Views Bangladesh Logo

জাবির বাজেটে ১০০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি, গবেষণায় বরাদ্দ শূন্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৩৪৮ কোটি ৭০ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট। তবে এবারের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঞ্চিত রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে সিনেটে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

শনিবার (২৭ জুন) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩তম বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সভাপতিত্বে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম আবদুর রব বাজেট উপস্থাপন করেন।

অনুমোদিত বাজেটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ২০১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বা প্রায় ৫৮ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য। প্রশাসনিক সরবরাহ ও সেবা খাতে বরাদ্দ ৭৮ কোটি ৩ লাখ টাকা। এছাড়া পেনশন ও অবসর-সুবিধা, যন্ত্রপাতি ক্রয়, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি, যানবাহন এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতেও পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি। প্রশাসনের দাবি, গবেষণার অর্থ পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে সরাসরি দেওয়া হবে।

সিনেটে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক বছর ধরে ব্যয় ও প্রাপ্ত বরাদ্দের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকায় রাজস্ব ঘাটতিও ক্রমাগত বেড়েছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে যেখানে সঞ্চিত ঘাটতি ছিল প্রায় ৬২ কোটি টাকা, তা ২০২৪–২৫ অর্থবছর শেষে বেড়ে ৯৯ কোটি ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরের হিসাব যুক্ত হলে এই ঘাটতি ১০০ কোটি টাকা অতিক্রম করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৪৪১ কোটি টাকার বেশি বাজেট চাইলেও ইউজিসি অনুমোদন দিয়েছে ৩৪৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ কম পাওয়ায় বিভিন্ন খাতে অর্থসংকট তৈরি হয়েছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।

কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম আবদুর রব বলেন, গবেষণা, শিক্ষার্থীসেবা, প্রশাসনিক ব্যয় এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থসংকট তৈরি হচ্ছে। এছাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিচালনা, গবেষণা ভাতা, স্বাস্থ্য বীমা ভর্তুকি, গার্ড বোনাস ও ডাইনিং হলের অস্থায়ী কর্মচারীদের বেতনের মতো ব্যয়ও রাজস্ব তহবিলের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

সিনেট অধিবেশনে প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ অ্যান্ড থিওলজি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিয়েও মতবিরোধ দেখা দেয়। কয়েকজন সিনেট সদস্য অভিযোগ করেন, একাডেমিক কাউন্সিলে কোরাম সংকটের মধ্যে সম্পূরক এজেন্ডা হিসেবে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী এবং ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন—উভয়েই এ প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে বলেন, নতুন বিভাগ বা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পূরক এজেন্ডায় আনা উচিত হয়নি।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান জানান, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম সমাবর্তন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি সিনেট সদস্যদের সহযোগিতা কামনা করেন।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ১২ হাজার ১৯৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এছাড়া এমফিল গবেষক ৯১৬ জন এবং পিএইচডি গবেষক ৯৫৪ জন রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৭০৭ জন শিক্ষক, ৩৯২ জন কর্মকর্তা এবং ১ হাজার ৪৫১ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী কর্মরত আছেন।

সিনেট সদস্য ও আইআইটি বিভাগের অধ্যাপক শামীম কায়সার সিনেটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পুনর্বহালের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পাশাপাশি তিনি নতুন বিভাগ চালুর আগে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন, আইআইটি ও আইবিএর অবকাঠামোগত সংকট নিরসন, গবেষণা সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি গবেষণা ও উদ্ভাবন। অথচ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাজেটে এ খাতে শূন্য বরাদ্দ এবং একই সময়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রশাসন ইউজিসির বরাদ্দের ওপর নির্ভরতার কথা বললেও, গবেষণার জন্য নিজস্ব অর্থায়নের অনুপস্থিতি ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ