ডব্লিউটিওর সদস্য দেশগুলোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো স্বল্পোন্নত দেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে এলে তারা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য প্রদেয় সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারবে না। তবে ২০০১ সালের দোহায় আয়োজিত ডব্লিউটিওর মন্ত্রী পর্যায়ের সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, এলডিসি থেকে উত্তরণ পাওয়া যেসব স্বল্পোন্নত দেশ টেকসই উন্নয়নে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যুক্ত হবে, তাদের সুবিধা মিলবে।
কভিড মহামারিকালে বিপর্যস্ত বিশ্বে এই পরিমাপণের আবশ্যিকতা আরও সহজতর করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এ কারণে এলডিসির সমন্বয়ক আফ্রিকার দেশ চাদ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য 'সাব-প্রোভিশনের' প্রস্তাব করে, যেন তারা টেকসই উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে যেতে ১২ বছর সময় পায়; কিন্তু ডব্লিউটিওর সদস্যদের বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে এই প্রস্তাব ভেস্তে যায়।
এ বিষয়ে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর পুনর্বিবেচনার জন্য দ্বিতীয়বার প্রস্তাব পাঠায় এলডিসি। যোগাযোগ করেছিল আফ্রিকার দেশ জিবুতি, যেহেতু এ মুহূর্তে তারা এলডিসির সমন্বয়কারী। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ডব্লিউটিও শাখার তথ্যমতে, বাণিজ্যসহ ডব্লিউটিওর অন্যান্য সহায়তার কথা মাথায় রেখে দ্বিতীয়বার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। বিশেষ করে রপ্তানিতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর ভর্তুকি নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ট্রিপসের সুবিধা প্রদান, ট্রান্সফার অব টেকনোলজিসের (টিওটি) ক্ষেত্রে প্রণোদনা, নিয়মতান্ত্রিকতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তি নিয়ে সময় দেওয়া এবং মৎস্য সম্পদে ভর্তুকির চুক্তি-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে তুলে আনা হয়। তারা বিভিন্ন সময়ে এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে আসা দেশগুলোর কাছেও বিশেষ সহায়তা আশা করে।
চলতি বছরে অক্টোবরের ২৩ এবং ২৪ তারিখে সাধারণ পরিষদের সভা বৈশ্বিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে সহায়তা প্রদানে এক গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। সেখানে এলডিসি থেকে বেরোনোর পথকে সুগম করার কথা বলা হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের পথকে মসৃণ করতে পণ্যের বাজারে প্রবেশে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা প্রদানের পদক্ষেপ গ্রহণে সম্মত হয় এ সভা। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবুধাবিতে অনুষ্ঠেয় ডব্লিউটিওর ১৩তম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হবে।
বাংলাদেশের জন্য সুদীর্ঘ এক পথ বর্তমানে ৩৮টি দেশে ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮ সদস্য দেশ বাংলাদেশকে পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। পাশাপাশি জাপান, চিলি, নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত এবং চীনও একই সুবিধা প্রদান করছে।
ডব্লিউটিও জানায়, এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত সময় ২০২৬ সাল। এ তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও অবশ্য স্বল্পোন্নত দেশের জন্য বরাদ্দ সুবিধাগুলো পাবে না।
বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত বাণিজ্য সংস্থা শাখার সাবেক মহাব্যবস্থাপক (ডিটিও) মো. হাফিজুর রহমান এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানান। স্বল্পোন্নত দেশের ক্রমবর্ধমান ও টেকসই উন্নয়নের পথে উন্নত দেশগুলোকে সঙ্গী করতে এ সিদ্ধান্ত নতুন যুগের সূচনা করবে। এ সুবিধা পেতে চাইলে দেশকে প্রচুর কাজ গুছিয়ে নিতে হবে, যোগ করে তিনি।
তিনি বলেন, আবুধাবিতে অনুষ্ঠেয় ডব্লিউটিওর মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠকের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
সেন্টার ফল পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো, বেসরকারি থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক প্রফেসর মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এটা নতুন কিছুর শুরু। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একতরফা শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। 'তবে বাংলাদেশকে ট্রিপসের সুবিধা ভোগে নিয়মনীতির বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। দেশটি ওষুধ শিল্পেও ভালো করছে। আর ট্রিপস ছাড়া কমমূল্যে ওষুধ উৎপাদন সম্ভব হবে না, বলেন তিনি।
প্রফেসর মুস্তাফিজ জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে এসব সুবিধা আরো তিন বছর বৃদ্ধিতে সম্মত হয়েছে। কাজেই বলা যায়, এ প্রাপ্তি তিন বছরের কম হবে না এবং এও ধরে নেওয়া যায় না যে তা ছয় বছরের বেশি হবে।
এ ছাড়াও এমন কোনো চুক্তি নেই যার মাধ্যমে ডব্লিউটিও সদস্যরা এ সিদ্ধান্তকে জোরপূর্বক কার্যকর করবে। আর এ জন্যেই বাজারে প্রবেশ নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশকে গুটিকয়েক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে। চুক্তির এ সম্পর্ক সদস্য দেশগুলোর সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাববিস্তার করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট শাখার একজন কর্মকর্তা ভিউজ বাংলাদেশকে জানান, ডব্লিউটিওর বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় এলডিসি বাণিজ্যের বাড়তি সুবিধা দাবি করেছে বাংলাদেশ। এতে ওষুধ জাতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে ট্রিপস-এর মেধাস্বত্ত্ব সংক্রান্ত বিষয় সংযুক্ত হবে। তিন বছরে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় প্রবেশের পর আরও ছয় বছরের জন্য এ সুবিধার কথা বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এ বাড়তি সুবিধা আদায়ের বিষয়ে মধ্যস্থতা চলামান।
দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও শাখার যুগ্ম সচিব ড. মো. আলম মোস্তফা বলেন, জ্যেষ্ঠ সচিব তপন কান্তি ঘোষ জানিয়েছেন, বিভিন্ন সুবিধা প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণে কাজ চলছে। ওষুধ শিল্প এবং অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য ট্রিপস-এর সুবিধা আদায় করে নেওয়া প্রয়োজন।
চলমান নির্বাচনি প্রক্রিয়া তাদের এই প্রস্তুতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে কি না- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে