বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনে উপকূলবাসীর কণ্ঠ তুলে ধরবেন জান্নাতুল নাঈম
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকার তরুণ জলবায়ুকর্মী জান্নাতুল এস এম নাঈম জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) ৩১তম সম্মেলন কপ৩১-এ বাংলাদেশের তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইসিসিসিএডি) ২০২৬ সালের ইয়ুথ ফেলো নাঈম কয়েক ধাপের কঠোর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন। তাঁর এই অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু সংকট ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাপনের বাস্তব অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আইসিসিসিএডি-আইইউবি ক্যাপ-রেস প্রকল্পের অধীনে দীর্ঘ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নাঈম নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আবেদন করা তরুণদের মধ্য থেকে প্রাথমিকভাবে ৩০ জনকে ২০২৬ সালের ইয়ুথ ফেলো হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। বছরজুড়ে তাঁরা বিভিন্ন কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ ও একাধিক ধাপের মূল্যায়নে অংশ নেন। এসব ধাপ শেষে সাতজনকে চূড়ান্ত পর্বের জন্য বাছাই করা হয়। সর্বশেষ মূল্যায়নে আইসিসিসিএডি-আইইউবির কর্মকর্তা এবং দেশ-বিদেশ থেকে অনলাইনে যুক্ত প্রতিনিধিরা সামগ্রিক মূল্যায়ন করেন। এতে দুজনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। চূড়ান্ত মূল্যায়নে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে কপ৩১-এ অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন নাঈম।
আগামী নভেম্বর মাসে তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে কপ৩১ জলবায়ু সম্মেলন। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, নীতিনির্ধারক, জলবায়ুবিজ্ঞানী, পরিবেশকর্মী, উন্নয়নবিশেষজ্ঞ এবং তরুণ প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। সম্মেলনে জলবায়ু অভিযোজন, জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলার কৌশলসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় আসার কথা রয়েছে।
এস এম জান্নাতুল নাঈম শ্যামনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। ২০২৬ সালের শুরু থেকে তিনি বাংলাদেশের পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষণাভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বারসিকের (BARCIK) কমিউনিটি ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে কাজ করছেন। সংস্থাটি জাতীয় পরিবেশ পদকও পেয়েছে। পাশাপাশি তিনি পরিবেশবিষয়ক তরুণ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শারুবের (SHARUB) নির্বাহী পরিচালক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, তরুণদের সংগঠিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনপদগুলোর স্থানীয় পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা এবং তরুণ নেতৃত্ব বিকাশে তাঁর কাজ বিশেষভাবে কেন্দ্রীভূত।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরসহ সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, মাটি ও পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং নিরাপদ পানীয় জলের তীব্র সংকট স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকায় ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে।
এসব সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় নাজুক বাস্তুতন্ত্রের ওপর। বিশেষ করে নারী, শিশু, কৃষক, জেলে ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পরিবেশগত ও জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন।
উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়ে ওঠা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে নাঈম মনে করেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর ও জীবনযাপনের বাস্তব অভিজ্ঞতার যথাযথ প্রতিফলন থাকা জরুরি। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অবদান তুলনামূলকভাবে নগণ্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাদেরই। এসব জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরাপদ পানীয় জলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
কপ৩১ সম্মেলনে নাঈম জলবায়ু অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা, ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো তুলে ধরতে চান। পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে অভিযোজন কার্যক্রম জোরদার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিতে চান তিনি।
সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় অভিযোজন কৌশল এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরার প্রত্যাশা করছেন নাঈম। সম্মেলন শেষে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ওই অঞ্চলের তরুণদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এবং তৃণমূল পর্যায়ে জলবায়ু কার্যক্রম ও পরিবেশবিষয়ক অধিকার আদায়ের উদ্যোগ জোরদারে ভূমিকা রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।
নাঈমের এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদের তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণা। কপ৩১-এ তাঁর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মুখসারিতে থাকা মানুষের কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মতামত দিন