ইসরায়েলি হামলায় গাজায় দুই সাংবাদিকসহ ১১৩ ফিলিস্তিনি নিহত, অনাহারে আরও ১০ জন
গত ২৪ ঘন্টায় গাজাজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নিহত ১১৩ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ বিভিন্ন হাসপাতালে আনা হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন আগের হামলায় নিহত ১৩ জনও। আহত আরও ৫৩৪ জনকে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে জোরপূর্বক অনাহারে মারা গেছেন অন্তত আরও ১০ জন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, বুধবার (২৩ জুলাই) ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইসরায়েলি স্থল অভিযানে গাজাজুড়ে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন ৪১ জন ফিলিস্তিনি, যাদের ১০ জন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) ত্রাণ কেন্দ্রগুলোতে খাবারের জন্য এসেছিলেন। উদ্ধার হওয়া বাকি ৭২ জনের মরদেহের মধ্যে ৫৯ জন নিহত হন মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সন্ধ্যা থেকে রাতভরের হামলায়, যাদের ২৪ জন ত্রাণপ্রার্থী। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওই সময়কালে ইসরায়েলি আগের হামলার ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৩ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এ নিয়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৫৯ হাজার ২১৯ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আরও এক লাখ ৪৩ হাজার ৪৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আরও জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় গাজা উপত্যকার হাসপাতালগুলোতে মৃত নতুন দশজনসহ অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে ইসরায়েলি অবরোধ ও খাদ্য সরবরাহে বাধার মুখে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১১১ জন ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে মারা গেছেন, যাদের ৮০ জনই শিশু এবং ৩১ জন প্রাপ্তবয়স্ক।
২৭ মে ইসরায়েল জিএইচএফ পরিচালিত নতুন ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থা চালু করার পর থেকে নিহত মোট ত্রাণপ্রার্থীর সংখ্যা এক হাজার ৬০ জনে পৌঁছেছে, আহত হয়েছেন সাত হাজার ২০৭ জনেরও বেশি।
এদিকে ইসরায়েলি বাহিনী একদিনে আরও দুই ফিলিস্তিনি সাংবাদিক তামের আল-জা’আনিন এবং ওয়ালা আল-জাবারিকে হত্যা করেছে। যার ফলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলে নিহত গণমাধ্যম কর্মীর সংখ্যা ২৩১ জনে দাঁড়িয়েছে।
ইসরায়েল গত মার্চে গাজার প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়ার পর খাদ্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ২৭ মে জিএইচএফের মাধ্যমে সীমিত সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দেয়া হলেও জাতিসংঘকে এই প্রক্রিয়া থেকে পুরোপুরি বাদ রাখা হয়েছে।
গাজা উপত্যকায় মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে সতর্ক করছে পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোসহ জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর। গাজা উপত্যকায় প্রয়োজনীয় মানবিক সরবরাহে অবরোধ তুলে নিতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ও জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থাও (ইউএনআরডব্লিউএ)।
ইউএনআরডব্লিউএ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে বলেছে, ‘জর্ডান ও মিশরে তাদের গুদামে হাজার হাজার স্বাস্থ্যকর সরঞ্জাম প্যাক করা ও প্রস্তুত রাখা হয়েছে, কেবল সবুজ সংকেতের অপেক্ষায়। দরজা খুলে দিন। সাহায্য করতে দিন’।
সাহায্যকারী গোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে, ইসরায়েল যেসব পণ্য অবরুদ্ধ করছে, তার মধ্যে রয়েছে শিশুর ফর্মুলা, খাবার, জলের ফিল্টার ও ওষুধ। অন্যান্য চিকিৎসা সরবরাহ, যেমন অক্সিজেন সিলিন্ডার, চেতনানাশক এবং ক্যান্সারের ওষুধও সীমিত করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সামগ্রী প্রবেশে এই অস্বীকৃতি গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে উল্লেখ করে সংস্থাগুলো বলছে, ‘এ ধরনের নিষেধাজ্ঞাগুলো সম্মিলিত শাস্তি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন’।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় এক হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরায়েল সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে গাজার বিভিন্ন এলাকায়।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশের চাপে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও ১৮ মার্চ থেকে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করে আইডিএফ। দ্বিতীয় দফার এই অভিযানে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন আট হাজার ৩৮৬ জন ফিলিস্তিনি এবং আহত হয়েছেন ৩১ হাজার ০৪ জন।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে