শেষ মুহূর্তের জাদুতে ইংল্যান্ডের স্বপ্নভঙ্গ, ফাইনালে আর্জেন্টিনা
ফুটবল কখনও কখনও সময়ের চেয়েও বড় গল্প লিখে। যেখানে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কোনো স্বপ্নের মৃত্যু হয় না, আবার কোনো বিজয়ও নিশ্চিত থাকে না। আটলান্টার রাতও তেমনই এক মহাকাব্যের জন্ম দিল। প্রায় পুরো ম্যাচজুড়ে পিছিয়ে থেকেও শেষ কয়েক মিনিটের জাদুতেই যেন ভাগ্যের কলম নিজের হাতে তুলে নিল আর্জেন্টিনা। যোগ করা সময়ের অবিশ্বাস্য নাটকীয়তায় ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে আর্জেন্টিনার হাতে রচিত হল নতুন এক বিজয়গাথা।
ফিফা বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ২-১ গোলের এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন শুধু একটি জয় নয়; এটি ছিল বিশ্বাস, ধৈর্য আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার দর্শনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা, যেখানে তাদের অপেক্ষায় স্পেন। অন্যদিকে, মাত্র কয়েক মিনিট আগেও যারা ফাইনালের স্বপ্নে বিভোর ছিল, সেই ইংল্যান্ডকে এবার সান্ত্বনা খুঁজতে হবে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ হয়ে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে।
আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ম্যাচের প্রথমার্ধ কেটেছে পুরোপুরি শারীরিক লড়াইয়ে। প্রথম ৩০ মিনিটে দুই দলের কেউই গোল পোস্ট অভিমূখে কোনো অন-টার্গেট শট নিতে পারেননি। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালের পর এই প্রথম কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটে কোনো শট রেকর্ড হয়নি। মাঝমাঠে জুড বেলিংহাম প্রথমার্ধে বল স্পর্শ করেন ২৩ বার আর হ্যারি কেইন ১৩ বার, অথচ দুজনের কেউই একটি অন টার্গেট শটও নিতে পারেননি সে সময়ে। বিরতি পর্যন্ত দুই দল মিলিয়ে মোট শট ছিল মাত্র তিনটি, যেখানে প্রথম দশ মিনিটেই সাতটি ফাউল হলেও একটিও শট হয়নি।
পুরো প্রথমার্ধে ফাউলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯টি, যার মধ্যে আর্জেন্টিনা করে ১২টি ও ইংল্যান্ড ৭টি। বিরতির আগে বল দখলে সামান্য এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধেই হলুদ কার্ড দেখেন দুজন। ৩৭ মিনিটে মেসিকে ফাউল করে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন ইংল্যান্ডের এলিয়ট অ্যান্ডারসন, আর ৪২ মিনিটে মরগান রজার্সকে টেনে ধরে কার্ড দেখেন আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ।
দ্বিতীয়ার্ধে খেলা জমে ওঠে। ৫৪ মিনিটে হ্যারি কেইনের লম্বা বল থেকে ডেক্লান রাইস দ্বিতীয় বল দখলে নিয়ে মরগান রজার্সকে খুঁজে নেন, আর রজার্সের নিখুঁত ক্রস থেকে কাছ থেকে বল জালে জড়ান অ্যান্থনি গর্ডন। এতে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় থমাস টুখেলের দল। গোল হজমের পর আক্রমণের ঝাঁজ বাড়ায় আর্জেন্টিনা। ৬৪ মিনিটে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের বদলে নামেন নিকো গঞ্জালেজ। ৬৯ মিনিটে মেসির ক্রস থেকে গঞ্জালেজের হেড দুর্দান্ত দক্ষতায় রুখে দেন ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড। এরপর ৭২ মিনিটে একসঙ্গে তিন পরিবর্তন আনেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। জিওভান্নি সিমিওনে, নাহুয়েল মোলিনা ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজের বদলে নামেন রদ্রিগো দে পল, গনসালো মন্তিয়েল ও নিকোলাস ওতামেন্দি। সমতা ফেরাতে ৮১ মিনিটে বাঁ প্রান্তের ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে তুলে আক্রমণে তারকা ফরোয়ার্ড লাউতারো মার্তিনেজকে নামান তিনি। গোল হজমের পর ইংল্যান্ড আর কোনো উল্লেখযোগ্য আক্রমণ তৈরি করতে পারেনি, বরং কোচ টুখেল আরও রক্ষণাত্মক খেলোয়াড় নামিয়ে ব্যবধান ধরে রাখার কৌশলে যান।
চাপ ধরে রেখে অবশেষে ফল পায় আর্জেন্টিনা। এর আগে এনজো ফার্নান্দেজের একটি দূরপাল্লার শট পিকফোর্ড কর্নারের বিনিময়ে ঠেকিয়ে দেন। একই কর্নার থেকে ফেরত আসা বলে ৮৫ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক শটে দলকে সমতায় ফেরান ফার্নান্দেজ। এর মাঝে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি জোরালো হেড গোলপোস্টে লেগে ফেরত আসে। এরপর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে নাটকীয়তার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায়। ম্যাক অ্যালিস্টারের শট পোস্টে লেগে ফেরত আসার পর বল ধরে রাখেন মেসি, খেলাকে থিতু হতে দিয়ে ডান দিক থেকে নিখুঁত ক্রস বাড়ান বক্সে। সেখানে হেডে বল জালে পাঠান বদলি নামা লাউতারো মার্তিনেজ। ম্যাচের দুটি গোলেই সরাসরি সহায়তা করেন মেসি; ফার্নান্দেজের গোলের আগেও তিনি বল বাড়িয়েছিলেন, আর লাউতারোর গোলে ছিল তার নিখুঁত ক্রস। শেষ মুহূর্তে সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েও আর কোনো সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি ইংল্যান্ড।
ম্যাচ শেষে ফিফা ও অপ্টার হালনাগাদ অফিসিয়াল পরিসংখ্যানে আর্জেন্টিনার সামগ্রিক আধিপত্যের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বল দখলে আর্জেন্টিনা ছিল ৬৪ শতাংশ সময় জুড়ে, বিপরীতে ইংল্যান্ডের হাতে বল ছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ সময়। পাসের নির্ভুলতাতেও স্পষ্ট ব্যবধান ছিল দুই দলের মধ্যে; ইংল্যান্ড ২৪৭টি পাস দিয়ে ৮৭ শতাংশ নির্ভুলতা দেখায়, আর আর্জেন্টিনা ৪৭০টি পাস দিয়ে অর্জন করে ৯১ শতাংশ নির্ভুলতা। লক্ষ্যে শটের হিসাবেও আর্জেন্টিনা এগিয়ে ছিল; তাদের ৩টি শট লক্ষ্যে ছিল, ইংল্যান্ডের ছিল ২টি, আর দুই দলই সমান দুটি করে বড় সুযোগ নষ্ট করে। ডুয়েল জেতার হিসাবেও আর্জেন্টিনা সামান্য এগিয়ে (৪৫-৪২), আর গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করলেও এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে করতে হয় মাত্র একটি। সব মিলিয়ে আক্রমণের পরিমাণ, মান ও ধারাবাহিকতা; তিন বিচারেই ম্যাচজুড়ে স্পষ্ট আধিপত্য ছিল আর্জেন্টিনার, যদিও স্কোরলাইনে তার প্রতিফলন ঘটে সবশেষ কয়েক মিনিটেই।
শৃঙ্খলা ও শারীরিক লড়াইয়ের বিচারেও ম্যাচটি ছিল রেকর্ড গড়া। প্রথমার্ধে দুই দল মিলিয়ে ১৯টি ফাউল করলেও একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি কেউ, যা এই বিশ্বকাপের কোনো অর্ধে লক্ষ্যে শট ছাড়া সবচেয়ে বেশি ফাউলের রেকর্ড। ম্যাচজুড়ে হলুদ কার্ড দেখেন মোট তিনজন। প্রথমার্ধে মেসিকে ফাউল করার দায়ে ইংল্যান্ডের এলিয়ট অ্যান্ডারসন, পাল্টা আক্রমণ থামাতে গিয়ে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। আর যোগ করা সময়ে অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের জন্য বদলি নামা রদ্রিগো দে পল। পুরো ম্যাচে কোনো লাল কার্ড দেখেনি কেউ, পেনাল্টিও দেওয়া হয়নি একবারও।
পরিসংখ্যানের বাইরে এই ম্যাচ থেকে বেরিয়ে এসেছে একাধিক উল্লেখযোগ্য রেকর্ডও। সমতাসূচক ও জয়সূচক; দুটি গোলেই সরাসরি সহায়তা করে মেসি টানা ১১টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করা বা সহায়তা করার নতুন রেকর্ড গড়েন, যা ১৯৬৬ সালের পর থেকে রাখা রেকর্ডে দীর্ঘতম এমন ধারাবাহিকতা। অন্যদিকে জয়সূচক গোলে সরাসরি ভূমিকা রাখা অ্যান্থনি গর্ডন সবশেষ সাত ম্যাচে ইংল্যান্ডের হয়ে সরাসরি ছয়টি গোলে অবদান রাখলেন (দুই গোল, চার সহায়তা)।
দলগত অর্জনের দিক থেকেও এই জয় আর্জেন্টিনার জন্য ঐতিহাসিক। এই নিয়ে সপ্তমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল তারা। যেখানে জার্মানির ৮ বার ও ব্রাজিলের সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফাইনালে-উপস্থিতি। আর ১৯৮৬-১৯৯০ সালের পর এই প্রথমবার টানা দুই আসরে ফাইনালে উঠল আলবিসেলেস্তেরা। বিপরীতে ১৯৬৬ সালে প্রথমবার সেমিফাইনাল জিতে ফাইনালে ওঠা ইংল্যান্ড এখন পর্যন্ত সবশেষ তিনটি সেমিফাইনালেই (১৯৯০, ২০১৮ ও ২০২৬) বিদায় নিল।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ইংল্যান্ড কোচ থমাস টুখেল নিজের দলের পারফরম্যান্সে পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলেন না বলে জানান। তিনি বলেন, দল আরও দ্রুতগতির ও নিখুঁত ফুটবল খেলতে পারত এবং অহেতুক ভুল বেশি হয়েছে। অন্যদিকে মাঝমাঠের তারকা জুড বেলিংহাম ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের বলেন, কঠিন পরিস্থিতিতে খেলার অভিজ্ঞতা হয়তো প্রতিপক্ষ কোচের কম থাকতে পারে, আর আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলাটা মোটেও সহজ ছিল না।
এই জয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। শিরোপা ধরে রাখতে পারলে তা হবে বিরল এক কীর্তি, যা গত সত্তর বছরে কোনো দল করে দেখাতে পারেনি। বর্তমানে তিনটি বিশ্বকাপ শিরোপা নিয়ে আলবিসেলেস্তেরা তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সময় পার করছে। অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর আর ফাইনালেই উঠতে পারেনি ইংল্যান্ড, ঘরের মাটিতে জেতা একটিমাত্র শিরোপাই এখনো তাদের একমাত্র সাফল্য। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এই প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মুখোমুখি হলেন লিওনেল মেসি। কৌতূহলোদ্দীপক আরেকটি বিষয়- দুই দল সবশেষ মুখোমুখি হয়েছিল ২১ বছর আগে, আর নকআউট পর্বে সবশেষ দেখা হয়েছিল ১৯৯৮ বিশ্বকাপে। সেবারের মতোই এবারও জিতল আর্জেন্টিনা।
নকআউট পর্বে এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। রাউন্ড অব ৩২-এ কেপ ভার্দেকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে হারায় তারা, রাউন্ড অব ১৬-তে মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে ম্যাচ জেতে, আর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারায় ৩-১ গোলে। প্রতিটি ধাপেই নাটকীয়তা সঙ্গী করে ফাইনালের দুয়ারে পৌঁছাল লিওনেল মেসির দল।
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের এই লড়াইয়ে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ ইতিহাস ও আবেগ। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অব গড' ও 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি', ১৯৯৮ বিশ্বকাপে বেকহ্যামের লাল কার্ড কিংবা ২০০২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের প্রতিশোধ; প্রতিটি মুখোমুখি লড়াইয়েই যোগ হয়েছে নতুন অধ্যায়। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এর আগে তিনবার মুখোমুখি হয়ে প্রতিবারই জিতেছিল আর্জেন্টিনা, আজকের জয়ে সেই ধারাই অব্যাহত রইল।
আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা, আর তার আগে মায়ামিতে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলবে ইংল্যান্ড। ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হওয়া আর্জেন্টিনার এই লড়াইও হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক। এটিই হবে বর্তমান উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়ন ও বর্তমান কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়নের মধ্যে ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফাইনাল।
মতামত দিন