Views Bangladesh Logo

গাজা সিটি দখলে ইসরায়েলের তীব্র অভিযান, বাসিন্দাদের সরাতে চায় দক্ষিণ সুদানে

গাজায় হামলা আরও তীব্র করেছে ইসরায়েল। উপত্যকাটির প্রধান শহর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গাজা সিটি পুরোপুরি দখলে নিতে বিমান-ড্রোন থেকে বোমা হামলাসহ স্থল অভিযানও চালাচ্ছে দখলদার দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। এতে এই নগরীতে আশ্রিতসহ ১০ লাখ বাসিন্দার জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে। পূর্বাঞ্চল থেকে বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়েও যাচ্ছেন অসংখ্য গাজাবাসী।

এদিকে ইসরায়েল গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তরে দক্ষিণ সুদানের সাথে আলোচনা করছে। ধ্বংস ও দখলের পরিকল্পনায় নগরীটিতে থেকে যাওয়া অবশিষ্টদের তারা পূর্ব আফ্রিকার দেশটিতে তাড়িয়ে দিতে চায় বলে অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলের।

এএফপি জানিয়েছে, গাজা নগরীতে ঘন ঘন বিমান হামলা ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তাল আল-হাওয়ার দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে ট্যাংক নিয়ে এগিয়ে আসছে স্থলবাহিনীও। এলাকাটির বাসিন্দা ৫১ বছরের সাবাহ ফাতোম বার্তা সংস্থাটিকে জানান, আকাশে ড্রোন উড়ছে। বহু মানুষ বাড়িঘর ও তাঁবু ছেড়ে শহরের পশ্চিম দিকে ছুটছেন।

গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসালের বরাতে সংবাদ সংস্থাটি আরও জানায়, ‘টানা পঞ্চম দিনের মতো ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী বোমাবর্ষণ তীব্রতর করছে’।

‘ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ওই এলাকায় সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করছে, বোমা, ড্রোন ও অত্যন্ত বিস্ফোরক অস্ত্র, যা বেসামরিক বাড়ি-ঘরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়’- বলেন বাসাল।

এদিকে বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ২২ জন ত্রাণপ্রার্থীসহ কমপক্ষে ৫৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৮৩১ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে হামাস নিয়ন্ত্রিত ছিটমহলটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আগের দিন বুধবার (১৪ আগস্ট) মারা যান আরও কমপক্ষে ১২৩ জন, আহত হন আরও ৪৩৭ জন।

টেলিগ্রামে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগের ইসরায়েলি হামলার ধ্বংসস্তূপ থেকে চারজনের মৃতদেহও উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি অভিযান শুরুর পর থেকে মোট প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৭৭৬ জনে, আহত হয়েছেন অন্তত এক লাখ ৫৪ হাজার ৯০৬ জন।

আল জাজিরা জানায়, ইসরায়েলি আক্রমণের তীব্রতায় চলতি সপ্তাহে দৈনিক নিহতের সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে, পাশাপাশি বাড়ি-ঘর ধ্বংস ও বিধ্বস্তের হারও বেড়েই চলেছে। ফলে উত্তর গাজার বিস্তীর্ণ জনপদ ‘প্রাণহীন মরুভূমিতে’ পরিণত হয়েছে।

চিকিৎসকরা জানান, ইসরায়েলের চাপিয়ে দেয়া জোরপূর্বক অনাহার ও অপুষ্টিতে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন আরও চারজন। যার ফলে ‘দুর্ভিক্ষে’ মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৯ জন, যাদের ১০৬ জনই শিশু। তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, মানবিক সংকট এখন ‘বিপর্যয়কর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

রয়টার্স জানায়, ইসরায়েলি বিমান ও ট্যাঙ্কগুলো গাজা সিটির পূর্বাংশে বোমা ও গোলাবর্ষণ করেই চলেছে। বুধবার রাতের বোমা হামলায় গাজা সিটির জেইতুন ও শেজাইয়ার বহু বাড়ি ধ্বংস হয়।

আল-আহলি হাসপাতাল জানায়, জেইতুনের এক বাড়িতে চালানো বিমান হামলায় ১২ জন নিহত হন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসের পূর্বাংশেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ট্যাংকের গোলাবর্ষণে বেশ কয়েকটি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।

ফিলিস্তিনি চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন, গাজার মধ্যাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) দুটি ত্রাণকেন্দ্রে খাবারের খোঁজে আসা আরও নয়জন ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ২৭ মে ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র চালু করে জিএইচএফ। সে সময় থেকে খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে এক হাজার ৮৮১ জন। এর মধ্যে এক হাজার ৩৬৭ জন জিএইচএফ কেন্দ্রের কাছে এবং বাকি ৫১৪ জন নিহত হয়েছেন ত্রাণবহরের রুটে। এ সময়কালে আহত হন আরও ১৩ হাজার ৮৬৩ জন ত্রাণপ্রার্থী।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এখনও খাদ্য, ওষুধ, আশ্রয় সামগ্রী এবং স্বাস্থ্যবিধি সরবরাহ সহ গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য গাজায় প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ধ্বংস এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের হত্যা ও অনাহারে রেখে ইসরায়েল ‘নীরব হত্যা’ চালাচ্ছে বলেই অভিযোগ জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের।

গাজার সবচেয়ে বড় নগরী দখলে নিতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার আহ্বান জানানোর কয়েক দিন পর বুধবার পুরো উপত্যকায় নতুন অভিযানের মূল রূপরেখার অনুমোদন দিয়েছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির।

কবে নাগাদ ইসরায়েলি সেনারা গাজা নগরীতে প্রবেশ করবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানায়নি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার। তবে গাজার গণমাধ্যম দপ্তরের মহাপরিচালক ইসমাইল আল-ছাওয়াবতা বলেন, গাজা নগরীতে আগ্রাসী অনুপ্রবেশ অব্যাহত রেখেছে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী।

২২ মাস ধরে গাজায় আগ্রাসন চালিয়ে আসছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে সেখানকার বেশিরভাগ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গাজার ২২ লাখ বাসিন্দার বেশির ভাগই দফায় দফায় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। প্রায় অর্ধেক বাসিন্দা আশ্রয় নিয়েছেন গাজা নগরীতে।

ইসরায়েলি স্থল অভিযান শুরুর পর গণমাধ্যম দপ্তরের মহাপরিচালক আরও বলেন, এসব হামলা ‘পোড়া মাটি’ নীতি এবং বেসামরিক স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংসের মাধ্যমে নতুন পরিস্থিতি তৈরির মারাত্মক উসকানিরই অংশ।

পাশাপাশি ইসরায়েল গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক দক্ষিণ সুদানে স্থানান্তরের বিষয়ে দেশটির সাথে আলোচনা করছে বলে এপিকে জানান বিষয়টির সাথে পরিচিত ছয়জন। প্রস্তাবটি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার ইসরায়েলি প্রচেষ্টার অংশ বলে সতর্ক করে দিয়েছে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোও। তারা বলছে, এই পদক্ষেপ জোরপূর্বক বহিষ্কার ও জাতিগত নির্মূলের সমান হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করবে।

স্থানান্তর পরিকল্পনার সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, ফিলিস্তিনিদের কখনোই গাজায় ফিরে যেতে দেয়া হবে না এবং এই গণস্থানান্তর ইসরায়েলের জন্য ছিটমহলটি সংযুক্ত করার এবং সেখানে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি পুনঃস্থাপনের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

দক্ষিণ সুদান ২০১১ সালে স্বাধীনতার পর পরই শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ থেকে পুনরুদ্ধারে লড়াই করছে। এতে প্রায় চার লাখ মানুষ নিহত এবং দেশের কিছু অংশ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সংঘাত থেকে আসা বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয়ও দিয়েছে দেশটি।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ