বেবি পাউডারে ক্যানসারের ঝুঁকির মামলা নিষ্পত্তিতে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিল জনসন
বেবি পাউডার ও ট্যাল্কযুক্ত অন্যান্য পণ্য ব্যবহারে ক্যানসার হওয়ার অভিযোগে বহুজাতিক আমেরিকান কোম্পানি জনসন অ্যান্ড জনসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার মামলা হয়েছিল। দীর্ঘ এক দশকের এই আইনি লড়াইয়ের ইতি টানতে সোমবার (২৭ জুলাই) প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৮ হাজার ২০ কোটি টাকা) দিয়ে মামলাগুলো নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছে।
কোম্পানির ভাষ্যমতে, এই সমঝোতা নিউ জার্সির একটি ফেডারেল আদালতে একত্রীকৃত এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য আদালতে বিচারাধীন প্রায় ৬৯ হাজার মামলা কাভার করবে, যা বাকি থাকা ট্যাল্ক-সংক্রান্ত মামলার প্রায় ৯৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তবে এই প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার আগে রাষ্ট্র বা ফেডারেল আদালতে ডিম্বাশয়ের ক্যানসার-সংক্রান্ত দাবিদারদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তত ৯৫ শতাংশের সম্মতি প্রয়োজন হবে।
কোম্পানির লিটিগেশন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এরিক হাস বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং বৈজ্ঞানিক দিক থেকেও দুর্বল। তবে বিষয়টির একটি চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতেই তারা সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যে, আইনি লড়াই আরও চললে শেষ পর্যন্ত কোম্পানিই জিতত, কারণ এ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া বেশিরভাগ মামলাতেই তারা জয়লাভ করেছে। তবে সমঝোতা হলে গবেষণা ও নতুন চিকিৎসাপণ্য উদ্ভাবনে আরও মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।
বাদীপক্ষের নেতৃস্থানীয় আইনজীবী ক্রিস সিগার এই সমঝোতাকে দীর্ঘ এক দশকের আইনি লড়াইয়ের যৌক্তিক পরিসমাপ্তি হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনটি ব্যর্থ দেউলিয়া প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকা হাজারো নারী ও তাদের পরিবার এবার ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাবেন। আগের দেউলিয়া প্রস্তাবগুলোর তুলনায় এই সমঝোতায় ভবিষ্যতের কোনো দাবি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় বিদ্যমান বাদীদের জন্য অর্থের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি, এবং সব দাবি নিষ্পত্তি হবে দেড় বছরের মধ্যেই—যেখানে আগের প্রস্তাবে দশকের বেশি সময় লেগে যেত বলেও জানান তিনি।
ট্যাল্ক মূলত ম্যাগনেসিয়াম, সিলিকন, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন দিয়ে গঠিত একটি প্রাকৃতিক খনিজ, যা মসৃণ অনুভূতির কারণে বেবি পাউডারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মাটি থেকে উত্তোলিত এই ট্যাল্কে থাকা অ্যাসবেস্টসই তাদের ক্যানসারের কারণ, কারণ ট্যাল্কের খনিজ স্তর সাধারণত অ্যাসবেস্টসের কাছাকাছি অবস্থান করে এবং অ্যাসবেস্টস দীর্ঘদিন ধরেই ক্যানসারের জন্য দায়ী একটি উপাদান হিসেবে পরিচিত।
জনসন অ্যান্ড জনসন অবশ্য শুরু থেকেই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে, বলছে তাদের ট্যাল্ক নিরাপদ এবং তাতে কোনো অ্যাসবেস্টস নেই। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ট্যাল্ককে মানবদেহে ক্যানসারের "সম্ভাব্য কারণ" হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছিল, যদিও কোম্পানিটি এই শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে।
চাপের মুখে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ট্যাল্কভিত্তিক বেবি পাউডার বিক্রি বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি, আর ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে এই পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধের ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে কর্নস্টার্চভিত্তিক বেবি পাউডার উৎপাদনে মনোনিবেশ করেছে কোম্পানিটি।
উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগে মামলা চলছে, যেখানে ৭ হাজারের বেশি সম্ভাব্য দাবিদার যুক্ত রয়েছেন এবং তা যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পণ্য দায় সংক্রান্ত মামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সোমবারের এই সমঝোতা প্রস্তাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মামলাগুলোর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যুক্তরাজ্যের মামলার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
মতামত দিন