কেইন-ঝড়ে শেষ মুহূর্তে বাঁচল ইংল্যান্ড, শেষ ষোলোয় প্রতিপক্ষ মেক্সিকো
ম্যাচের প্রায় পুরোটা সময় পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত হাসি ফুটল ইংল্যান্ডের মুখে। অধিনায়ক হ্যারি কেইনের জোড়া গোলে ডিআর কঙ্গোকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিয়েছে থ্রি লায়নরা। আগামী ৬ জুলাই নকআউট পর্বের পরের ধাপে তাদের প্রতিপক্ষ মেক্সিকো।
বুধবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার আটলান্টায় অবস্থিত মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে শুরু হওয়া ম্যাচে প্রথম মিনিট থেকেই বড়সড় ধাক্কা খায় ইংল্যান্ড। খেলার শুরুতেই বক্সের বাঁ প্রান্ত থেকে দুর্দান্ত এক শটে গোল করে বসেন ব্রায়ান সিপেঙ্গা, বল আশ্রয় নেয় জালের নিচের কোণায়। এই গোলের নেপথ্যে ছিলেন দলনেতা শানসেল এমবেম্বা, তাঁর নিখুঁত বাড়ানো বল থেকেই সুযোগ তৈরি হয়েছিল সিপেঙ্গার জন্য।
এরপর পুরো প্রথমার্ধ জুড়েই দাপট দেখিয়েছে কঙ্গো, বিশেষ করে গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসির অতিমানবীয় নৈপুণ্যে বেশ কয়েকবার হতাশ হতে হয়েছে ইংলিশ আক্রমণভাগকে। জুড বেলিংহ্যামের একের পর এক প্রচেষ্টা রুখে দেন তিনি, একবার হেডে নেওয়া নিশ্চিত গোলমুখী শট ঠেকান একদম শেষ মুহূর্তে, অন্যবার বিপক্ষের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করা বল দুর্দান্ত রিফ্লেক্সে আটকে দেন। মার্কাস র্যাশফোর্ডের একটি জোরালো শটও ব্লক হয়ে যায় প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে।
উল্টো প্রথমার্ধের শেষদিকে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুযোগ পেয়েছিল কঙ্গোই। ইংলিশ রক্ষণে এজরি কনসা ও মার্ক গেহির অবস্থানগত ভুলের সুযোগে অ্যারন ওয়ান-বিসাকার বাড়ানো বলে ইয়োয়ান উইসার নেওয়া শট পোস্টের কানায় লেগে ফেরত আসে, বেঁচে যায় ইংল্যান্ড। এছাড়া হ্যারি কেইন বক্সে পড়ে গেলে পেনাল্টির জোরালো আবেদন তোলে ইংল্যান্ড শিবির, কিন্তু রেফারি উল্টো কেইনের বিপক্ষেই ফাউলের সিদ্ধান্ত দেন।
বিরতির পরও কিছুক্ষণ লড়াই চালিয়ে যান এমপাসি। বেলিংহ্যামের দেওয়া আরেকটি শট প্রতিপক্ষের গায়ে লেগে দিক পাল্টে জালের দিকে যাচ্ছিল, তাও অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন কঙ্গোর এই গোলরক্ষক। তবে শেষ পর্যন্ত আর প্রতিরোধ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। ম্যাচের ৭৫তম মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের বাড়ানো বলে হেডে সমতা ফেরান হ্যারি কেইন, যদিও বল জালে ঢোকার আগে এমপাসির হাতে সামান্য স্পর্শ লেগেছিল।
এরপর মাত্র ১১ মিনিটের ব্যবধানে, ৮৬তম মিনিটে আবারও গর্ডনের সহায়তায় বক্সের বাইরে থেকে বল পেয়ে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের জোরালো শটে দলকে এগিয়ে দেন ইংলিশ অধিনায়ক। এই জোড়া গোলেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের করে নেয় ইংল্যান্ড।
সমতাসূচক গোলটির মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোলসংখ্যায় কিংবদন্তি পেলেকে ছাড়িয়ে যান হ্যারি কেইন। বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা এখন ১৩টি, যার মধ্যে চলতি আসরেই করেছেন পাঁচটি গোল।
পুরো ম্যাচে বল দখল ও আক্রমণে এগিয়ে থেকেও দীর্ঘ সময় ফিনিশিংয়ে ব্যর্থ ছিল ইংল্যান্ড, অন্যদিকে সীমিত সুযোগ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘক্ষণ লিড ধরে রাখে কঙ্গো। তবে অভিজ্ঞতা ও শেষ মুহূর্তের মানসিক দৃঢ়তায় এগিয়ে থেকেই মাঠ ছেড়েছে থ্রি লায়নরা।
ম্যাচ শেষের অফিসিয়াল পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পুরো ম্যাচে বল দখলে এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড, তাদের দখলে ছিল ৫৪ শতাংশ সময়, আর ডিআর কঙ্গোর দখলে ছিল বাকি ৪৬ শতাংশ। আক্রমণেও স্পষ্ট আধিপত্য দেখিয়েছে ইংল্যান্ড, তারা মোট ১৬টি শট নিয়েছে, যেখানে কঙ্গো নিয়েছে মাত্র ৭টি শট।
ইংল্যান্ডের ১৬টি শটের মধ্যে লক্ষ্যে ছিল ৮টি, অন্যদিকে কঙ্গোর ৭টি শটের মধ্যে লক্ষ্যে ছিল ২টি। ইংল্যান্ডের ৫টি শট লক্ষ্যের বাইরে গেছে, আর কঙ্গোর ৩টি শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের রক্ষণে ব্লক হয়েছে ইংল্যান্ডের ৩টি শট, আর কঙ্গোর ব্লক হয়েছে ২টি শট। কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি করেছেন ৫টি দুর্দান্ত সেভ, বিপরীতে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড করেছেন ১টি সেভ। কর্নার আদায়ে এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড, তারা পেয়েছে ৫টি কর্নার, আর কঙ্গো পেয়েছে ৩টি কর্নার।
আজকের ম্যাচে বেশি ফাউল করেছে কঙ্গো; মোট ১২টি, সেখানে ইংল্যান্ড ফাউল করেছে ৯টি। ইংল্যান্ড ফ্রি কিক আদায় করেছে ১১টি, আর কঙ্গো আদায় করেছে ৯টি। অফসাইডের ফাঁদে বেশি পড়েছে কঙ্গো, মোট ৪ বার, আর ইংল্যান্ডের কোনো খেলোয়াড় অফসাইডে পড়েননি। দুই দলই ১টি করে হলুদ কার্ড দেখেছে এই ম্যাচে, কোনো লাল কার্ড দেখানো হয়নি। গোলকিক নিয়েছে কঙ্গো ১৬টি ও ইংল্যান্ড ৫টি, থ্রো-ইনে ইংল্যান্ড নিয়েছে ১৬টি আর কঙ্গো নিয়েছে ২৪টি। ম্যাচে ইংল্যান্ড ৪টি এবং কঙ্গো ৫টি খেলোয়াড় পরিবর্তন করেছে। সব মিলিয়ে পরিসংখ্যান বলছে, আক্রমণ ও বল দখলে পুরো ম্যাচ জুড়েই স্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ ছিল ইংল্যান্ডের হাতে, তবে কঙ্গোর গোলরক্ষক এমপাসির একের পর এক সেভের কারণেই ম্যাচ দীর্ঘ সময় উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ছিল। শেষ পর্যন্ত হ্যারি কেইনের জোড়া গোলেই নির্ধারিত হয় ম্যাচের ভাগ্য।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৯৬৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও জেতা ইংল্যান্ড এরপর দীর্ঘ ছয় দশকে বিশ্বকাপে গোল হজম করার পর আর কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি- এই ম্যাচ দিয়ে সেই দীর্ঘ খরাও কাটল তাদের।
চূড়ান্ত ফলাফলে ইংল্যান্ড ২-১ গোলে জয়ী হয়েছে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে। এই জয়ে ইতিহাসগড়া প্রথম নকআউট অভিযানের ইতি ঘটল ডিআর কঙ্গোর, তবে পুরো টুর্নামেন্টে সাহসী ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে নজর কেড়েছে দলটি। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের সামনে এখন অপেক্ষা করছে আগামী ৬ জুলাইয়ের মেক্সিকো ম্যাচ, যেখানে শেষ আটে ওঠার লড়াইয়ে নামবে টমাস টুখেলের দল।
মতামত দিন