Views Bangladesh Logo

এপস্টাইন ফাইলস বৃত্তান্ত: পর্ব ১

জেফরি এপস্টাইন ও তার অপরাধের ললিতা এক্সপ্রেস

Sauren  Habib

সৌরেন হাবীব

পস্টাইন ফাইলস এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে অস্বস্তিকর ও অন্ধকার এক দলিল দস্তাবেজের নাম। শিশু যৌন নির্যাতন এবং চাইল্ড ট্রাফিকিং-এর মতো ঘৃণ্যতম অপরাধের সাথে যুক্ত হয়েছে বিল ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, লিওন ব্ল্যাক, এহুদ বারাক ও বিল গেটসের মতো বিশ্বের রথী-মহারথীদের নাম। সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র ১২,২৮৫টি ডকুমেন্ট রিলিজ হয়েছে; অথচ বাকি ডকুমেন্ট প্রকাশের নির্ধারিত সময়সীমা ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে।


এখন পর্যন্ত যা প্রকাশ হয়েছে, তাতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম অনেকবার এসেছে। এই নাম আসাকে কেন্দ্র করেই এপস্টাইন ফাইলস নিয়ে আমেরিকা ও সারা বিশ্বে তোলপাড় চলছে—যদিও এখন পর্যন্ত এসব নথিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা মেলেনি। নথির বাকি অংশ প্রকাশের ডেডলাইন মিস হওয়ার বিষয়টি নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই এপস্টাইন ফাইলসের পেছনে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর অন্যতম বড় অপরাধকাণ্ডের এক বিশাল আখ্যান।


পৃথিবীর এই অন্ধকার আখ্যানকে আমরা তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করবো:


১. জেফরি এপস্টাইন ও তার অপরাধের ললিতা এক্সপ্রেস
২. মিয়ামী হেরাল্ডের অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলি কে ব্রাউনের 'পারভারসন অব জাস্টিস' সিরিজ
৩. ক্লিনটন নাকি ট্রাম্প—এপস্টাইন ফাইলস ও আমেরিকার ভবিষ্যৎ রাজনীতি


আজ প্রথম পর্ব: জেফরি এপস্টাইন ও তার অপরাধের ললিতা এক্সপ্রেস


জেফরি এপস্টাইন—আমেরিকান অর্থনীতিবিদ এবং যৌন অপরাধী, যার নাম এখন বিশ্বব্যাপী কেলেঙ্কারির প্রতীক। একসময় ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব থাকলেও তার জীবনের করুণ সমাপ্তি ঘটেছে যৌন পাচার এবং নাবালিকাদের শোষণের অভিযোগে। তিনি বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। ২০১৯ সালে কারাগারে তার রহস্যময় মৃত্যুর পর থেকে তার সাথে যুক্ত নথিপত্র এবং সাক্ষ্যপ্রমাণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকে, যা তার জীবনের অন্ধকার দিকগুলোকে উন্মোচিত করেছে।


জেফরি এডওয়ার্ড এপস্টাইন ১৯৫৩ সালের ২০ জানুয়ারি ব্রুকলিনের একটি ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সিমুর জর্জ এপস্টাইন নিউ ইয়র্ক সিটি পার্কস ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন এবং মা পাউলিন স্টলোফস্কি ছিলেন একজন গৃহিণী। কোনি আইল্যান্ডের সি গেট এলাকায় বেড়ে ওঠা এপস্টাইন ছোটবেলা থেকেই গণিত এবং সঙ্গীতে দক্ষতা দেখান। তিনি লাফায়েট হাই স্কুল থেকে ১৬ বছর বয়সে স্নাতক হন এবং পরবর্তীতে কুপার ইউনিয়ন ও নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির কুরান্ট ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করেন, যদিও কোনো ডিগ্রি অর্জন করেননি।


১৯৭৪ সালে তিনি ম্যানহাটনের ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যদিও তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতা যোগ্যতা ছিল না। সেখানে তিনি প্রভাবশালী অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলেন এবং ১৯৭৬ সালে 'বিয়ার স্টার্নস' ব্যাংকে যোগ দেন। সেখানে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে তিনি 'লিমিটেড পার্টনার' হন। ১৯৮১ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে নিজের কোম্পানি 'ইন্টারকন্টিনেন্টাল অ্যাসেটস গ্রুপ ইনকর্পোরেটেড' (আইএজি) প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি 'জে. এপস্টাইন অ্যান্ড কোম্পানি' গঠন করেন, যা মূলত লেসলি ওয়েক্সনারের মতো ধনকুবেরদের সম্পদ ব্যবস্থাপনা করত। তার সম্পদের পরিমাণ ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে অনুমান করা হয়। তিনি ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসে তার কোম্পানি স্থানান্তর করে ট্যাক্স সুবিধা নিতেন। তিনি নিজেকে হার্ভার্ডের শিক্ষার্থী দাবি করলেও তার প্রমাণ মেলেনি, তবে তিনি সেখানে ৬.৫ মিলিয়ন ডলার দান করেছিলেন।


এপস্টাইনের সামাজিক চক্র ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। বিল ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, লিওন ব্ল্যাক এবং বিল গেটসের মতো ব্যক্তিত্বরা তার পরিচিত ছিলেন। তার 'ব্ল্যাক বুক' এবং ফ্লাইট লগসে ৬০০ ঘণ্টারও বেশি যাত্রার রেকর্ড আছে, যা তার প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রকাশ করে। তবে এই সামাজিক যোগাযোগগুলো শেষ পর্যন্ত তার অপরাধের কালো ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায়।


এপস্টাইনের জীবনের অন্ধকার অধ্যায় জনসমক্ষে আসতে শুরু করে ২০০৫ সালে, যখন ফ্লোরিডার পাম বিচ পুলিশ তার বিরুদ্ধে নাবালিকা মেয়েদের যৌন শোষণের অভিযোগ তদন্ত শুরু করে। ৩৬ জনেরও বেশি ভিকটিম চিহ্নিত হন, যাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল মাত্র ১৪ বছর বয়সী। তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে গোপন ক্যামেরা, নগ্ন ছবি এবং যৌন সংক্রান্ত নানা উপকরণ পাওয়া যায়। ২০০৮ সালে তিনি একটি বিতর্কিত চুক্তির মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ১৮ মাসের সাজা পান (যার মধ্যে মাত্র ১৩ মাস তিনি 'ওয়ার্ক রিলিজ' সুবিধায় বাইরে কাটিয়েছেন)। এই চুক্তিটি ইউএস অ্যাটর্নি অ্যালেক্সান্ডার অ্যাকোস্টার নেতৃত্বে হয়েছিল, যা পরবর্তীতে তীব্র সমালোচিত হয়।


২০১৯ সালে তিনি পুনরায় ফেডারেল যৌন পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তার প্রধান সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল ২০২১ সালে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ২০ বছরের সাজা পান। অভিযোগ অনুসারে, এপস্টাইন ১০০০-এরও বেশি নাবালিকাকে শোষণ করেছেন। ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস সরকার তার এস্টেটের বিরুদ্ধে মামলা করে ১০৫ মিলিয়ন ডলারের সেটেলমেন্ট আদায় করে।


এপস্টাইন ১৯৯৮ সালে ৭.৯৫ মিলিয়ন ডলারে কেনেন ৭২ একরের ব্যক্তিগত একটি দ্বীপ। ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসে অবস্থিত এই দ্বীপটির নাম লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপ। এখানে একটি ম্যানশন, গেস্ট হাউস, হেলিপ্যাড এবং একটি মন্দিরের মতো অদ্ভুত স্থাপনা ছিল, যা সর্বত্র লুকানো ক্যামেরা দিয়ে সজ্জিত ছিল। স্থানীয়রা একে 'পেডোফাইল দ্বীপ' নামে ডাকতেন। ভিকটিম ভার্জিনিয়া গিউফ্রে জানান, এই দ্বীপে তাকে এবং অন্যান্য মেয়েদের যৌন কাজে বাধ্য করা হতো। ২০১৮ সাল পর্যন্ত এখানে শোষণ চলত বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে এই দ্বীপটি একটি রিসোর্টে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।


এপস্টাইনের বোয়িং ৭২৭ বিমানটি 'ললিতা এক্সপ্রেস' নামে কুখ্যাত। এটি মূলত নাবালিকাদের দ্বীপ, পাম বিচ এবং তার অন্যান্য আস্তানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হতো। ফ্লাইট লগসে বিল ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং এমনকি স্টিফেন হকিংয়ের মতো ব্যক্তিদের নামও পাওয়া যায়। যদিও এই নাম থাকা মানেই অপরাধী হওয়া নয়, তবে এটি এপস্টাইনের বিশাল নেটওয়ার্কের প্রমাণ দেয়। বিমানে ওয়্যারট্যাপিং ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা ছিল বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।


২০২৪ সাল থেকে 'এপস্টাইন ফাইলস' প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই ফাইলগুলো মূলত এপস্টাইন এবং ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে ফেডারেল তদন্ত থেকে সংগৃহীত কাগজপত্র, ভিডিও, ফটো এবং অডিও ডেটা। এগুলো এফবিআই-এর 'সেনটিনেল সিস্টেমে' সংরক্ষিত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর এই আইন (H.R.4405, Epstein Files Transparency Act) স্বাক্ষর করেন, যা Public Law 119-38 হিসেবে কার্যকর হয়। আইনটি ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস (DOJ)-কে সব অক্ল্যাসিফাইড ফাইলস (ভিকটিমদের ব্যক্তিগত তথ্য এবং অ্যাকটিভ তদন্তের অংশ বাদে) প্রকাশ করতে বাধ্য করে। আইন সাইন হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে (অর্থাৎ ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে) প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। যদিও DOJ আংশিক প্রকাশ করেছে, কিন্তু পুরোটাই করেনি, যা আইন লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচিত হয়েছে।


ধারণা করা হয় এপস্টাইন ফাইলস এর মোট ভলিউম প্রায় ২ মিলিয়নের বেশি। এখন পর্যন্ত মাত্র ১২,২৮৫টি ডকুমেন্ট (১২৫,৫৭৫ পৃষ্ঠা) প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে প্রকাশিত ফাইলের অনেক তথ্য কালো মার্কার দিয়ে ঢেকে (Redacted) দেওয়া হয়েছে।


২০১৯ সালের ১০ আগস্ট জেলে এপস্টাইনের মৃত্যু হলেও ২০২৫ সালের সিসিটিভি ফুটেজ সেটাকে আত্মহত্যা হিসেবেই ইঙ্গিত করে, যদিও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এখনো মানুষের মুখে মুখে। এই বিপুল পরিমাণ নথিপত্র সম্পূর্ণ প্রকাশিত হলে হয়তো জানা যাবে পর্দার আড়ালে থাকা আরও অনেক রথী-মহারথীর আসল রূপ, নতুবা সব রহস্য চাপা পড়ে যাবে জেফরি এপস্টাইনের মৃত্যুর মতোই।

পরের পর্বে আমরা আলোচনা করব—মিয়ামি হেরাল্ডের অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলি কে. ব্রাউনের পারভার্সন অব জাস্টিস সিরিজ নিয়ে। এই সিরিজের কারণেই জেফরি এপস্টাইনের প্রায় দশ বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা অপরাধগুলো আবার পৃথিবীর সামনে আসে, যার ফলে এক ঘৃণ্য অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয় এবং তার অত্যন্ত ক্ষমতাধর নেটওয়ার্কের শেকড় ধরে টান দেয়।


সৌরেন হাবিব, লেখক ও সাংবাদিক 

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ